প্রত্যেক বছরের মতই এই বছরেও ভারতে মহা ধূমধামের সঙ্গে দশেরা (দশহরা) উত্সব পালন করা হয়েছে – এটা সেই উত্সব, যা এই বছরে ২৪শে অক্টোবর বুধবারে পড়েছে. উত্সব হল উত্সবই, আর তাতে কিছু অস্বাভাবিক হত না, যদি এবারের দশহরা এতটা স্পষ্ট রাজনৈতিক চরিত্র নিয়ে না আসত.

এটা এমনকি সেই রকম কোন ব্যাপারও নয় যে, এই বছরের দশহরা উত্সব সময়ের হিসাবে মুসলমানদের একটি প্রধান উত্সব – ঈদ আল – আধা (ঈদুল আযাহ) এর সঙ্গে একই সময়ে পড়েছে. শেষমেষ, ভারতের মত বহু ধর্মাবলম্বী দেশে অনেক উত্সবই একে অপরের সাথে করা হয়ে থাকে. সেই রকমই এই বছরে দশহরা উত্সব পালনের বিষয়ে অংশ নিয়েছেন মুসলমান রাজনীতিবিদরাও অংশ নিয়েছেন – যেমন উপ রাষ্ট্রপতি হামিদ আনসারি অথবা জম্মু ও কাশ্মীর প্রদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রী গোলাম নবি আজাদ, আবার অন্যান্য রাজনীতিবিদরাও যারা হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী নন.

এই বছরের দশহরা উত্সব পালনের বিশেষত্ব হল যে, এটা একটা ধর্মীয় উত্সব, যা বহু রাজনৈতিক নেতা ও দল নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য ব্যবহার করেছে, যা ধর্মের সঙ্গে কোন ভাবেই এক নয়, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এমন একটা ধারণা তৈরী হচ্ছে যে, আজ খুব কম লোকই সন্দেহ করছে যে, ভারতে অন্তর্বর্তী কালীণ নির্বাচন হতে পারে ও রাজনীতিবিদরা শুরু করছে প্রাক্ নির্বাচনী প্রচার. দশহরার মতো রঙীণ উত্সব, যখন রাস্তা দিয়ে বিশাল সব কুশ পুত্তলিকা নিয়ে যাওয়া হয়, যা দৈত্য রাজ রাবণের ও তার ভাই কুম্ভকর্ণ ও পুত্র মেঘনাদের প্রতিকৃতি এবং তা পরে হর্ষধ্বনি করে পোড়ানো হয়, তা সুযোগ করে দেয় রাজনীতিবিদদের নিজেদের আত্ম প্রকাশের. এবারে ভারতে বাস্তবে এই উত্সব অনেকটাই রাজনৈতিক কাণ্ডে পরিণত করা হয়েছে”.

বিশাল জন সমাবেশে প্রকাশ্যে দগ্ধ করার মতো প্রধান শত্রু বলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের লোকরা বিভিন্ন বিষয় বেছে নিয়েছেন. দিল্লী শহরে ভারতীয় জনতা দলের সক্রিয় কর্মীরা আজকের রাবণ হিসাবে বেছে নিয়েছেন সেই ধরনের সামাজিক অকল্যাণ, যেমন দুর্নীতি, মূল্যবৃদ্ধি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি. সেই দিল্লী শহরেই ছোটখাট ব্যাবসাদাররা প্রধান অকল্যাণ বলে বেছে নিয়েছেন বিদেশী পূঁজির দেশের খুচরো ব্যবসায় বিনিয়োগকে, ঠিক সেই রকমের একটা ফেস্টুন কুশ পুত্তলিকায় ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল. মধ্য প্রদেশের ইন্দোর শহরে রাবণের প্রতিকৃতি এবারে হয়েছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী. স্থানীয় ব্যবসাদারদের সংগঠনের এক নেতা যেমন বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী এক সময়ে ঠিক সেই ভাবেই শুরু করেছিল, যেমন আজ করছে – খুচরো ব্যবসায় ক্ষেত্রে বৃহত্ বিদেশী কোম্পানী গুলি: তারা শুরু করেছিল নিজেদের ব্যবসা খোলা দিয়ে, তারপরে সারা ভারতকেই নিজেদের অধীনে নিয়েছিল.

প্রসঙ্গতঃ, ভারতের সকলেই এই ধরনের মানসিকতা মেনে নেন নি. যেমন, হরিয়ানা রাজ্যের এক ছোট শহর ওধান, সেখানে স্থানীয় দলিতরা রাবণকে নিজেদের দেবতা বলে ঘোষণা করেছে ও তার কুশ পুত্তলিকা জন সমক্ষে দাহ করায় বাধা দিয়েছে. আর পাঞ্জাব রাজ্যে একদল সক্রিয় কর্মী রাবণের উদ্দেশ্য এমনকি ধর্মীয় পূজাও করেছে, যাকে তাঁরা মনে করেছেন স্থানীয় মহাত্মা বলেই.

এই সমস্ত কিছুকেই মনে করা যেতে পারত একটা নির্দোষ মজা বলে, যদি না একটা বিপদ থাকতো. ঐতিহ্য মেনে নেওয়া সমাজে ধর্মীয় প্রতীককে রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত করা, যা একই সঙ্গে বিশাল সংখ্যক মানুষের মনে খুবই শক্তিশালী অনুভূতির সৃষ্টি করে, তা সব সময়েই এই ব্যাপারে মারাত্মক যে, মানুষ চট করেই বিদ্যুতপৃষ্ট হয়ে পড়তে পারে, আর তাদের শক্তি ধ্বংস করার উদ্দেশ্য ব্যবহার করা যেতে পারে, এই কথাই উল্লেখ করে বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এই প্রক্রিয়াকে নাম দেওয়া হয়েছে রাজনীতির মহাকাব্যে পরিণত হওয়া বলে, আর তা বিশেষ করেই বিপজ্জনক বহু প্রজাতি ও বহু ধর্মীয় সমাজের পক্ষে. ভারতের প্রতিবেশী দেশ গুলির দিকে তাকালেই যথেষ্ট হবে, যেমন, শ্রীলঙ্কার দিকে, যেখানে রাজনীতিবিদরা নিজেদের স্বার্থে একই সঙ্গে মহাকাব্যে বর্ণনা করা চরিত্র ব্যবহার করেছে (তার মধ্যে অযোধ্যার রাজপুত্র রামের ও লঙ্কার রাজা রাবণের) সেই কাজের জন্য, যাতে যেমন সিংহল বাসীদের তেমনই তামিলদের মধ্যে পরিবর্তনের অযোগ্য প্রবৃত্তির সৃষ্টি হয়. এটা কি দিয়ে শেষ হয়েছে, তা সকলেরই ভাল করে জানা রয়েছে – কম করে হলেও ৮০ হাজার নিহত মানুষ, বহু লক্ষ উদ্বাস্তু, বিশাল ধ্বংসলীলা ও অর্থনীতির ক্ষতি, যা বহু দিন ধরেই পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না”.

সুতরাং সব রকমের লক্ষ্যই তা পূরণের মাধ্যমকে স্বীকৃতি দেয় না, আর যীশু খ্রীষ্ট ঠিকই বলেছিলেন সেই কথা বলে যে, ভগবানকে ভগবানের আর রাজারে রাজার প্রাপ্য দিতে বলে, অর্থাত্, আজকের দিনের বিষয়ে এটা বলতে হলে, বলা উচিত্, ধর্মকে আজকের দিনের ক্ষণিকের কাজের সমাধানের জন্য ব্যবহার করা ঠিক হবে না.