নিকটপ্রাচ্যের মধ্য যুগীয় এক অমূল্য মোতি সামরিক বিরোধের ফলে পৃথিবীর উপর থেকে একেবারে মুছে দেওয়া হয়েছে. প্রাচীন আলেপ্পো শহরের কেন্দ্রে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও ঐতিহ্যবাহী ঢাকা দেওয়া বাজার “আল- মদিনা” বর্তমানে শুধু ছাইয়ের স্তূপ. আগুনে সম্পূর্ণ ভাবে পুড়ে গিয়েছে প্রায় পাঁচশো দোকান. যেখানে সেই চতুর্দশ শতকে চিনের থেকে রেশমের কাপড় এনে চৈনিক ব্যবসায়ীরা বিক্রী করত, এখন সেখানে শুধু চিহ্ন রয়ে গেছে সশস্ত্র জঙ্গীদের সঙ্গে সরকারি ফৌজের যুদ্ধেরই.

সিরিয়ার বিপ্লবের জেনারেল কমিটি এই প্রাচীন স্মৃতি বিজড়িত স্থান ধ্বংস করার অভিযোগ এনেছে জঙ্গীদের উপরে. তারা বাজারকে বেছে নিয়েছিল সরকারি বাহিনীকে লুকিয়ে গুলি করার মতো জায়গা হিসাবে. যুদ্ধ চলেছিল দুই দিন ধরে. আর যখন অগ্নিকাণ্ড শুরু হয়েছিল, স্নাইপার জঙ্গীরা দোকানের মালিকদের তাদের দোকানে ফিরে আসার পথে গুলি বৃষ্টি করে বাধা দিয়েছে. ব্যবসায়ীরা বাজার ধ্বংস হওয়ার জন্য অভিযোগ করেছে জঙ্গীদের নামেই, তাদের বলছে একদল গুণ্ডা.

ইউনেস্কো সংস্থার জেনারেল ডিরেক্টর ইরিনা বোকোভা সামরিক বাহিনী ও সশস্ত্র দল গুলিকে আবারও আহ্বান করেছেন সমস্ত কিছুই করতে, যাতে পুরনো আলেপ্পো শহরকে সংরক্ষণ করা যায়. সিরিয়াতে নতুন করে সংস্কৃতির অবমাননা বন্ধ করা খুবই জটিল বলে উল্লেখ করে রাজনীতিবিদ সের্গেই দেমিদেঙ্কো বলেছেন:

“কোন রকমের ব্যবস্থাই নেই যে, এটা বন্ধ করা যাবে. শুধু যদি এই ধরনের জায়গা গুলিকে সিরিয়ার সরকার নিজেদের সামরিক প্রহরায় নেয় ও যে কোন রকমের বেচাল দেখলেই গুলি করে অকুস্থলেই মেরে ফেলে, তবে কিছু হতে পারে. অন্য কোনও উপায় নেই এই ধরনের ঘটনা থামানোর. খুব একটা প্রশংসা করে বলার উপায় নেই যে, যদি এই সব জায়গা সেই সমস্ত জঙ্গীদের হাতেই পড়ে তবে তারা যে এই সব জায়গা সুরক্ষিত রাখবে তা মনে করার কোনও কারণ নেই. অন্তত সেই কারণে যে, জঙ্গীদের অনেক বেশী করেই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বাঁচানো ছাড়া অন্য কাজ থাকবে”.

আফগানিস্তানে, ইরাকে লিবিয়াতে যুদ্ধ বহু সংখ্যক বিশ্ব মর্যাদা সম্পন্ন ঐতিহাসিক স্মৃতি বিজড়িত স্থানকে শেষ করে দিয়েছে. আফগানিস্তানের বামিয়ান প্রদেশে আর সেই বিশালাকৃতি বুদ্ধের প্রতিকৃতি নেই, সেই গুলি তালিবরা ২০০১ সালেই ধ্বংস করে দিয়েছিল. ইরাকে আমেরিকার ট্যাঙ্কের তলায় পিষ্ট হয়ে শেষ হয়ে গিয়েছে ব্যাবিলনের সভ্যতার ধ্বংসস্তূপ. লিবিয়াতে গৃহযুদ্ধের সময়ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জায়গা বাদ পড়ে নি, যা সারা বিশ্বের সম্পদ ছিল, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার পক্ষ থেকে লিবিয়াতে প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত আলেক্সেই পদশ্যেরব বলেছেন:

“কোন অভিজ্ঞতাই নেই যে, কি করে এটাকে বন্ধ করা যায়. সেই লিবিয়াতেই, যখন তথাকথিত স্বাধীনতার যোদ্ধারা ঐতিহাসিক কিরেনাইকা এলাকা দখল করে নিয়েছিল, তখ তারা শুরু করেছিল সেই জায়গার অমূল্য মোতি - কিরেনা লুঠ করতে শুরু করেছিল. এটি প্রাচীন গ্রীক সভ্যতার শহর. তারা সেখান থেকে স্থাপত্যের নিদর্শন, প্রাচীন মূর্তি ইত্যাদি নিয়ে যেতে শুরু করেছিল. তখন লিবিয়ার সরকার ইজিপ্টের লোকদের কাছে সাহায্যের আহ্বান করেছিল যেন তারা নিজেদের সীমান্ত দিয়ে এই সব জিনিষ নিয়ে যেতে না দেয়. কিন্তু সেখানে সীমান্ত কি করে বন্ধ করা সম্ভব? সেখানে যে হাজার কিলোমিটার জুড়ে শুধুই মরুভূমি. মিশরের লোকরা কিছু চেষ্টাও করেছিল, কিন্তু এটা দেখা গেল সম্ভবই নয়. এই ধরনের ব্যাপারের সঙ্গে লড়াই করা খুবই কঠিন”.

সিরিয়াতে গৃহযুদ্ধ প্রাচীন সামগ্রীর কালো বাজারকে আরও উত্তপ্ত করেছে. যোদ্ধারা প্রাচীন জিনিষের বদলে অস্ত্র কিনছে. এই ধরনের ঘটনা একেবারেই গণ হারে হচ্ছে. তার মধ্যে আবার সিরিয়াতে কাজ করছে পেশাদার কালোবাজারী ও চোরাচালানকারীরা আর লুঠেরা দস্যুরা. ইরাক, আফগানিস্তান ও লিবিয়ার পরে এবারে তারা সিরিয়াতে ডালপালা ছড়িয়ে বসেছে.