চিন প্রচুর পরিমানে মূলধন দেশের বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার সামনে পড়েছে. আমেরিকার সংবাদপত্র ওয়াল স্ট্রীট জার্নাল হিসাব করেছে যে, গত এক বছরে ব্যবসায়ীরা ও চিনের কোম্পানী গুলি দেশের বাইরে নিয়ে গিয়েছেন ২২ হাজার পাঁচশো কোটি ডলার. এটা দেশের ২০১১ সালে বার্ষিক জাতীয় আয়ের শতকরা তিন ভাগ.

অর্থ দেশ থেকে বার হয়ে যাওয়া আগেও ঘটেছে. কিন্তু বর্তমানের পরিমান- অভূতপূর্ব. যেমন, ২০০৮ সালের বিশ্ব বাণিজ্য সঙ্কটের সময়ে চিন থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল ১১ হাজার কোটি ডলারের সমান অর্থ. এখন – তা হয়েছে আড়াই গুণ বেশী. মূলধন বের করে নিয়ে যাওয়া বেড়েছে ২০১১ সালেই. সেই সময়েই চিনের অর্থনৈতিক উন্নতির হার কমতে শুরু করেছিল, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ইনস্টিটিউটের রাজনীতি বিদ্যা বিভাগের প্রধান আলেক্সেই ভস্করেসেনস্কি বলেছেন:

“সব দেখে শুনে মনে হয়েছে যে, চিনের আভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সমস্যার কথাই এই মূলধন বেরিয়ে যাওয়া ইঙ্গিত করছে. এর অর্থ হল যে, উন্নতির প্রসারিত হওয়ার মডেল বর্তমানে একেবারেই তার সব ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে. আর নিবদ্ধ ভাবে উন্নতি হওয়ার মডেল – এটা খুবই জটিল কাজ ও খুবই বড় ধরনের বদল হতে বাধ্য করবে”.

বিদেশে চিনে তৈরী জিনিষ পত্রের চাহিদাও কমেছে. দেশের সরকার শেয়ার ও গৃহ নির্মাণের বাজারে যারা ফাটকা খেলে তাদের চেপে ধরেছে, দাম পড়েছে, যার ফলে ধনী চিনা লোকদের জন্য এই সমস্ত ক্ষেত্রে অর্থ বিনিয়োগের আগ্রহ কমে গিয়েছে. তাই শুরু হয়েছে খালি থাকা মূলধনের চিন থেকে বিদেশে বেরিয়ে যাওয়া. তার মধ্যে এই সব অর্থ দিয়ে বিদেশে ঘর বাড়ী কেনা হচ্ছে. তার মধ্যে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সেরা পর্যটন কেন্দ্র গুলিতে একেবারে সম্পূর্ণ এলাকা জুড়ে ভাল ফ্ল্যাট কিনে ফেলা.

উকিল ও ব্রোকার, যারা বিদেশে ঘরবাড়ী কিনে বিনিয়োগের বিষয়ে সাহায্য করছে, তার কেউ লুকিয়ে রাখছে না – যে বহু রকমের নতুন সব পথ বের করা হয়েছে দেশের বাইরে অর্থ নিয়ে যাওয়ার জন্য. যেমন, এমন সব দপ্তর তৈরী হয়েছে, যারা কোন রকমের শুল্ক বিভাগের পর্যবেক্ষণ ছাড়াই দেশের বাইরে নগদ অর্থ নিয়ে পৌঁছে দিচ্ছে ব্যক্তিগত বিমানে. সেই সব ক্যুরিয়ার লোকদের পরিষেবা বাড়ছে, যারা দেশের সীমান্ত পার হয়ে নগদ অর্থের বান্ডিল স্রেফ ব্যাগে করে পৌঁছে দিচ্ছে. এমনকি সেই ধরনের ঘটনাও কম ঘটছে না, যখন ব্যাঙ্কের মাধ্যমে বিদেশের কোম্পানীকে দেয় অর্থের সঙ্গে নিজেদের কর্মীদের ব্যক্তিগত অর্থও যোগ করে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে. খুবই সাধারন ব্যাপার হয়ে গেছে যখন কোম্পানীর মালিকরা বাইরের দেশের শেয়ার বাজারে নিজেদের কোম্পানীর শেয়ার প্রাথমিক ভাবে বিক্রী করে তার বিনিময়ে পাওয়া অর্থ বাইরের দেশেই খাটাচ্ছেন, এই সব শেয়ার বাজার রয়েছে হংকং, সিঙ্গাপুর ও নিউইয়র্কে.

এই প্রসঙ্গে চিন যেমন ছিল তেমনই রয়ে গিয়েছে বিদেশ থেকে বিনিয়োগের বিষয়ে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করার দেশ হিসাবে. গত বছরে এই দেশে এসেছে ৬ থেকে ৮ শো কোটি ডলার বিনিয়োগ, যা সরাসরি ভাবেই বিদেশী বিনিয়োগ হিসাবে এসেছে আর তার দ্বিগুণ এসেছে চিনের কোম্পানী গুলির শেয়ারের পোর্টফোলিও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে.

কিন্তু এটা চিন থেকে যত অর্থ বের হয়ে যাচ্ছে, তার সঙ্গে তুলনার যোগ্যই নয়. প্যারাডক্স হল এই দুটো প্রবাহই একে অপরের সঙ্গে কোন রকমের বিরোধ করে না, এই রকম মনে করে আলেক্সেই ভস্করেসেনস্কি বলেছেন:

“মূলধন বেরিয়ে যাওয়া – এটা একটা আপেক্ষিক ধারণা. যে কোন দেশেই, যদি এই অর্থনীতি পুরো মাত্রায় বন্ধ না থাকে, তবে দেশের ভিতরে অর্থ আসা ও বেরিয়ে যাওয়া চলতে থাকে সমান্তরাল ভাবেই, একে অপরের চেয়ে স্বাধীন ভাবেই”.

যদি ধনী চিনা লোকরা নিজেদের দেশের বাজারকে দরিদ্র করেও থাকে, তবে সেই একই পরিমান অর্থে তারাই অর্থাত্ চিনের ব্যবসা বিদেশে নানা রকমের আয় যোগ্য বিষয় ক্রয় করে বেড়ে উঠেছে. বিশ্ব আজ বহুদিন হল সেই ব্যাপারের সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছে যে, চিনের লোকরা সারা বিশ্ব জুড়েই সব কিছু খুবই সক্রিয় ভাবে কিনে ফেলছে. জার্মানীতে তারা কিনছে – নেতৃস্থানীয় কোম্পানী. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় কিনছে তেলের খনি, ব্যাঙ্ক ও সিনেমা শিল্প. আফ্রিকাতে কিনছে – প্রাকৃতিক সম্পদ ও কৃষি যোগ্য জমি. এখন উদ্ভব হয়েছে নতুন এক উত্স, য ব্যক্তিগত মালিকানার কোম্পানী গুলি অথবা চিনের ব্যবসাদার লোকরা দেশের সরকারি ভাবে অর্থ বের করে নিয়ে যাওয়ার পথ গুলিকে এড়িয়ে বাইরে নিয়ে যাচ্ছে. তাদের জন্য – এটা নিজেদের ধনী হওয়ার জন্য নতুন পথ. আর স্থানীয় সাধারণের চোখে – চিনের বিনিয়োগ প্রসারের এক নতুন অধ্যায়.