আজ সারা পাকিস্তান, আর হ্যাঁ, সমস্ত স্বাভাবিক লোকই সারা বিশ্ব জুড়ে ১৪ বছরের পাকিস্তানী মেয়ে মালালে ইউসুফজাই যাতে ভাল হয়ে ওঠে, তাই প্রার্থনা করছে, যাকে স্কুল থেকে বাড়ী ফেরার পথে তালিব গুণ্ডারা খুবই গভীর আঘাত করেছিল গুলি করে. মেয়েটিকে রাওয়ালপিণ্ডি শহরের সামরিক হাসপাতালে আনা হয়েছে, তার শরীর থেকে গুলি বের করার জন্য খুবই কঠিন অপারেশন করা হয়েছে, এখনও সে রয়েছে খুবই সঙ্কট জনক অবস্থায়.

বৃহস্পতিবারে ৫০ জন ঐস্লামিক ধর্ম বিষয়ে বিজ্ঞানী ব্যক্তি যাঁরা “সুন্নী ইত্তেহাদ কাউন্সিলের” সদস্য, তাঁরা মালালে হত্যার যে প্রচেষ্টা তালিব জঙ্গীরা করেছে, তাকে ইসলামের পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেছেন. আর স্থানীয় খাইবার- পাখতুন্খবা রাজ্যের সরকার ১ কোটি পাকিস্তানী রুপি (১ লক্ষ ৫ হাজার ডলারের সমান) পুরস্কার ঘোষণা করেছেন এই সব আক্রমণকারীদের খোঁজ খবরের বিনিময়ে. মনে হতে পারে যে, এর পরে আর কিছুই যোগ করার নেই. মেয়েটিকে শুধু একটাই শুভ কামনা জানানো যেতে পারে: দ্রুত আরোগ্য. অপরাধীদের ধরতেই হবে ও তাদের সমস্ত রকমের কড়া শাস্তিও দিতেই হবে.

কিন্তু এই পুরো ইতিহাসে কয়েকটি জায়গা রয়েছে, যা মনে করতে বাধ্য করে যে, এই মালালে যে সব অসুখে পড়েছে, তার জন্য শুধু সেই অপরাধের আয়োজকরাই দোষী নয়, যারা তেহরিক ও তালিবান পাকিস্তান দলের জঙ্গী সদস্য, বরং তারাও, যারা বেশ কয়েক বছর ধরেই এই প্ররোচনা তৈরী করেছে, আর আজ চেষ্টা করছে নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সেটা ব্যবহার করতে.

মনে করিয়ে দিই যে, সব শুরু হয়েছিল সেই ২০০৭ সালে, যখন সোয়াত উপত্যকা, যেখানে মালালে পরিবার বাস করত (মেয়েটির বাবা – একটি বেসরকারি স্কুলের মালিক ও প্রধান শিক্ষক), বাস্তবে “তেহরিক এ তালিবান পাকিস্তান” দলের জঙ্গীদের অধীনে চলে গিয়েছিল, যারা সেখানে ততদিন অবধি রাজত্ব করেছে, যতদিন না ২০০৯ সালে পাকিস্তানের সরকারি সেনাবাহিনী তাদেরকে সেখান থেকে সরে যেতে বাধ্য করেছিল. তালিবরা, স্বাভাবিক ভাবেই, সেখানে চাপিয়ে দিয়েছিল খুবই কড়া সব শৃঙ্খলা ব্যবস্থা ( যেগুলিকে তারা নিজেরা ঐস্লামিক বলে প্রচার করে), তার মধ্যে মেয়েদের স্কুলে যাওয়াতে নিষেধও ছিল. মালালে, যার ২০০৯ সালে ১১ বছর বয়স ছিল – সে একটা ডায়েরি লিখতে শুরু করেছিল, যাতে তার নিজের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা সে লিখে রাখত, যেখানে থাকত নিজের চারপাশের পরিস্থিতি দেখে কষ্টের কথা.

২০০৯ সালে এই ডায়েরি থেকে কিছুটা অংশ বিবিসি সংস্থার উর্দু ভাষার সাইটে প্রকাশ করা হয়েছিল, আর ঠিক তখন থেকেই মালালে নামটি বিখ্যাত হয়ে ওঠে. আর ঠিক তার পর থেকেই সেই সমস্ত লোক জুটে গিয়েছিল, যারা এক সাধারন মেয়েকে প্রায় সারা বিশ্বের নারীবাদী আন্দোলনের প্রতীক বানিয়ে দিয়েছিল.

যারা এই ডায়েরি মন দিয়ে পড়েছেন, তারা লক্ষ্য করে থাকবেন যে, সেখানে সবচেয়ে বেশী বার পুনরাবৃত্তি হওয়া শব্দ ছিল – আমি ভয় পাচ্ছি, আমার ভয় করছে. আর এটা খুবই বোধগম্য: স্পষ্ট শত্রু ও আগ্রাসী শক্তির সম্মুখে উপস্থিত হয়ে যে কেউ, সে শুধু এই ১১ বছরের মেয়েটিই নয়, ভয় পেতে বাধ্য.

কিন্তু, দেখা গলে যে, কারও খুবই লাভ হয়েছে এই ভয়কে নিয়ে খেলা করতে গিয়ে. আর সক্রিয়ভাবে মালালের নাম প্রচার করতে যাওয়ায় সেটা তার জন্যই হিতে বিপরীত হয়েছে. জঙ্গীরা, যারা নিজেদের নাম দিয়েছে পাকিস্তানের তালিব বলে ও যারা বলে বেড়ায় যে, শুধু তারাই জানে ইসলামের নিয়ম কি, স্বাভাবিক ভাবেই এই শিশুর বিরুদ্ধে ঘোঁট পাকিয়েছে, যার ফল হয়েছে এই হত্যা প্রচেষ্টা.

কিন্তু এখানে হিসেবের মধ্যে নিতে হবে যে, এই ধরনের কাজকর্ম কোন রকমের ইসলামের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে না, যেমন খ্রীষ্টান ধর্মের সঙ্গে কোন সম্পর্ক নেই আমেরিকার সেই প্যাস্টর টেরি জোনসের কাজকর্মের, যে কোরান পোড়ায় ও মুসলমানেরা নির্দোষ নামের সিনেমা প্রচার করে. গুণ্ডা বদমাশদের কোন ধর্ম হয় না.

কিন্তু এই হত্যা প্রচেষ্টা নিজের কাজ ঠিকই করেছে. পাকিস্তানের তালিবদের বিরুদ্ধে সবাই এককাট্টা হয়েছে. এই প্রসঙ্গে খুব কম লোকই এখন পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের তালিবদের মধ্যে কোন তফাত দেখতে পাচ্ছেন, যদিও একেবারেই আলাদা আন্দোলন. এই ভাবেই প্রচারের আঘাত, যা কয়েকজন গুণ্ডার কাজের প্রতি ক্ষোভের ঢেউ ডেকে এনেছে, তা এখন সমস্ত তালিবদের গোষ্ঠীর উপরেই পড়েছে, আর এখান থেকে সারা পশ্চিম জুড়ে নতুন করে ইসলাম বিরোধী ঢেউয়ের নতুন তরঙ্গের আগমনের আর দেরী বেশী নেই, এমনকি সেই স্ক্যান্ডাল জাগানো সিনেমার স্রষ্টাদেরও হয়ত নির্দোষ বানানোর প্রচেষ্টা হবে.

সুতরাং শুধু একটাই উত্তর রয়েছে সেই প্রশ্নের: মালালে ইউসুফজাই হত্যা প্রচেষ্টা কার জন্য লাভজনক হয়েছে ? এটাকে নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে চাওয়া শক্তির সংখ্যা অনেক বেশী, আর তাদের এই হতভাগ্য মেয়েটির জীবন নিয়ে কোন চিন্তাই নেই.

যখন কেউ বাঘের খাঁচায় বাচ্চাকে ঠেলে দেয়, তখন শুধু বাঘকেই দোষী বললে কি ঠিক হয়?

লেখকের মন্তব্য রেডিও রাশিয়ার সম্পাদকীয় বিভাগের মন্তব্যের সঙ্গে এক নাও হতে পারে.