বিশ্বে খনিজ তেলের দাম সোমবারে আস্তে ধীরে নামতেই থেকেছে – বিশ্লেষকরা এটাকে ব্যাখ্যা করেছেন ইরানের পররাষ্ট্র দপ্তরের সরকারি মুখপাত্র রহমান মেহমানপারাস্ত যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধি করা নিয়ে তাঁদের দেশের আলোচনায় প্রস্তুত থাকা সম্বন্ধে ঘোষণা করেছেন, তার সঙ্গেই জড়িত ঘটনা বলে.

জনাব মেহমানপারাস্ত বলেছেন যে, তেহরান তৈরী রয়েছে নমনীয়তা প্রদর্শনের জন্য, যাতে ঐস্লামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের পারমানবিক পরিকল্পনার সমস্যা সম্বন্ধে বিশ্ব সমাজের উদ্বেগের স্তর কমে আসে ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা নিয়ে আলোচনায় বসতে ইরান তৈরী আছে. সরকারি কর্মচারীর কথায় এই ধরনের অবস্থানের বিষয়ে নমনীয়তা দেখানো যেতেই পারে, যদি তেহরানকে গ্যারান্টি দেওয়া হয় যে, ঐস্লামিক রাষ্ট্র ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমানবিক পরিকল্পনার জন্য শতকরা ২০ শতাংশ সমৃদ্ধ করা ইউরেনিয়াম তাদের সরবরাহ করা হবে. মনে করিয়ে দিই যে, কিছুদিন আগে রাষ্ট্রপতি আহমাদিনিজাদ ঘোষণা করেছেন যে, ইরান এমনকি নিজে শতকরা কুড়ি ভাগ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম তৈরী করা বন্ধ করে দেবে, যদি আন্তর্জাতিক পারমানবিক শক্তি সংস্থা তাদের প্রয়োজনীয় পারমানবিক জ্বালানী তাদের দেয়.

আমাদের সমীক্ষক ভ্লাদিমির সাঝিন এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন.

সকলেরই জানা আছে যে, ইরানের পারমানবিক পরিকল্পনা ও খনিজ তেলের দাম সরাসরি যুক্ত. এই সমস্যার চারপাশ ঘিরে যত বেশী উত্তেজনার পারা চড়তে থাকে – দামই ততই চড়ে যায়. আবার উল্টো দিকে, যে কোন রকমের, এমনকি তা বাস্তবে না হলেও, সম্ভাব্য সহমতে পৌঁছনো নিয়ে কথাবার্তা এই মাত্রাকেই নীচে নামিয়ে আনে.

এটা আমরা ইরানের প্রতিনিধিদের আগে করা ঘোষণা গুলির ক্ষেত্রেও দেখেছি. কিন্তু খনিজ তেলের দাম পড়েছিল, বলা যেতে পারে পরিমানে খুবই সামান্য ও তা ঠিক করে বলা যেতে পারে একেবারেই “বিন্দু সদৃশ”. দামের আবারও নিজের জায়গা দখল করার সময় হবে. কারণ মনে করা যেতে পারে বেশ কয়েকটি. প্রথমতঃ, “ইরান – ছয় দেশের মধ্যস্থতাকারী” প্রতিনিধিদলের মধ্যে আলোচনা (রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্য দেশ ও জার্মানী) শুরু হতে পারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শেষ হওয়ার পরেই. খুব সম্ভবতঃ নভেম্বর মাসের শেষে – ডিসেম্বর মাসের শুরুতে. দ্বিতীয়তঃ, মনে তো হয় না যে, এই আলোচনা সহজ হবে. আলোচনার ক্ষেত্রে প্রস্তুত থাকা স্বত্ত্বেও, পক্ষ গুলি নানা ধরনের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়কে দেখছে, যাকে গণিতের ভাষায়, একে অপর পক্ষের কাজকর্মের পরম্পরা বিচার বলে, নাম দেওয়া যেতে পারে.

আগামী আলোচনার ক্ষেত্রে “ছয় দেশের” মধ্যস্থতাকারী দল তৈরী করছে নতুন এক উদ্যোগ, যা আগামী আলোচনার বিষয় হতে চলেছে. তেহরানকে একটি নকশা প্রস্তাব করা হবে, যাতে ইরানের পক্ষ থেকে প্রতিটি বিশ্বাস ও আস্থা ফিরিয়ে আনার কাজের জন্য একটি করে তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে. আর এটা খুবই সেই পদক্ষেপের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে, যা রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রী সের্গেই লাভরভ “স্টেপ বাই স্টেপ” নামে প্রস্তাব করেছিলেন.

রাশিয়ার সামাজিক-রাজনৈতিক গবেষণা কেন্দ্রের ডিরেক্টর ভ্লাদিমির ইভসেয়েভ মন্তব্য করে বলেছেন:

“তেহরানের প্রস্তাব, একই রকম ভাবে ধাপ পেরিয়ে, যা নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণ ভাবে প্রত্যাহারের জন্য নয়টি পদক্ষেপ দিয়ে তৈরী. কিন্তু তা শুধু মাত্র একটি ব্যতিক্রম দিয়ে: শুধুমাত্র ইরানের বিপক্ষ দের তরফ থেকে নয়টি ধাপের সব কটি করা হলেই ইরানের লোকরা তাদের মাটির নীচে ফোর্দো কারখানায় ইউরেনিয়াম শতকরা ২০ শতাংশ অবধি সমৃদ্ধ করা বন্ধ করবে. অর্থাত্ তেহরানের দাবী অনুযায়ী নিষেধাজ্ঞা পরে নয়, এমনকি তেহরানের পদক্ষেপ গুলির সঙ্গে পারস্পরিক পরম্পরা রেখেও তোলা হবে না, বরং প্রথম ধাপ নেওয়ার আগেই. প্রসঙ্গতঃ, শেষমেষ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা বন্ধ হবে, শুধু শেষ ধাপে ও ফোর্দো কারখানাতেই শুধু. কিন্তু এটাই আবার শেষ কথা নয়, ঐস্লামিক প্রজাতন্ত্র তৈরী রয়েছে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা শতকরা ২০ ভাগ পর্যন্ত বন্ধ করতে, যদি ইরানের এই ধরনের ইউরেনিয়াম যতটা প্রয়োজন, তা সরবরাহের গ্যারান্টি দেওয়া হয় আর সবচেয়ে বড় কথা হল – সমস্ত রকমের যন্ত্রপাতি তাদের জায়গাতেই রাখতে দিতে হবে, যাতে যে কোন সময়ে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা চালু করা যেতে পারে ও তা শতকরা ২০ ভাগের চেয়ে মাত্রায় বেশীও হতে পারে”.

স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে “ছয় পক্ষের” জন্য ইরানের এই অবস্থান গ্রহণযোগ্য নয়. তার ওপরে বর্তমানে যখন পশ্চিম, নিষেধাজ্ঞার সাফল্যে উল্লসিত হয়েছে, যা তাদের মতে ইরানের নেতৃত্বকে বাধ্য করেছে অন্তত পক্ষে কথায় হলেও কিছুটা নমনীয় অবস্থান নিতে, তাই আরও বেশী করেই তারা ইরানের উপরে নিষেধাজ্ঞা বাড়িয়ে দেবে.

আসন্ন দিন গুলিতে ইউরোপীয় সঙ্ঘ ঐস্লামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে আরও এক গুচ্ছ নিষেধাজ্ঞা নিতে চলেছে. নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্র এই বারে আরও অনেক গুলি ক্ষেত্র জুড়ে করা হবে: জ্বালানী (তার মধ্যে ইউরোপীয় সঙ্ঘের পক্ষ থেকে ইরানের প্রাকৃতিক গ্যাস কেনা বন্ধ করা), বাণিজ্য, বিনিয়োগ ক্ষেত্র, পরিবহন, টেলিযোগাযোগ. তেহরানে এই ধরনের ব্যবস্থা কি ভাবে গৃহীত হবে, তার ওপরে নির্ভর করবে খনিজ তেলের বাজারের পরবর্তী কালের হালচাল.

যে কোন ক্ষেত্রেই হোক সত্য উদ্ভাসিত হবে ইরানের সঙ্গে “ছয় পক্ষের” প্রতিনিধি দলের আলোচনার সময়েই. বিশ্বের খনিজ তেল বাজারের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে, এই ধরনের আলোচনায় কোন সুরাহা হলে বছরের শেষে খনিজ তেলের দাম অনেকটাই কমে যাবে. আর রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা সাবধান করে দিচ্ছেন যে, এই ধরনের ইতিবাচক ঘটনা পরম্পরা আদতে হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম. আর ইরানের পারমানবিক পরিকল্পনা, খুব সম্ভবতঃ, আরও অনেকদিন ধরেই খনিজ তেলের বাজারকে দোলাতে থাকবে.