বিগত দিন গুলিতে খুবই তীক্ষ্ণ নজর নিবদ্ধ ছিল বিশ্বের একটি সবচেয়ে পুরনো ও সমাধান না হওয়া আঞ্চলিক সমস্যার প্রতি – কাশ্মীর সমস্যার প্রতি. নিউইয়র্কে রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাধারন সভায় বক্তৃতা দিতে গিয়ে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি কাশ্মীর আসিফ আলি জারদারি কাশ্মীর সমস্যাকে নাম দিয়েছেন রাষ্ট্রসঙ্ঘের সমস্ত ব্যবস্থার বিফল হওয়া প্রতীক হিসাবে. আর, ঠিক যেন নিজের পাকিস্তানের সহকর্মী কি বলছেন, তা না শুনে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জ্জী, যিনি দুই মাস আগে নিজের এই পদে নির্বাচিত হওয়ার পরে জম্মু ও কাশ্মীর প্রদেশ সফর করতে গিয়েছিলেন. সেখানে, কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ছাত্রদের প্রতি উদ্দেশ্য করে তিনি বলেছেন যে, সমস্ত সমস্যাই উচিত্ শান্তিপূর্ণ ভাবে মীমাংসা করার, আর এই সমস্ত সমস্যা নিয়ে এমন ভাবে বলেছেন যেন, তা একেবারেই ভারতের আভ্যন্তরীণ বিষয়, যেন দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে এই নিয়ে অর্ধ শতকেরও বেশী সময় ধরে কোন রকমের বিরোধই হয় নি.

সব মিলিয়ে দেখলে দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের মদ্যে অবস্থানে নতুন কিছুই নেই. পাকিস্তান আগের মতই, কাশ্মীর সমস্যাকে আন্তর্জাতিক করে তুলতে চাইছে, তাই জন্য জোর দিয়েছে রাষ্ট্রসঙ্ঘের সেই গত শতকের চল্লিশের দশকে নেওয়া এই সমস্যা সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের উপরে, যা নেওয়া হলেও কার্যকরী করা সম্ভব হয় নি, আবার তা ফিরিয়ে নেওয়াও হয় নি. ভারত কাশ্মীর সমস্যাকে দেখে নিজেদের আভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসাবেই ও তার আন্তর্জাতিক করার বিরুদ্ধেই সব সময়ে বলে এসেছে.

এখানে অন্য বিষয় বেশী গুরুত্বপূর্ণ. জারদারির এই তীক্ষ্ণ মন্তব্য, যা খুবই প্রতীকী চরিত্র বহন করে, তা এমন একটা সময়ে করা হয়েছে যখন মনে হয়েছিল যে, ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্কের মধ্যে একটা উত্তেজনা কমার লক্ষণ দেখা দিয়েছে, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“বিগত কয়েক মাস ধরে দুই দেশের নেতৃত্বের মধ্যে সফরের সক্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে, বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি করা হয়েছে বাণিজ্য নিয়ে, আর ১লা অক্টোবর থেকেই ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ভিসা ব্যবস্থা লঘু করা হতে চলেছে. আর এটাও ঠিক যে, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে নিউইয়র্কে একসঙ্গে যাওয়া পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিনা রব্বানি খার জারদারির বক্তৃতার বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করা থেকে এড়িয়ে যেতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে, ভারত ও পাকিস্তানের উচিত্ সমস্ত সমস্যাই, আর তার মধ্যে কাশ্মীর সমস্যা অন্তর্ভুক্ত, সমাধান করা পুরুষকারের সঙ্গে ও একে অপরের প্রতি পারস্পরিক বিশ্বাস নিয়ে. এই রকমের পটভূমিতে খুব একটা বোঝা যায় নি, কেন দুই পক্ষেরই দরকার ছিল এই সমস্যার প্রতি নজর কাড়ানোর, সরাসরি অথবা পরোক্ষ ভাবেই তা আরও তীক্ষ্ণ করে”.

আসলে, যদি বিশ্ব ইতিহাসের দিকে তাকানো হয় ও বর্তমানে এই অঞ্চলের দিকে দেখা হয়, তবে দেখতে পাওয়া যাবে যে, কাশ্মীর সমস্যায় বিরল কিছুই নেই. এলাকা সংক্রান্ত বিরোধ ভারতের শুধু পাকিস্তানের সঙ্গেই নয়, চিনের সঙ্গেও রয়েছে, যারা, সামরিক ক্ষমতা বাড়িয়ে চলেছে ও ভারতের সঙ্গে সীমান্তবর্তী অঞ্চল গুলি ও তিব্বতে পরিকাঠামো বৃদ্ধি করে চলেছে.

আর তা স্বত্ত্বেও, এলাকা সংক্রান্ত সমস্যা গুলি থাকা স্বত্ত্বেও ও অন্যান্য অনেক বিষয়ে বিরোধ থাকা স্বত্ত্বেও ভারত ও চিনের পক্ষে একে অপরের সঙ্গে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সফল ভাবেই এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে. ২০১১ সালে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমান সমস্ত রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে, বেড়ে হয়েছে সাত হাজার ৩৯০ কোটি ডলারের সমান. এই রকমের পটভূমিতে দুটি নিকটতম প্রতিবেশীর মধ্যে বাণিজ্যের পরিমান – ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে খুবই কম বলে মনে হতে পারে: ২০৬ হাজার কোটি ডলার.

বোধহয়, এলাকা নিয়ে সমস্যা গুলি সমাধান করা দরকার অন্য দিক থেকে, - তাই বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“সেটাকে প্রত্যেক উপযুক্ত ও অনুপযুক্ত সময়ে ফুলিয়ে দেখানোর দরকার নেই, আর বরং উল্টোটা দরকার- কিছুটা সময়ের জন্য তা ভুলে গিয়ে সেই সমস্ত প্রশ্নেই মন দেওয়া দরকার, যা সহজেই একে অপরের পক্ষে বোধগম্য হতে পারে, যেমন, বাণিজ্যে.

আর অন্য একটা উপায়ের সম্বন্ধে আগে থেকে বলে দেওয়া, যা একেবারেই অন্য এলাকার অভিজ্ঞতা থেকে দেখতে পাওয়া গিয়েছে – ইউরোপ থেকে. যদি ইতিহাস মনে করে দেখি, তবে আমরা দেখবো যে, উনবিংশ শতাব্দীর শেষে ও বিংশ শতাব্দীর শুরুতে সেখানেও ফ্রান্স ও জার্মানীর মধ্যে কিছু কম জটিল সম্পর্ক ছিল না এলসাস নিয়ে, যা অনেক যুদ্ধের কারণ হয়েছিল, তার মধ্যে বিশ্ব যুদ্ধও ছিল. কিন্তু আজ যখন বিশ্বের এই অংশে সক্রিয় ভাবে সমাকলন প্রক্রিয়া গুলি সম্পন্ন হয়েছে, এলসাস সমস্যা অনেক দিন ধরেই কেউ আর মনে করে না, আর এলসাস দেশের রাজধানী স্ত্রাসবুর্গ এখন এমনকি সংযুক্ত ইউরোপের রাজধানীতেও পরিণত হয়েছে”.

সম্ভবতঃ, কাশ্মীর সমস্যার সমাধানের উপায় গুলিও সমাকলন প্রক্রিয়ার মধ্যে পাওয়া যেতে পারে – দক্ষিণ এশিয়ার দেশ গুলির ঐক্য বদ্ধ গোষ্ঠী সার্কের মধ্যে অথবা সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার কাঠামোর মধ্যে, দুই দেশই এই দুটি সংস্থার পাকাপাকি সদস্য কিছু দিনের মধ্যেই হতে চলেছে. শুধু সমাকলন, যা পোক্ত অর্থনৈতিক যোগাযোগের স্থাপন, মানুষের যাতায়াতের বেড়া প্রত্যাহার করাই একমাত্র দরকার, সামরিক ক্ষমতা না বাড়িয়ে, তবেই দুই সীমান্তের পারে উত্তেজনা কমতে পারে, আর শেষমেষ শান্তিপূর্ণ ভাবে সেই সমস্যার সমাধান করতে পারে, যা আমাদের কাছে আজ মনে হয় সমাধানের অযোগ্য.