অস্ট্রিয়ার প্যারাশ্যুট ডাইভার ফেলিক্স বাউমগার্টনার স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার থেকে লাফ দিয়ে তিনটি বিশ্ব রেকর্ড একই সঙ্গে ভেঙেছেন: প্যারাশ্যুট ব্যবহার করে সবচেয়ে বেশী উচ্চ স্থান থেকে লাফ দেওয়ার, পতনের গতিবেগ সবচেয়ে বেশী ও ফানুসে চড়ে সবচেয়ে উঁচু নিয়ন্ত্রিত উড়ানের.

এই সব ভেঙে দেওয়া রেকর্ড বাস্তব ও একেবারেই ব্যবহারের যোগ্য সংজ্ঞা বহন করে. এই ধরনের লাফ দেওয়ার সময়ে সংগৃহীত তথ্য মহাকাশের কক্ষ পথ থেকে জরুরী কালীণ অবস্থায় মহাকাশচারীদের জীবন বাঁচানোর জন্য ব্যবস্থা তৈরীর ক্ষেত্রে অমূল্য ভাবেই কার্যকরী. এই ধরনের ব্যবস্থা বিভিন্ন দেশে বহু দিন ধরেই তৈরীর চেষ্টা করা হচ্ছে, তার মধ্যে রাশিয়াও রয়েছে. কিন্তু আপাততঃ এই বিষয়ে কিছুই তৈরী করা হয় নি. এই বিষয়ে “রেডিও রাশিয়াকে” রাশিয়ার মহাকাশচারী ও পরীক্ষক মাগোমেদ তলবোয়েভ বলেছেন:

“আমার জন্য আনন্দের বিষয় হল যে, কেউ একজন এই পথে চলছে. যখন মহাকাশের কক্ষপথে ২০ জন লোক থাকবে, তখন তাদের যদি মহাকাশযান কোন উল্কার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন তাদের কি করে রক্ষা করা হবে? এখন আমরা মাত্র দুই জন লোককে প্রতি ছয় মাসে মাত্র একবার রক্ষা করতে পারি, তাও এর জন্য একমাত্র সোভিয়েত দেশের সময়ের মহাকাশ যান সইউজ রয়েছে, অন্য কোন পথ নেই. এই যে মানুষ এই রকম উচ্চতা থেকে লাফ দিয়ে নেমে আসতে পেরেছে, - এটা এক বিশাল সাফল্য. তা জীবন রক্ষা করার ব্যবস্থা বানানোর জন্য সাহায্য করবে, যা দিয়ে একক ভাবে মহাকাশের কক্ষপথের থেকে নেমে আসা সম্ভব হবে, বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করা যাবে ও মাটিতে নামা যাবে”.

অস্ট্রিয়ার এই প্যারাশ্যুট ডাইভার, যাকে এখন “নির্ভয় ফেলিক্স” বলে নাম দেওয়া হয়েছে, তাঁর অনেক মহান পূর্বসূরি রয়েছেন. তাঁদের মধ্যে সোভিয়েত পরীক্ষক ইভগেনি আন্দ্রেয়েভ আছেন: তিনি স্ট্র্যাটোস্ট্যাট থেকে সাড়ে পঁচিশ কিলোমিটার উঁচু থেকে লাফ দিয়েছিলেন.

আন্দ্রেয়েভ মাটি থেকে এক কিলোমিটার উঁচুতে প্যারাশ্যুট খুলেছিলেন. তাই তাঁর লাফের মধ্যে “সরাসরি পতন” ছিল ২৭০ সেকেন্ড ধরে. অস্ট্রিয়ার নাগরিক প্যারাশ্যুট ছাড়া পড়েছেন আন্দ্রেয়েভের চেয়ে দশ সেকেন্ড কম সময়.

সোভিয়েত এই মহাকাশ যাত্রা পরীক্ষক নিজে লাফ দিয়েছিলেন আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে – ১৯৬২ সালের ১লা অক্টোবর. তিনি নিজের লাফ সম্বন্ধে বলেছেন

সেই সময়ে মহাকাশ যাত্রার আবিষ্কার কাজে লাগানো হয়েছিল. এটা যে শুধু লাফ নয়! এটা মহাকাশ যাত্রীর পোষাক স্কাফান্দার পরে তবে লাফ দেওয়া, যা সেই পোষাকের ভিতরে তাপমাত্রা মাইনাস ৮০ থেকে প্লাস ১৪০ ডিগ্রী অবধি একই রকম রাখতে পারে এবং এটাকে বলা যেতে পারে একটা সম্পূর্ণ ব্যবস্থা – তাতে ভেন্টিলেশন, লাইফ সেভিং, সব রকমের ব্যবস্থা থাকে. প্রথমে শরীর গরম করার ব্যবস্থা থাকে, তারপরে এই ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে চালু হয় ঠাণ্ডা করার ব্যবস্থা, কারণ বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই তাপমাত্রা উঠে যায় ১৪০ ডিগ্রী, আর এই সব ব্যবস্থাই চালু হতে হয় মুহূর্তের ভগ্নাংশের মধ্যে. তার ওপরে এই ধরনের উচ্চতায় প্রায় সম্পূর্ণ ভাবেই শ্বাস প্রশ্বাসের উপযুক্ত অক্সিজেন থাকে না, এমনকি সামান্য অঙ্গুলি হেলনেও শুরু হয়ে যায় সমস্ত শরীরের পাক খাওয়া.

অস্ট্রিয়ার নাগরিক তার পতনের সময়ে সেই পাক খাওয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছেন, যদিও এটা তার জন্যে সহজ কাজ হয় নি. এমনকি একেবারে এই লাফের শুরুর আগেও স্পষ্ট ছিল না, মানুষের শরীরে কি হতে পারে, যদি কোন কিছু এই ধরনের উচ্চতায় ঠিক কাজ না করে. এমনকি “সাধারন” অতিরিক্ত চাপ থেকে জ্ঞান হারানোয় সব কিছু শেষ হতে পারতো একেবারে মৃত্যুতেই.

শুধুশুধুই অস্ট্রিয়ার এই প্যারাশ্যুট ডাইভার তার মাটিতে ফিরে আসার পরে বলেন নি: “যখন আমি দাঁড়িয়েছিলাম বিশ্বের সেই একেবারে প্রান্তে তখন আমি নিজেকে কত ছোট আর ভাবলেশহীণ বলে টের পেয়েছিলাম! এই সব সময়ে একেবারেই রেকর্ড নিয়ে ভাবা সম্ভব নয়, নতুন বৈজ্ঞানিক তথ্য নিয়েও ভাবা যায় না. একটাই যা তুমি এই সময়ে ভাবতে পারো, চাইতে পারো – তা সেটা হল জ্যান্ত অবস্থায় ফিরে আসা নিয়ে”.

রাশিয়াতে, সঠিক করে বললে সোভিয়েত দেশে মহাকাশে উড়ানের শুরু থেকেই এক প্রকল্প তৈরী হয়েছিল মহাকাশচারীদের জরুরী কালীণ অবস্থায় বাঁচানোর ব্যবস্থা তৈরী নিয়ে. তা নিয়ে কাজ করত একটা সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক ও উত্পাদনের শিল্প, তাই তলবোয়েভ বলেছেন:

“ওরা ৩৯ কিলোমিটার অবধি উঠেছে, টেনেটুনে তুলেছে. আমাদের ৫০ কিলোমিটার অবধি ওঠার ব্যবস্থা রয়েছে. তার জন্য একটা পদ্ধতিও তৈরী করা রয়েছে, - ৫০ কিলোমিটারের বেশী ওঠাই সম্ভব নয়. ৪৭ কিলোমিটার এটা এমনিতেই বলা যেতে পারে সীমা, কিন্তু যদি তাপমাত্রা সুযোগ দেয়, তবে ৫০ কিলোমিটার উঁচুতেও ওঠা যেতে পারে. এর জন্য দরকার খুব সঠিক আবহাওয়ার তথ্য, উচ্চতা অনুযায়ী তাপমাত্রা ও হাওয়ার গতিবেগ. এটা একটা সম্পূর্ণ ব্যবস্থা, যা তৈরী করে আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম. তার মধ্যে আমিও ছিলাম. আমি নিজে লাফ দিয়েছে, পড়ে গিয়েছি, নিজের পিঠ ভেঙেছি, কারণ মুখ্য যেটা সেটা হল নেমে আসার প্রযুক্তি. আমি নামতে চেয়েছিলাম প্যারাশ্যুটে নয়, একটা জোন্ড চেপে. তা খুলে যায় ছাতার মতো, তবে শুধু উল্টো দিকে. এটা নিরাপত্তার গ্যারান্টি দিতে পারত. এখন আমাদের অনেক খুবই ভাল ভাবে শারীরিক ও প্রযুক্তিগত ভাবে প্রস্তুত যুবক রয়েছে, কিন্তু যেটা নেই তা হল এই বিষয়ে কোন রকমের অর্থ বিনিয়োগ”.

বিখ্যাত মহাকাশচারী ও পরীক্ষকের মতে, রাশিয়াতে মহাকাশের কক্ষ পথ থেকে মহাকাশচারীদের ত্রাণের বিষয়ে গবেষণা সরকারি ভাবে চালু করার দরকার রয়েছে. ব্যক্তিগত ভাবে যারা অর্থ বিনিয়োগ করে থাকেন, তাঁরা এই বিষয়ে আগ্রহী নন. হতে পারে যে, সাহসী অস্ট্রিয়ার নাগরিকের লাফ এবারে সরকারি কর্মচারীদের এই বিষয়ে ভাবিয়ে তুলবে.