ভারতের হিমাচল প্রদেশ ও গুজরাত রাজ্যে লোকসভা নির্বাচনের দিন নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট করে ঘোষণা করা হয়েছে. হিমাচল প্রদেশে নির্বাচন হবে ৪ঠা নভেম্বর, গুজরাতে – ১৩ ও ১৭ই ডিসেম্বর. ২০শে ডিসেম্বর হবে ভোট গণনা ও ফল প্রকাশের দিন.

এই আঞ্চলিক নির্বাচন গুলির দিকে খুবই মনোযোগ দিয়ে দেখা হচ্ছে. বাস্তবে এই গুলি সারা দেশ জোড়া লোকসভা নির্বাচনের এক প্রস্তুতি মূলক মহড়া বলা যেতে পারে, যে নির্বাচন সময়ের আগেই হওয়ার সম্ভাবনাকে মনে হচ্ছে খুবই বেশী.

দুটি রাজ্যেই হতে চলেছে খুব গুরুত্বপূর্ণ লড়াই সেখানের প্রশাসনে থাকা ভারতীয় জনতা পার্টি ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের মধ্যে, আর এই বছরের শুরুতে হওয়া অন্যান্য রাজ্যের আঞ্চলিক নির্বাচন যেমন স্পষ্টই দেখিয়ে দিয়েছে যে, বর্তমানের ক্ষমতাসীন প্রশাসনের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়াটা একটা সর্বজনীন প্রবণতায় পরিণত হয়েছে. কিন্তু এখন প্রশ্ন হল: এই দুটি দলের মধ্যে কোনটি জনতার চোখের সামনে কার্যকরী প্রশাসন বলে উপস্থিত হবে, যেটি রাজ্যে শাসন করছে, অথবা, যা দেশের প্রশাসন চালাচ্ছে? বিশেষ করে মনোযোগ, স্বাভাবিক ভাবেই নিবদ্ধ রয়েছে গুজরাত রাজ্যের দিকে, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“বিজেপি গুজরাতে বিগত ১৫ বছর ধরে শাসন করছে আর তারা অর্থনীতিতে ও সামাজিক ক্ষেত্রে লক্ষ্যণীয় রকমের সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে, সারা দেশের জন্যই প্রায় অন্যতম উল্লেখযোগ্য নিদর্শন হয়ে. আর এখানে শুধু এটাই মূল কথা নয়, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজের পক্ষ থেকে পরবর্তী লোকসভা নির্বাচনের পরে দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বিষয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষাও গোপন রাখেন নি”.

আর এটাই খুবই সিরিয়াস প্রভাব ফেলতে পারে যেমন ভারতের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে, তেমনই তার বৈদেশিক নীতিতে. নরেন্দ্র মোদীর নাম ২০০২ সালের রক্তাক্ত মুসলমান দাঙ্গার সঙ্গে যোগ করা হয়ে থাকে, যা তিনি কম করে হলেও বন্ধ করতে যান নি. আর এর অর্থ হল যে, তার ক্ষমতায় আসা যেমন দেশের ভেতরেই জাতি বিদ্বেষের সমস্যাকে জটিল করতে পারে, তেমনই তা ভারত সম্বন্ধে ঐস্লামিক বিশ্বের তরফ থেকেও জটিল করতে পারে, আর একই সঙ্গে ভারত – মার্কিন সম্পর্কের ক্ষেত্রেও খুবই শক্তিশালী ভাবে প্রভাব ফেলতে পারে – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শ্রী মোদীকে দেশে আসতে দেওয়ার “অনুপযুক্ত” মনে করা হয়ে থাকে, যাঁকে একাধিকবার তারা ভিসা দিতে অস্বীকার করেছে.

রাজ্য গুলিতে নির্বাচনের গুরুত্ব শুধু নির্দিষ্ট একজন আঞ্চলিক নেতার সঙ্গেই জড়িত নয়, বরং আরও এই কারণে যে, বিগত সময়ে ভারতে খুবই স্পষ্ট করে দেখতে পাওয়ার মতো করে রাজ্য গুলির সর্ব রাষ্ট্রীয় স্তরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সমস্যা গুলির সমাধানে গুরুত্ব বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে. নরেন্দ্র মোদী – মোটেও একমাত্র আঞ্চলিক নেতা নন, যিনি প্রথমবার রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের ভূমিকা নিতে চাইছেন. তাই ভলখোনস্কি বলেছেন:

“কিছুদিন আগের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জ্জীর পক্ষ থেকে নিজের দলকে কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন দলের জোট থেকে প্রত্যাহারের কথাই যদি মনে করা যায়, যা প্রায় কেন্দ্রের সরকারকে টলিয়ে দিয়েছিল, আর একাধিকবার অন্যান্য রাজ্যের নেতাদের ঘোষণার কথাও যদি মনে করা যায়, যারা নিজেদের প্রধানমন্ত্রীর পদে দেখতে চাওয়া কথা গোপন করেন নি, তবে খুবই বাস্তব বলে মনে হচ্ছে আঞ্চলিক দল গুলির জোট হিসাবে তৃতীয় শক্তির অভ্যুদয়ের প্রসঙ্গকে. এই সবই একই শৃঙ্খলের অংশ – গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্নের সমাধানে রাজ্যের ভূমিকা বৃদ্ধি”.

এই পটভূমিতে আরও একটি কিছুদিন আগে ঘটা ঘটনার বিষয়ে থামা দরকার. সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিনে অন্ধ্রপ্রদেশের অংশ ও বিশেষত সেখানের রাজধানী উত্তাল হয়েছিল আবার তেলেঙ্গানা নামে আলাদা রাজ্যের দাবীতে. এই প্রবণতার বিষয়ে সবচেয়ে মুখ্য বিপদ হল যে, তা ভারতের সবচেয়ে স্থায়ী স্লোগান, যা প্রায় জাতীয় ধারণাতেই পরিণত হয়েছে, সেই “বহুর মধ্যে ঐক্যকেই” আঘাত করেছে. বহু আজ অনেক বেশী করেই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, আর ঐক্যের বিষয়ে ব্যাপারটা খালি খারাপই হচ্ছে.

তেলেঙ্গানা রাজ্য নির্মাণের আন্দোলন আপাততঃ কোন সম্প্রদায়ের পোষাক পরে ফেলে নি, কিন্তু সেই রকমের একটা বিপদের সম্ভাবনা রয়েছে: হায়দ্রাবাদে শতকরা ৪০ ভাগের বেশী মানুষ মুসলিম, আর ঐস্লামিক বৃত্তে সেই ধারণাই পাক খাচ্ছে যে, তেলেঙ্গানা হবে “হিন্দুত্বের ল্যাবরেটরী” – হিন্দু সাম্প্রদায়িক চরমপন্থার নিদর্শন – আর “দ্বিতীয় গুজরাত” হতেও বাকী নেই. এই প্রসঙ্গে সেই রাজ্যের অর্থনৈতিক সাফল্যের কথা মনে করা হচ্ছে না, বরং মনে করা হচ্ছে ২০০২ সালের সাম্প্রদায়িক মুসলিম বিরোধী দাঙ্গার কথাই.

সুতরাং এই রাজ্য গুলিকে ভেঙে ফেলার প্রক্রিয়া ও একই সময়ে সর্ব রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে আঞ্চলিক প্রভাব বৃদ্ধি (আর এর মানে হল, জাতীয় পর্যায়ে একেবারেই বিভিন্ন ধরনের আঞ্চলিক নেতৃত্বের মধ্যে প্রতিযোগিতা) শুধু গতিই বাড়াবে, আর সেটাই ভারতের জন্য খুবই সিরিয়াস সমস্যায় পরিণত হতে পারে.