গত সপ্তাহের শেষ কয়েকদিন ধরে বাংলাদেশ কাঁপিয়ে দিয়েছে এই দেশের জন্যে তুলনামূলক ভাবে বিরল সংঘর্ষ, যা হয়েছে মুসলমান ও বৌদ্ধদের মধ্যে, এমন এক সংঘর্ষ, - যাকে ধ্বংসলীলা বললেই ঠিক হত. মায়ানমার দেশের সীমান্তবর্তী বাংলাদেশের দক্ষিণ – পূর্ব সীমানার কাছে সমুদ্র উপকূলের পর্যটন কেন্দ্র কক্স বাজার এলাকায় একদল উত্তেজিত মুসলমান কম করে হলেও পাঁচটি বৌদ্ধ মঠ ধ্বংস করেছে ও ১৫টি স্থানীয় বৌদ্ধদের বাড়ী জ্বালিয়ে দিয়েছে.

এই ধ্বংসলীলা হওয়ার কারণ হয়েছিল ফেসবুক ইন্টারনেট সাইটে ঝোলানো একটি পুড়ে যাওয়া কোরানের ফোটো. এই পাতাটি খুলেছিল এক স্থানীয় অল্প বয়সী বৌদ্ধ ছেলে. “মুসলমানরা নির্দোষ” নামের এক ন্যক্কার জনক সিনেমা নিয়ে কয়েকদিন আগেই ঘটে যাওয়া উত্তেজনার রেশ কেটে যাওয়ার আগেই এই ঘটনায় স্থানীয় মুসলমানরা ফোটো প্রকাশকে নাম দিয়েছে অপমানজনক বলে. অবশ্য সেই বৌদ্ধ ছেলেটি বলেছে যে, তার ফেসবুক সাইটের পাতা হ্যাকাররা কেউ পাস ওয়ার্ড ভেঙে ঢুকে এমন কাজ করেছে, সে নিজে এর কিছুই জানে না.

যাই হয়ে থাকুক না কেন এই ধ্বংস ও ঘর পোড়ানোর ঘটনা কিন্তু মনে হয়েছে কেউ যেন খুব আঁটসাঁট বেঁধেই কয়েক হাজার মুসলমান লোককে পথে নামিয়ে করিয়েছে. সরকারকে খুবই দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হয়েছে এই তাণ্ডব থামানোর জন্য. একশরও বেশী লোককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, আর সোমবারে এই এলাকাতে, যেখানে প্রবল উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে, সেখানে সামরিক বাহিনী নামাতে হয়েছে. সেই ছেলেটি ও তার পরিবারের লোক জনকে রাখতে হয়েছে সশস্ত্র পাহারায়.

এই সংঘর্ষের জন্য পটভূমি শুধু সেই স্ক্যান্ডাল তৈরী করা সিনেমা বা ফোটোই হয় নি, বরং প্রতিবেশী দেশ মায়ানমারে কয়েকদিন আগেই ঘটে যাওয়া স্থানীয় বৌদ্ধ ও মুসলিমদের মধ্যে সংঘর্ষের ফলে হয়েছে, যার ফলে কয়েক হাজার বর্মার মুসলমানকে বাংলাদেশে উদ্বাস্তু অবস্থায় চলে আসতে হয়েছে. এই সব ঘটনা বাংলাদেশে বৌদ্ধ বিরোধী মনোভাবকে উত্তপ্ত করেছিল, যেখানে প্রায়ই শুনতে পাওয়া গিয়ে থাকে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে সংঘর্ষের কথা, কিন্তু বৌদ্ধ ও মুসলিমদের মধ্যে সংঘর্ষের কথা খুব আগে একটা শোনা যায় নি.

এখনই স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যাচ্ছে যে, ধর্মীয় বিরোধের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘটনার কোন সম্পর্ক নেই, তাই রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি মনে করেন যে:

“এটা – খুবই ভাল করে পরিকল্পিত একটা প্ররোচনা. আসলে, একজনও সত্যিকারের বৌদ্ধ (যেমন অন্য যে কোন ঐতিহ্যবাহী ধর্মের ধর্ম ভাবাপন্ন মানুষ) কোন দিনও অন্য ধর্মের প্রতিনিধির ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করবেন না. আর হজরত মহম্মদও এই শিক্ষাই দিয়েছেন. তার ওপরে কোরানের উপরে অপমানজনক কাজের জন্য একেবারেই কোন দায়ভাগের সম্পর্কহীণ বৌদ্ধ মন্দির ও লোকজনের ঘরবাড়ী পোড়ানোর কি কারণ থাকতে পারে”.

আপাততঃ খুবই কঠিন হবে বলা যে, কার স্বার্থের কথা ভেবে এই এলাকায় উত্তেজনা ছড়ানো হয়েছে. কক্স বাজার এলাকার খুব কাছেই তৈরী করা হচ্ছে বিরাট সব সামুদ্রিক বন্দর. এই বন্দর গুলি পরিবহন কাঠামো তৈরীর কাজে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে, বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে ভারতের উত্তর পূর্বের এলাকার যোগ সাধন করে ও চিনের দক্ষিণের এলাকার সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা করে.

প্রতিবেশী মায়ানমারের চারপাশে বিগত দুই বছর ধরে একই সঙ্গে শুরু হয়েছে খুবই বড় ভূ- রাজনৈতিক “বিরাট খেলা”. যাতে প্রভাবশালী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চিন ও ভারতবর্ষ সামিল হয়েছে. দেখাই যাচ্ছে যে, কারও জন্য খুব একটা লাভজনক নয় যে, বাংলাদেশ ও মায়ানমারের এলাকা পরিকাঠামো বিষয়ে উন্নতি করুক ও গুরুত্ব পাক, যাতে এই এলাকার দেশ গুলির মধ্যে সহযোগিতা সক্রিয় হতে পারে.

আর একেবারেই স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যাচ্ছে যে, কক্স বাজারে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে ধর্মীয় বিরোধ বলে দেখানোর চেষ্টা – এটা আরও একটা বাস্তবে প্রায় সারা বিশ্ব জুড়েই ঐতিহ্যবাহী ধর্ম মত গুলির বিরুদ্ধে শুরু হওয়া আক্রমণেরই অংশ. এখানে সেই আগে থেকেই মনে করিয়ে দেওয়া সিনেমা ও আফগানিস্তানে আমেরিকার সেনাদের দ্বারা আর খোদ আমেরিকায় এক প্যাস্টরকে দিয়ে কোরান জ্বালিয়ে দেওয়া, যে একেবারেই ভিত্তিহীন ভাবে নিজেকে খ্রীষ্টান বলে নাম দেয়, আর সেই মস্কো শহরের অর্থোডক্স গির্জা অবমাননার ঘটনা সবই এক ধরনের ঘটনা. এই ধরনের কাজকর্মের সঙ্গে কোন একটি ধর্মের লোকের কোন সম্পর্কই নেই. এই সব কাজই করা হয়েছে একটা লক্ষ্য নিয়ে- যার উদ্দেশ্য বিভিন্ন ধর্মের লোকদের একে অপরের সঙ্গে লড়াই বাধিয়ে দেওয়া, আর সেই পুরনো নীতি “ডিভাইড অ্যান্ড রুল” ব্যবহার করে নিজেদের বিশ্বের রাজনীতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা গুলিতে প্রভুত্বের আসনেই বসানোর চেষ্টা.