ভারতে গ্রেট ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত জেমস বিভান গুজরাট রাজ্যের রাজধানী আমেদাবাদে মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে দেখা করেছেন. এই খবরে কিছুই আশ্চর্য হওয়ার মতো ছিল না – শেষমেষ স্থানীয় সরকারি কর্মীদের সঙ্গে দেখা করাটাই রাষ্ট্রদূতের কাজ, - যদি না একটা ব্যাপার থাকতো. শ্রী মোদীকে পশ্চিমের দেশ গুলিতে আসতে দেওয়ার অযোগ্য বলেই মনে করা হয়ে থাকে. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একাধিকবার তাঁকে ভিসা দিতে অস্বীকার করেছে, আর গ্রেট ব্রিটেন বিগত বছর দশেক ধরেই খোলাখুলি ভাবে গুজরাতের প্রধানমন্ত্রীকে বয়কট করে এসেছে.

পশ্চিমের চোখে শ্রী মোদী তাঁর প্রতি নির্দয় হওয়াটা নিজের গুজরাত রাজ্যে মুসলমানদের উপরে হওয়া অত্যাচারের বিষয়ে নিজের ভূমিকা শেষ অবধি স্পষ্ট না করা দিয়েই করেছেন, যার ফলে সরকারি তথ্য অনুযায়ী হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে, আর মানবাধিকার রক্ষা কর্মীদের তথ্য অনুযায়ী – প্রায় দুই হাজার পর্যন্ত. মৃতদের মধ্যে তিনজন গ্রেট ব্রিটেনের নাগরিকও ছিলেন.

২০০৮ সালে এক বিশেষ পরিষদ, যা রাজ্য সরকার সৃষ্টি করেছিল, তারা এই সব ধ্বংসের সঙ্গে শ্রী মোদীর উপর থেকে সমস্ত যোগাযোগের অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেয়. কিন্তু যেমন পশ্চিমের, তেমনই ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমে অভিযোগ থেকেই যায় যে, তিনি কম করে হলেও মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে এই হিংসা ও অত্যাচার বন্ধ করতে পারেন নি.

আর এবারে ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত দেখিয়ে দিলেন যে, বয়কটের সময় পেরিয়েছে. প্রশ্ন ওঠে: কেন এটা এখনই হল? কারণ এখনও তো চরমপন্থী উগ্র জাতীয়তাবাদী বলে পরিচিত নরেন্দ্র মোদীর পরিচয় পাল্টায় নি. রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি এই প্রসঙ্গে মত দিয়ে বলেছেন:

“এই বিষয়ের মুখ্য ব্যাপারটা সহজ. ডিসেম্বর মাসে গুজরাতে রাজ্যের বিধানসভায় নির্বাচন হবে, আর খুবই বেশী রকমের সম্ভাবনা আছে যে, এই নির্বাচনে দেশের বিরোধী পক্ষে থাকা ও রাজ্যে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির ক্ষমতায় আসা, আর নরেন্দ্র মোদী – এই দলের এক নেতা হিসাবে – নিজেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী পদে বজায় থাকবেন”.

এই রকমের একটা উন্নতিশীল রাজ্যের সঙ্গে, যেখানে রাজনৈতিক বয়কট করা হলেও ব্রিটেনের কোম্পানীরা খুবই সক্রিয়ভাবে কাজ করছে, নিজেদের সম্পর্ক ঠিক করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়. আর রাষ্ট্রদূত বিভান দেখাতে চেয়েছেন যে, তাঁর নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে দেখা করাটা ঠিক এই কারণেই ছিল. “আমরা গুজরাত সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করছি, এর অর্থ এই নয় যে, আমরা আলাদা কোন ব্যক্তিকে সমর্থন করছি”, - তিনি ঘোষণা করেছেন.

কিন্তু আসলে সেখানে রাষ্ট্রদূত যাই বলুন না কেন, তাঁর লক্ষ্য সম্পূর্ণ অন্য বিষয়ে ছিল. গুজরাত রাজ্যে নির্বাচন ও সেখানে ভারতীয় জনতা দলের সম্ভাব্য বিজয় এবং নরেন্দ্র মোদীর আবার মুখ্যমন্ত্রী হওয়া, তাঁর সামনে সারা দেশের প্রসারেই নেতৃত্বে পৌঁছানোর পথ খুলে দেবে. আপাততঃ সারা দেশ জুড়ে নির্বাচন ঠিক রয়েছে ২০১৪ সালে, কিন্তু আজই খুব কম বিশ্লেষক সন্দেহ প্রকাশ করছেন যে, তা হতে পারে সময়ের আগেই. আর বর্তমানের প্রশাসনের জনপ্রিয়তা অনতিপূর্ব ভাবেই অত্যন্ত কম. এই ধরনের পরিস্থিতিতে সেই সমস্ত শক্তিরই জনপ্রিয়তা ও বিজয়ের সম্ভাবনা বেড়ে যায়, যারা আজকে রয়েছেন বিপক্ষে. নরেন্দ্র মোদী – তাঁর চরিত্র নিয়ে যত মত বিরোধই থাক না কেন – সবচেয়ে বেশী করে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী পদের দায়িত্ব নিতে পারেন বলেই মনে করা হয়েছে. আর এর অর্থ হল যে, তাঁর সঙ্গে ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাত্কারের অনেক সুদূর প্রসারিত লক্ষ্য রয়েছে – বর্তমানের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক করা নয়, বরং সম্ভাব্য ভবিষ্যতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরী করা.

আর তাহলে আগে করা মানবাধিকার নীতি সংক্রান্ত ঘোষণার কি হল, ভারতের এই রাজনীতিবিদকে ১০ বছরেরও বেশী সময় ধরে বয়কট করারই বা মানে কি হল? বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“মনে করা হয়েছে যে, এই প্রশ্নের উত্তরও খুবই সহজ. মানবাধিকার রক্ষা নিয়ে আহ্বান সেই সমস্ত সময়ে ও সেই সব জায়গায় করা দরকার, যেখানে অবাধ্য নেতাদের বাধ্যতা আদায় করার দরকার থাকে. ভারতের নেতার কাছ থেকে দাসত্ব দাবী করা স্রেফ হাস্যকর. আর তাকে বয়কট করা চালিয়ে যাওয়া – বোকামি ও লাভজনক নয়. আর স্পষ্ট দেখতে পাওয়া অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক লাভ থাকলে মানবাধিকারের কথা ভুলে যাওয়া যেতেই পারে”.

এখানে সন্দেহ করার দরকার নেই যে, গুজরাতে ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত যাওয়া – এটা শুধু প্রথম পাখীর উড়ান. তার পরেই পশ্চিমের দেশ গুলি থেকে অন্যান্য সরকারি মুখপাত্ররা হাজির হবেন. আর এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও ভারতের সম্ভাব্য আগামী নেতার সঙ্গে ভাল সম্পর্ক রাখার ইচ্ছা নিয়ে তাঁকে নিজেদের ভিসা দিতে না চাওয়ার কালো তালিকা থেকে মুছে দেবে.