গত সপ্তাহে ভারতের মন্ত্রীসভা ঘোষণা করেছে যে, ব্রহ্মপুত্র বোর্ড নামের পরিষদকে ব্রহ্মপুত্র নদী উপত্যকা কার্যকরী পরিষদে নতুন করে ঢেলে সাজানো হবে. আর এই নব নির্মিত পরিষদের কাছে জল সম্পদ নিয়ন্ত্রণ ও বন্যার ফলে উত্পন্ন হওয়া বিপর্যয় পরিস্থিতি মোকাবিলার কাজ দেওয়া হবে. সেই ধরনের বন্যা, যার জন্য কয়েকদিন আগেই ভারতের উত্তর পূর্বের রাজ্য গুলি এখনও পরিত্রাণ পায় নি.

এই বন্যা, যা এই বছরের সেপ্টেম্বর মাসের শেষে আসাম ও প্রতিবেশী কয়েকটি রাজ্য জুড়ে হয়েছে. তা বহু সহস্র গ্রাম ও জনপদকে আচ্ছন্ন করেছিল, তার থেকে কোন না কোন ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় তিরিশ লক্ষ (২৯, ১৪ লক্ষ) স্থানীয় লোক, নিহত হয়েছেন বেশ কিছু মানুষ, আর কত যে তার থেকে ঘর বাড়ী সম্পত্তির ক্ষতি হয়েছে সে বিষয়ে কোন হিসাব করাই সম্ভব হয় নি.

প্রশাসনের ধারণা অনুযায়ী, নতুন এই সংস্থা এই এলাকার জল সম্পদের সামগ্রিক সমস্যার সমাধান করবে প্রতিবেশী ভুটান, বাংলাদেশ ও চিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার মাধ্যমে.

এখানেই জল সম্পদ নিয়ে কোন বৃহত্তর প্রকল্পের সফল রূপায়নের জন্য সমস্যা নিহিত রয়েছে. আজ অনেক বিশেষজ্ঞই বলছেন যে, একবিংশ শতকে কার্বন যৌগ সংক্রান্ত কাঁচামাল নিয়ে যুদ্ধের পরিবর্তে আসবে জলের জন্য যুদ্ধ. আর এখনও অবধি এই ধরনের বিরোধ সমাধানের জন্য কোনও আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত সমাধানের সূত্র নেই, যেমন রয়েছে সামুদ্রিক বিষয় নিয়ে আন্তর্জাতিক আইন. সেই সমস্ত আগে নেওয়া কনভেনশন – যেমন, ১৯৯২ সালের ইউরোপের কনভেনশন অথবা রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাধারন সভায় গৃহীত ১৯৯৭ সালের কনভেনশন, এই গুলি শুধু একেবারেই সর্বজন গ্রাহ্য নীতির কথাই বলেছে. সেই গুলি পরামর্শের কাজে লাগতে পারে আর কোন রকমের সমস্যা সমাধানের উপায় হতে পারে না. এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“বেশীর ভাগ সীমান্ত পার হওয়া নদী নিয়ে সমস্যা দ্বিপাক্ষিক ভাবেই সমাধান করা হয়ে থাকে. এই প্রসঙ্গে যে দেশ কোন না কোন নদীর উত্স মুখে থাকে, তারা প্রায়ই নিজেদের প্রধান ভাবে, আর নীচের প্রবাহের পথে পড়া দেশ গুলির অধিকার লক্ষ্য করতে চায় না. বিশেষ করে এই ধরনের সমস্যা রয়েছে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার দেশ গুলিতেই, কারণ তিব্বতের উপত্যকা ও নিকটবর্তী পাহাড়ের শ্রেনী গুলিতেই মেরু অঞ্চলের পরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মিস্টি জলের উত্স হিসাবে বরফাবৃত পাহাড় চূড়া গুলি রয়েছে. আর এই সম্পদের ব্যবহারের উপরেই নির্ভর করছে প্রায় তিনশ কোটি মানুষের জীবন”.

এই বিষয়ে ভারতের অবস্থিতি দ্বিমুখী. সিন্ধু নদীর অববাহিকার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের চেয়ে ভারত রয়েছে “উপরের” দিকের দেশ হিসাবে. সেই ১৯৬০ সালেই ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সিন্ধু নদীর জল ভাগ করা নিয়ে চুক্তি হয়েছিল, যা অনেকেই এখনও মনে করেন উদাহরণ যোগ্য বলেই.

গঙ্গা নদীর নীচের দিকের প্রবাহে ভারত বাংলাদেশের ক্ষেত্রে “উপরের” দেশের মত. কিন্তু নিজেরাই এখন গঙ্গা নদীর একটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জলের উত্স ব্রহ্মপুত্র নদীর বিষয়ে চিনের জল বিদ্যুত প্রকল্পের উপরে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, এই নদীর চিনের অংশের নাম ইয়ারলুঙ্গ – ত্সানঙ্গপো. আর যদি আজ সবচেয়ে বড় সমস্যা বলে মনে হয় বন্যার সমস্যাকে, তবে কয়েক বছর পরেই, এই ব্রহ্মপুত্র নদীতে চিনের জল বিদ্যুত প্রকল্প তৈরী হয়ে গেলে সমস্যা সম্পূর্ণ উল্টো হতে পারে. তখন আর অধিক পরিমানে জল নিয়ে কথা হবে না, বরং উল্টো – হবে তার বিপর্যয় ঘটার মতো কম পরিমান নিয়ে.

তাই সমস্যার সমাধানের পথ নতুন করে নির্দিষ্ট নদীর অববাহিকার জল সম্পদের সমস্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যুরোক্র্যাটিক কাঠামো তৈরী করার মধ্যে দেখা যাচ্ছে না, বরং দেখা যাচ্ছে যাতে সমস্ত দেশ গুলিই, যারা প্রতিবেশীদের সঙ্গে জলের জন্য এই বিরোধে লিপ্ত, তাদের সকলের জন্যই একক ও সকলের জন্যই গ্রহণ যোগ্য জল ব্যবহারের নিয়ম ও বিরোধ সমাধানের উপায় নির্ণয় করার মধ্যে রয়েছে.

এই ধরনের কাজের জন্য খুবই সুবিধা জনক মঞ্চ হতে পারত “সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা”, যার সম্পূর্ণ অধিকারের সদস্য হওয়ার কথা ভারত ও পাকিস্তানের আসন্ন ভবিষ্যতেই. এই সংস্থার সদস্য দেশ গুলির মধ্যে একটি দেশও এমন নেই, যাদের এই ধরনের সমস্যা প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে নেই, আর তাই এই কাজে ভারতকে, যারা উপরে বলা হয়েছে যে, কিছু দেশের জন্য “উপরের” ও নিজেরাও কিছু দেশের জন্য “নীচের” দেশ হয়ে রয়েছে, সংশ্লিষ্ট করার চেয়ে ভাল কিছু হতে পারে না, ফলে সকলের জন্যই গ্রহণযোগ্য একটি সমাধান সূত্র পাওয়া যেতে পারত.