অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী জুলিয়া গিল্লার্ড তাঁর তিন দিনের ভারত সফর শুরু করেছেন. দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ বহু দিনের ও মজবুত, আর সম্পর্কের চরিত্র যেমন দেখার মতো সাফল্য দিয়ে বর্ণনার যোগ্য, তেমনই তার থেকে কিছু কম নয়, এমন সব সমস্যায় সঙ্কুল.

শ্রীমতী গিল্লার্ড তাঁর ভারতীয় সহকর্মী শ্রী মনমোহন সিংহের সঙ্গে আলোচনার বিষয় বস্তু অনেক নিয়ে এসেছেন. সাফল্যের মধ্যে – বাণিজ্যের বিষয়ে দ্রুত উন্নতি, যা গত দশকে ছয় গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে ও আজ ২ হাজার কোটি ডলারের উপরে. প্রধান সমস্যা গুলির মধ্যে – অস্ট্রেলিয়া দেশে থাকা বহু সংখ্যক ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষদের সমস্যা. সেখানে প্রায় ৪৫ লক্ষ ভারতীয় লোকের বাস, তার মধ্যে ৩৬ হাজার ছাত্রছাত্রী. এই কয়েক বছর আগেও ভারতীয় ছাত্ররা প্রায়ই স্থানীয় বর্ণ বিদ্বেষী ও গুণ্ডাদের রক্তাক্ত নিধনের শিকার হয়েছিল. শ্রীমতী গিল্লার্ড, যিনি ২০০৭ থেকে ২০১০ সালে ছিলেন সেই দেশের উপ প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষা মন্ত্রী, তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়েছিল এই সমস্যার তীক্ষ্ণ রূপ কিছুটা ভোঁতা করার, কিন্তু এখনও অস্ট্রেলিয়াতে থাকা ভারতীয়রা নিজেদের সম্পূর্ণ নিরাপদ বলে ভাবতে পারে না.

কিন্তু এই ধরনের সমস্যা গুলি ও এমনকি ভারতীয় ক্রিকেটের তারকা শচীন তেণ্ডুলকরকে অস্ট্রেলিয়ার পদক দিয়ে সম্মানিত করাটাই আলোচনার মূল বিষয় বস্তু ছিল না মনে করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এখানে প্রধান ছিল অস্ট্রেলিয়া থেকে ভারতের সম্ভাব্য ইউরেনিয়াম কেনার বিষয়, যা তাদের নিজেদের পারমানবিক শক্তির বিকাশের জন্য প্রয়োজন. অস্ট্রেলিয়া দেশে বিশ্বের বৃহত্তম ইউরেনিয়াম খনি গুলি রয়েছে (বিশ্বের মোট সঞ্চয়ের প্রায় শতকরা ৪০ ভাগ). ভারত, নিজেদের পারমানবিক শক্তি বিষয়ে সক্রিয় ভাবে উন্নতির প্রসঙ্গে সব সময়েই ইউরেনিয়াম কাঁচামালের অভাব বোধ করেছে, কারণ নিজেদের খনি গুলি সামান্য কিছু বছর আগেই কাজ করতে শুরু করেছে, আর বিদেশী রাষ্ট্র গুলি এই কারণেই সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে যে, ভারত পারমানবিক নিরস্ত্রীকরণ চুক্তিতে স্বাক্ষর করে নি. তাই ভারতীয় পারমানবিক শক্তি উত্পাদনের জন্য প্রধান কাঁচামাল ছিল থোরিয়াম, যা উত্পাদনের ক্ষেত্রে ভারত আবার বিশ্বে নেতৃস্থানীয় অবস্থানে রয়েছে. গত বছরের ডিসেম্বরে অস্ট্রেলিয়ার ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি ভারতে ইউরেনিয়াম সরবরাহের বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে. আর প্রধানমন্ত্রী গিল্লার্ড তাঁর সফরে এই বিষয়ে কোনও দিক নির্দেশক সিদ্ধান্ত জানাবেন বলেই প্রত্যাশা ছিল”.

কিন্তু মঙ্গলবারে শ্রীমতী গিল্লার্ড ঘোষণা করেছেন যে, আসন্ন ভবিষ্যতে ইউরেনিয়াম সরবরাহ শুরু করা হবে না – আগে দরকার হবে এই ইউরেনিয়াম যে, সামরিক ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হবে না, সেই বিষয়ে গ্যারান্টি দেওয়ার জন্য চুক্তির. আর এই ধরনের চুক্তি তৈরীর জন্য সময় লাগতে পারে বছর দুয়েক পর্যন্ত.

এই প্রসঙ্গে বেশ কয়েকটি প্রশ্নের একই সঙ্গে উদয় হয়.

প্রথম প্রশ্ন: কে দ্রুত ইউরেনিয়াম সরবরাহের বিষয়ে বেশী আগ্রহী – ভারত না অস্ট্রেলিয়া? শেষমেষ, ভারত বেশ কয়েক দশক ধরেই সরবরাহের বিষয়ে বাধা নিষেধের সামনে পড়েও নিজেদের পারমানবিক শিল্পের উন্নতি করেছে. আর অন্ধ্র প্রদেশে খনি আবিষ্কারের পরে আরও কম বিদেশ থেকে কেনার বিষয়ে প্রয়োজন অনুভব করছে. বরং অস্ট্রেলিয়া ফুকুসিমা দূর্ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে, বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে পারমানবিক শক্তি ব্যবহারের বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা নেওয়াতে বড় সমস্যার সামনেই উপস্থিত হয়েছে, নিজেদের বিপুল পরিমানে ইউরেনিয়াম বিক্রীর ক্ষেত্রে. কিছু ভারতের পর্যবেক্ষক এই সূত্রে বলেছেন যে, ভারত অপেক্ষা করতে পারে ও তা পারবে যতদিন না অস্ট্রেলিয়া নিজেই তাকে ইউরেনিয়াম কেনার অনুরোধ না করে. আর সম্ভবতঃ, তাঁরা খুবই ঠিক.

আর দ্বিতীয় প্রশ্ন: অস্ট্রেলিয়া থেকে ইউরেনিয়াম কেনা নিয়ে আলোচনার পটভূমিতে রাশিয়ার সহায়তায় তৈরী কুদানকুলাম পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন কি রকমের দেখাচ্ছে? দেখা গেল যে, পারমানবিক শক্তি উত্পাদনের উন্নতির বিষয়ে ভারতে কেউই অমত করতে যাচ্ছেন না. দিল্লীতে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এই প্রসঙ্গে আলোচনার প্রতিবাদে কোনও গণ সমাবেশ বা মিছিল করা হচ্ছে না. তাহলে পাওয়া গেল যে, এটা পারমানবিক শক্তি বিষয়ে কোনও ব্যাপার নয়, বরং ভারতে ও তার বাইরে কারও মোটেও ভারতের এই বিষয়ে রাশিয়ার সঙ্গেই সহযোগিতা করা ব্যাপারটা ভাল লাগছে না.

কথাটা অবশ্যই অস্ট্রেলিয়া নিয়ে নয়, যাদের জন্য কম বেশী একই ব্যাপার হল যে, তাদের কাঁচামালের ব্যবহার কারা করবে. বরং সেই সব দেশের – আর প্রাথমিক ভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের, - যারা ভারতের পারমানবিক শক্তি উত্পাদনের সম্ভাবনাময় বাজারের দিকে তাকিয়ে রয়েছে ও খুবই চাইছে যে, সেখান থেকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী রাশিয়াকে ঠেলে বার করে দিতে.