শব্দ ও ছবির মাধ্যমে নৃতত্ত্ববিদ্যা বিষয়ে চতুর্থ আন্তর্জাতিক উত্সব “নৃতাত্ত্বিক সিনেমার দিনগুলিতে”, এই উত্সব এক অসাধারণ প্রকল্প এবারে তুলে ধরেছে – “ভারতের নৃতাত্ত্বিক সিনেমা: প্রতীক সমষ্টি, স্মৃতি, কল্পনা” নামে. রাশিয়ার দর্শকরা প্রথমবার ভারতের উত্তর পূর্বের জীবন ও সংস্কৃতিকে দেখতে ও স্পর্শ করতে পেরেছেন, অথবা, তাকে - যা প্রায়ই গবেষকরা নাম দিয়ে থাকেন ভারতবর্ষের “অনাবিষ্কৃত স্বর্গ” বলে.

অরুণাচল প্রদেশ, আসাম, মেঘালয়, মণিপুর, মিজোরাম, নাগাল্যাণ্ড, ত্রিপুরা – সাতটি ভগ্নীসমা রাজ্য – যদিও প্রতি নতুন বছরের সঙ্গেই আরও বেশী করে পর্যটকদের আকর্ষণের কারণ হচ্ছে, তবুও আগের মতই অনেক বেশী করেই ভারতের মূল ভূখণ্ডের মানুষদের জন্য রয়ে যাচ্ছে বন্ধ হয়ে. রাশিয়ার লোকদের সম্বন্ধে এই বিষয়ে আর উল্লেখ করে কি বা হতে পারে, কারণ এই দেশের নাগরিকদের জন্য সপ্ত ভগিনী রাজ্যে যাওয়ার জন্য দিল্লীর পর্যটন দপ্তরে আবার আলাদা করে বিশেষ ছাড়পত্র পেতে হয়. তাও রাশিয়ার বিজ্ঞানীদের পক্ষে শুধু নিজেরাই এই সব জায়গায় যেতে পারা সম্ভব হয় নি, বরং মস্কোর দর্শকদের এই “অনাবিষ্কৃত স্বর্গ” রাজ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়াও সম্ভব হয়েছে.

লাডলী মুখোপাধ্যায়ের সিনেমা “আচুলী” নিবেদিত হয়েছে সিকিম রাজ্যের কমে আসা লেপচা উপজাতি ভুক্ত মানুষদের উদ্দেশ্যে. “আচুলী” লেপচা ভাষা থেকে অনুবাদ করলে অর্থ হয় “জয় হো অথবা তোমার জয় হোক” বলে. পরিচালক নিজে যেমন ব্যাখ্যা করে বলেছেন এই সিনেমাকে পরিবেশ সংরক্ষণ সংক্রান্তও বলা যেতে পারে – তাতে লেপচা ব্যক্তিরা বলেছেন যে, সিকিম রাজ্যে খুবই সক্রিয়ভাবে তৈরী হচ্ছে গাড়ী চলার রাস্তা ও শিল্পের উপযুক্ত কারখানা, যার ফলে এখানের উপজাতি সম্প্রদায়কে তাঁদের নিজেদের ঐতিহাসিক ভাবে থাকার জায়গা ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে. যাতে পৃথিবীর পিঠ থেকেই নিজেরা মুছে না যান, তাই লেপচা মানুষরা জেনেশুনেই সভ্যতার কিছু সুবিধা নিতে চান নি, তাঁরা নিজেদের রীতিনীতি মেনেই চলছেন, তাঁদের লোকগাথা সংরক্ষণ করছেন ও এমনকি নিজেদের ভাষার শব্দকোষও তৈরী করেছেন.

“মেলা” নামের সিনেমায় পরিচালক গল্প করেছেন বঙ্গ দেশের অচ্ছুত ও সমাজের প্রান্তিক লোকজনদের নিয়ে. একদা বঙ্গ দেশের প্রত্যন্ত জনের মেলায় অনুভব যোগ্য সেই ধর্মীয় অর্থই আর নেই, তার বদলে এসেছে শুধু উত্সব, যেখানে শুধু মাঠের কৃষিকর্ম থেকে কিছুটা বিশ্রাম নেওয়া যায়: কিছু নাগরদোলাতে দোল খাওয়া সম্ভব হয়, কিছু ঠুনকো জিনিষ কিনতে পারা যায়, সুস্বাদু খাবার পাওয়া যায় আর তারই সঙ্গে শুনতে পাওয়া যায় জনতার ভীড়ে মেশা বৈষ্ণব বাউল ফকীরদের গান, যাঁরা শত বত্সরের পুরনো গানকে আবার করে শুনিয়ে দিয়ে যান.

মেলার বিশ্বে জাতি বর্ণ ভেদের প্রথা ও লিঙ্গ বিভেদের ব্যবস্থা বর্তমানে হারিয়ে যেতে বসেছে – এখানে সাম্যের জয় গানই করা হয়ে থাকে. “মেলা” সিনেমার স্রষ্টারা বিশেষ করে উল্লেখ করেছেন যে, এই সিনেমা তোলা হয়েছে স্বাধীনতার আত্মার নামে ও তা উত্সর্গ করা হয়েছে সমস্ত প্রান্তিক মানুষের প্রতি. লাডলী মুখোপাধ্যায় এই সিনেমার পরে আলোচনা সভায় দর্শকদের ও রেডিও রাশিয়ার শ্রোতাদের জন্য বলেছেন:

“ভারতের ও বিশ্বের অনেক জায়গায় আগে আমি গেলেও, আমি আগে কখনও মস্কো আসি নি, এবারে আমন্ত্রণ করায় এসেছি, আমার খুবই ভাল লাগছে রুশ দর্শকদের প্রতিক্রিয়া দেখে. আমি সাধারণত রাজনৈতিক ও সামাজিক সিনেমাই করে থাকি, আমার বিশেষ মনোযোগ এই সব প্রান্তিক মানুষদের অধিকারের প্রশ্ন নিয়েই, যাঁরা আজও অবহেলিত হয়ে আছেন. আমি সঙ্গীতও ভালবাসি. তাই সঙ্গীতও আমার সিনেমায় প্রতিফলিত হয়েছে”.

ভারতের এক ছোট্ট রাজ্য নাগাল্যাণ্ড – এটি জাতীয় আত্ম চেতনার এক উজ্জ্বল উদাহরণ. এই রাজ্যে বাস করেন প্রায় ৪২ রকমের উপজাতি, যাঁরা নাগা গোষ্ঠীর লোক. প্রত্যেকেরই রয়েছে নিজস্ব সাংস্কৃতিক বিশেষত্ব ও তাঁরা কথা বলেন প্রত্যেক আলাদা উপজাতি নিজেদের ভাষাতেই, যা অন্য উপজাতির লোকরা বুঝতে পারেন না. এঁদের নিয়ে নিজেদের তোলা এক সিনেমা সম্বন্ধে বলেছেন এই গোষ্ঠীরই প্রতিনিধি মাও সুবঙ্গ ও আরেনলা এম. সুবঙ্গ, তাঁরা আবার স্বামী ও স্ত্রী, তাঁরা যোগ করেছেন:

“আমরা মস্কো আসতে পেরে খুব খুশী হয়েছি, আমরা সিনেমা তোলা ছাড়াও সঙ্গীত চর্চাও করে থাকি, আমাদের একটি সঙ্গীতের দলও রয়েছে”.

ভারতের উত্তর পূর্বের রাজ্য গুলির সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার দিনের শেষে এই অনুষ্ঠানের আয়োজক নৃতাত্ত্বিক ও রাশিয়ার বিজ্ঞান একাডেমী থেকে ইতিহাসে ডক্টরেট স্ভেতলানা রীঝাকোভা দর্শকদের আরও একটি বিশেষ সিনেমা “নাচনি” দেখার সুযোগ করে দিয়েছেন. এই সিনেমা তোলার জন্য পরিচালক লাডলী মুখোপাধ্যায়কে অচ্ছুত “নাচনি” মেয়েদের সমাজের মধ্যে সভ্য সমাজের বাধা পেরিয়ে সম্পূর্ণ রকম ভাবে ডুবে যেতে হয়েছিল, যারা বিভিন্ন গ্রামে ছাড়াছাড়ি ভাবে আলাদা করে আজও বেঁচে আছেন. সুদূর অতীতে এই “নাচনি” সম্প্রদায়ের মেয়েরা রাজা বাদশাহদের সভায় নাচ গান করতেন, আর এখন তাঁরাই গ্রামে রাত্রি বেলায় নাচগানের সন্ধ্যা আয়োজন করে থাকেন, সামান্য কদাচিতই পাওয়া অর্থ ও ভিক্ষা করেই এঁদের দিন গুজরান হয়ে থাকে. পরিচালক এই সমাজের সঙ্গে পরিচয় করার জন্য ছয় বছর সময় ব্যয় করেছেন আর শুধুমাত্র “নিজেদের লোক” বলে পরিচয় পাওয়ার পরেই এই মহিলাদের ছবি তোলার অনুমতি পেয়েছেন. শিল্পকলার তাগিদে কত কিছুই না করতে হয়?

0ছবির প্রদর্শন শেষ হয়ে গিয়েছিল, দর্শকরা একটুও তাড়াহুড়ো না করে নিজেদের গন্তব্যের দিকে রওয়ানা হয়েছিলেন, আর তাঁদের মুখ দেখে মনে হয়েছিল যে, অনেকেরই হৃদয়ে এবার থেকে গেল সপ্ত ভগিনী রাজ্যে বেড়িয়ে আসার স্বপ্ন.