মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আমেরিকা-চীন সম্পর্ক এখন বিতর্কে প্রকোপিত হচ্ছে. নির্বাচনের প্রার্থীরা বেইজিং এর উদ্দেশ্যে কঠোর বিবৃতি দিয়েছেন. এদিকে রাশিয়ার কূটনৈতিক একাডেমীর সহকারী প্রক্টোর আলেকসান্দার লুকিন চীনের বিরুদ্ধে ওই বিবৃতিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী প্রচারনায় এক নিয়মিত ঘটনা বলে উল্লেখ করেছেন. রেডিও রাশিয়ার জন্য তাঁর লেখা বিশেষ প্রতিবেদনে এই প্রশ্নেরই তিনি উত্তর খুঁজেছেন.

চীনা বিরোধী সংলাপকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন মার্কিন রিপাবলিকান দলের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী মিত রমনি. তিনি বানিজ্যের কেলেঙ্কারীর জন্য চীনকে দোষী করেন. সত্য হলেও মিত রমনি নিজের আয়কর বিবরণী প্রকাশ করেছেন, কিন্তু এক সময় তিনি চীনা ভিডিও হোস্টিং youku.com এর শেয়ারের শরিক ছিলেন. আর এরই সুযোগ নিয়ে ডেমোক্রেটিক দলের প্রার্থীরা রমনির সমালোচনা করেছেন.

বারাক ওবামাও চীনের বিপক্ষে নিজের কঠোর দৃষ্টিভঙ্গীর পরিচয় দিয়েছেন. ২০১২ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ওবামা চীনা ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রিত জেনারেটর নির্মাণ কোম্পানী রালস কর্পোরেশন বন্ধ করে দিয়েছেন. ওই কোম্পানীর অবস্থান ছিল অরিয়ন রাজ্যের সেনা-নৌ দপ্তরের কাছেই.

চীনকে দোষী করার ওই দৌড় প্রতিযোগিতায় যোগ দিয়েছে কংগ্রেস. চীনা কোম্পনী Huawei Technologies এবং ZTE Ltd. এর কার্যক্রমকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে দাবী করেছে তারা এবং ওই সব প্রতিষ্ঠানের উত্পাদিত পণ্য হয়ত গোয়েন্দার কাজে ব্যবহার করা হতে পারে বলে মন্তব্য করা হয়.

আসলেই কি তা সত্যি?. তাহলে প্রথম যুক্তি দিয়েই শুরু করছি. ‘চীনা গোয়েন্দা’ এ আলোচিত বিবৃতি মার্কিন রাজনীতির আলোচনায় প্রথম নয়. চীনা কোম্পানী ও তাদের কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কি গোয়েন্দা কাজে জড়িত হতে পারেন?. অবশ্যই, হতে পারেন. তবে তা মার্কিন কোম্পানী, তাদের কর্মকর্তা এবং এমনকি অন্য দেশও তা করতে পারে. এখানে সমস্যা শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কোন কোম্পানীর জন্যই নয় বরং যুক্তরাষ্ট্রে চীনকে মনে করা হয় নিজেদের শত্রু রাষ্ট্র হিসেবে. অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যুক্তরাজ্য, কানাডা বা ফরাসী কোম্পানীর বিরুদ্ধে তো কোন অভিযোগ নেই. সুতরাং, চীনা শীর্ষ কোম্পানী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করছে, এ কথা যা প্রতিযোগিতামূলক বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের পিছিয়ে পড়াকে ঢাকার জন্যই বলা হচ্ছে.

অন্যদিকে চীনা মুদ্রা ইউয়ান এর কথা বলতে হলে দেখা যাচ্ছে, চীনা কর্তৃপক্ষ তাদের পণ্যের রপ্তানী কাজে নিজেদের মুদ্রা ব্যবহার করছে. এ দৃষ্টি থেকে ওয়াশিংটনের কিছু অধিকার রয়েছে কারণ নিজেরাই অনেক সময় এই কৌশল অবলম্বন করে থাকে. বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্ফীতি তার কারণ এটিই নয়. মূলত চীনে শ্রমমূল্য অনেক সস্তা এবং এ করণেই পণ্যের দামও অনেক কম. এ কারণেই মার্কিন কোম্পানী এগুলো আমদানি করছে এবং ভোক্তারা তা কিনছে. এক্ষেত্রে একটি ঘটনা না বললেই নয়. যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা সম্বলিত মার্কিন অলিম্পিক খেলোয়াড়দের পোষাক ও মার্কিন সুভ্যিনির এ লেখা ছিল ‘চীনে তৈরী’. এর একটি সহজ কারণ ছিল, যুক্তরাষ্ট্রে এগুলো তৈরী করতে অনেক বেশী খরচ হত.

চীনা পণ্যের সস্তা দাম তা সবসময় বিদেশী মূদ্রার ওপরই নির্ভর করে না বরং দেশটির শ্রম আইনও এর সাথে জড়িত. যেমন, ছুটি ছাড়াই চীনা শ্রমিকরা অল্প বেতনেই কাজ করতে প্রস্তুত এবং এমনকি পশ্চিমা দেশের মত কোন সামাজিক নিরাপত্তাও তাদের নেই. সত্য যে, পশ্চিমা দেশগুলো ও যুক্তরাষ্ট্র পণ্য উত্পাদনের চেয়ে অন্যদের কাছে ক্রয় করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে. অন্যদিকে, চীনে সম্পূর্ণ এর বিপরীত. সেখানে ভোগের চেয়ে জমা বেশী করা হয়ে থাকে. এ কারণে দেশের বাজার সংকীর্ণ থাকায় চীনাদের রপ্তানীর দিকেই নির্ভর করতে হচ্ছে.

অর্থনৈতিক দিক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র অনেক অর্থেই চীনের ওপর এবং চীনও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল. বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের দিক থেকে চীন বিশ্বে প্রথম স্থানে রয়েছ এবং ১ ত্রিলিয়ন এরও বেশী মার্কিন ডলার চীনে মজুদ রয়েছে. ফলে দেখা যাচ্ছে, মার্কিনীরা চীন থেকে অর্থ ধার করে তা দিয়ে চীনা পণ্য কিনছে এবং যা তারা নিজেরা আয় করে নি. চীনের বিরুদ্ধে নেওয়া এ সিদ্ধান্ত হয়ত নিজেদের অর্থনীতিতে মন্দা ডেকে আনতে পারে. একদিকে চীন যেমন মার্কিন মুদ্রা চালু করতে পারছে না অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র কেনভাবেই মূল্যস্ফীতি কমাতে পারছে না. তাছাড়া চীনা রপ্তানীকে সংকুচিত করা যা ইউরোপে অর্থনৈতিক মন্দা আরও ছড়িয়ে পরবে. সুতরাং নিজ নিজ দেশের স্বাভাবিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য তারা একে অপরের উপর নির্ভরশীল.

এমন পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন ও বেইজিং এর মধ্যে বৈরী সম্পর্ক অব্যাহত রয়েছে.

নির্বাচনের আগে প্রার্থীরা চীনা রাজনীতির সমালোচনা করবেন এবং দায়িত্ব নেওয়ার পরই নিজেদের ওই বিবৃতির পরিবর্তন ঘটাবেন. সত্যিকার অর্থে অর্থনৈতিক স্বার্থ ও গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলোর প্রভাব যা তাদের বাধ্য করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রে অনেকবার এ ধরণের ঘটনা ঘটেছে.