প্রিয় শ্রোতারা, আমাদের সাপ্তাহিক অনুষ্ঠাণ শুনছেন আপনারা ‘রাশিয়ার আদ্যপান্ত’. স্টুডিওয় ভাষ্যকার কৌশিক দাস. এই অনুষ্ঠানে আমরা আপনাদের জন্য আগ্রহদ্দীপক রাশিয়া সম্পর্কে প্রশ্নাবলীর উত্তর দিয়ে থাকি.

তাই আমরা ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও মরিশাসের শ্রোতাদের অনুরোধ জানাচ্ছি, যে যত বেশিসম্ভব প্রশ্ন আমাদের পাঠান. লিখুন কি আপনারা জানতে চান.

আর আমরা চেষ্টা করবো আপনাদের সব জিজ্ঞাসার উত্তর দিতে.

আজ আমরা নিম্নোক্ত প্রশ্নগুলির উত্তর দেবঃ

রাশিয়ায় শ্যুটিং করা কোন ফিল্মটি সবচেয়ে দামী. কে ছিল পরিচালক? এই প্রশ্নটা পাঠিয়েছেন ছত্তিশগড় রাজ্য থেকে পারাস রাম শ্রীবাস. আর পশ্চিমবঙ্গের বালিচক থেকে পঙ্কজ বিহানি রাশিয়ার সিনেম্যাটোগ্রাফির উপর সবৃত্তান্তে জানতে চেয়েছেন. সুতরাং আমাদের আশা এই, যে তার জন্যও সবচেয়ে দামী ফিল্মের বৃত্তান্ত আগ্রহোদ্দীপক হবে.

বড় পরিবার কি পুরস্কার পায় – জানতে চেয়েছে কোডার্মা থেকে অনুভা.

অতএব এখন আমরা সবিস্তারে জানাবো রাশিয়ার সিনেমাটোগ্রাফির ইতিহাস.

আমাদের দেশে সবচেয়ে দামী ফিল্ম ছিল লেভ তলস্তোয়ের রচনার ভিত্তিতে শ্যুটিং করা ফিল্ম ‘ওয়ার এ্যান্ড পিস’. সোভিয়েত ইউনিয়নে পরিচালক সের্গেই বন্দারচুক ১৯৬৫ সাল থেকে ৬ বছর ধরে ঐ ফিল্মের শ্যুটিং করেছিলেন. এটা ছিল অসামান্যা অভিনেত্রী অউড্রি হেপবার্ন অভিনীত আমেরিকান ‘ওয়ার এ্যান্ড্ পিস’ ফিল্মের প্রত্যুত্তর, যে ফিল্ম রিলিজ করেছিল ১৯৫৬ সালে. পরিচালকের কর্তব্য ছিল রুশী আদলে ফিল্ম বানানো, যেরকম বর্ণনা দিয়েছিলেন স্বয়ং তলস্তোয়. হলিউডে বানানো ফিল্মটি চমত্কার, কিন্তু রুশী আদলে বানানো নয়, যদিও নাতাশা রস্তোভার ভূমিকায় অউড্রি হেপবার্ন রুশী দর্শকদের মুগ্ধ করেছিলেন.

এখানে সংক্ষেপে লেভ তলস্তোয়ের উপন্যাসটি সম্পর্কে জানাতে চাই. কারণ আমাদের শ্রোতাদের মধ্যে অনেকেই উপন্যাসটি পড়েনি ও ফিল্মও দেখেনি. ঐ উপন্যাসে আছে কয়েকটি রুশী পরিবারের ভবিতব্যের বর্ণনা, যারা ৬ লাখ সৈনিকের ফৌজ নিয়ে রাশিয়া আক্রমণকারী নেপোলিয়নের বিরূদ্ধে লড়েছিল. রুশী ফৌজ সংখ্যার দিক থেকে ছিল অনেক কম, আক্রমণও নেপোলিয়ন করেছিল আচমকা. তাই রুশীরা শুরুতে ক্রমশঃ জমি ছাড়ছিল. মস্কো নগরীর ১২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বরদিনো প্রান্তরে ফরাসীদের সাথে চূড়ান্ত লড়াই করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল. ১৮১২ সালের ৭ই সেপ্টেম্বর ওখানে রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে নিহত হয়েছিল ৩৮ হাজার রুশী ও ৫৮ হাজার ফরাসী.

বরদিনো প্রান্তরে লড়াই উপন্যাসটির অন্যতম মুখ্য বিষয়. ও এর শ্যুটিয়ে বহু সময় লেগেছিল ও প্রচুর অর্থ খরচা করতে হযেছিল.

‘ওয়ার এ্যান্ড পিস’ ফিল্মের ব্যাপারে সোভিয়েত ইউনিয়নে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল. সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় দেশের মিউজিয়ামগুলি থেকে উনবিংশ শতাব্দীর সূচনায় ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিষপত্র নেওয়ার অনুমতি দিয়েছিল আর লঘুশিল্প মন্ত্রণালয় রুশী ও ফরাসী মিলিটারি অফিসারদের জন্য সে যুগের ভারী ভারী সব পোষাক সেলাই করে দিয়েছিল. সরকার তখন অনেক ঘোড়া ও বিশেষ সৈনিকদেরও ফিল্মের শ্যুটিংয়ের জন্য যোগান দিয়েছিল.

বরদিনো প্রন্তরে লড়াইয়ের শ্যুটিংয়ে অংশ নিয়েছিল সাড়ে ১৩ হাজার পদাতিক সৈনিক ও দেড় হাজার অশ্বারোহী. তাদের প্রত্যেকের ছিল সেই সময়কার অস্ত্রশস্ত্র ও পোষাক-আষাক. লড়াইয়ের শ্যুটিংয়ে ২৩ টন বিস্ফোরক দ্রব্য ও ৪০ হাজার লিটার কেরোসিন খরচা করা হয়েছিল, ১২ হাজার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছিল.

আর মুখ্য ভূমিকায় সে সময়কার সেরা সব অভিনেতাকে নেওয়া হয়েছিল. সের্গেই বন্দারচুক নির্মিত ‘ওয়ার এ্যান্ড পিস’ আমাদের সিনেমাটোগ্রাফির অন্যতম প্রধান দৌলত.

ঐ ফিল্মটির নির্মানের খাতে বিপুল সরকারী অর্থ খরচ করা হয়েছিল. এখনো পর্যন্ত এটাই আমাদের সবচেয়ে দামী ফিল্ম.

সোভিয়েত ফিল্ম ‘ওয়ার এ্যান্ড পিসে’র চারটে পরিচ্ছেদ, যার মধ্যে একটি বিদেশী ভাষায় সেরা ফিল্ম হিসাবে অস্কারে ভূষিত হয়েছিল. ঐ ফিল্মটি গীনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে স্থান পেয়েছে ১ লক্ষ ২০ হাজার সংখ্যার নেপথ্য অভিনেতার জন্য – সৈনিক, অফিসার, কৃষকরা.

ভারত ও পাকিস্তানের গ্রন্থালয়গুলিতে এই উপন্যাটি রয়েছে. আমি অন্ততঃ সংক্ষিপ্ত সংস্করনে ‘ওয়ার এ্যান্ড পিস’ পড়বার পরামর্শ দেব আপনাদের.

এবার ঝাড়খন্ড রাজ্যের কোডার্মা খেকে মিস অনুভার পাঠানো প্রশ্নের উত্তর দেব – রাশিয়ায় বহু সন্তানের পরিবারকে কিরকম পুরস্কার দেওয়া হয়?

আমাদের দেশে বহুসন্তানের পরিবারের বিশেষ মর্যাদা. ৬৫ বছর আগে ২য় বিশ্বযুদ্ধের শেষে বহুসন্তানের জননীদের পুরস্কার প্রদান করা শুরু হয়. সোভিয়েত ইউনিয়ন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার আগে পর্যন্ত ৫-৬টি সন্তানকে পালন করার জন্য ‘মাতৃপদকে’ ভূষিত করা হতো, আর যে জননী ৭টা থেকে ৯টা সন্তানের জন্ম দিয়েছে ও লালন-পালন করেছে, তাকে ‘মাতৃগর্ব’ নামক পদক. যে মহিলার ১০টিরও বেশি সন্তান থাকতো, সে ‘মা-বীরাঙ্গনা’ নামক পদক পেতো.

ইদানীং সব পদকের নাম বদলে গেছে. আজকাল বহুসন্তানবর্তী পরিবারদের দেওয়া হয় ‘পিতামাতার গৌরব’ নামক পদক.

এই বছরের ২রা জুন রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন ৮টি অঞ্চলের বহুসন্তানবর্তী পরিবার, যেখানে ১৮ বছর বয়সের কম ৭টির বেশি সন্তান, তাদের আপ্যায়ন করে পদক অর্পন করেছেন. অনাথাশ্রম থেকে গ্রহণ করা শিশুদের সংখ্যাও সেখানে গণ্য করা হয়েছে. পদক প্রদানের অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়েছিল ক্রেমলিনের সবচেযে সুন্দর হল – আলেক্সান্দ্রভস্কিতে ও উত্সব উত্সর্গীত ছিল আন্তর্জাতিক শিশুসুরক্ষা দিবসের প্রতি.

পিতামাতাদের পদক ও সম্মান – এটা ভালো জিনিষ বটে, কিন্তু জানানো দরকার যে বহুসন্তানবর্তী পরিবার কি বেনিফিট পায়.

রাশিয়ায় বহুসন্তানবর্তী পরিবার, যেখানে ১৮ বছরের কমবয়সী ৩টি শিশু আছে. তারা স্কুলের ক্যান্টিনে বিনাপয়সায় খেতে পায়, স্কুলের ইউনিফর্ম পায় বিনাপয়সায়, সরকারী যানবাহনে বিনামূল্যে চড়তে পারে.

৬ বছর পর্যন্ত ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনের ভিত্তিতে সব ওষুধপত্র বিনাপয়সায় দেওয়া হয়.

বাড়ির ইউটিলিটি, ইলেকট্রিক বিল, গ্যাস, গরম জল ও ঠান্ডা জল ব্যবহারের জন্য ঐ সব পরিবার ৩০ শতাংশ ছাড় পায়. গ্রামাঞ্চলে যদি কৃষিকার্যে নিয়োজিত হতে চায়, তবে তাদের কর দিতে হয় না ও ব্যাঙ্ক থেকে বিনা সূদে তারা ঋণ পেতে পারে এমনকি বাড়িঘর বাড়ানোর জন্যেও. প্রত্যেক অঞ্চলে বাড়তি বেনিফিটও আছে.

আমাদের রাশিয়ার আদ্যপান্ত নামক অনুষ্ঠাণ এখানেই শেষ করছি. আপনাদের কাছ থেকে নতুন নতুন প্রশ্ন ও চিঠির অপেক্ষায় থাকবো. আমাদের ঠিকানা – ভারত ও পাকিস্তানে সম্প্রচার বিভাগ, রেডিও রাশিয়া, ২৫ নং প্যাতনিতস্কি স্ট্রীট, মস্কো. আমাদের ইন্টারনেট ঠিকানা – Letters a RUVR.RU