বুধবারে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ৮০ বছরের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষ করে বহু বিশ্লেষকদের জন্য একটা কারণ হয়েছে শুধু এই অতি বিখ্যাত রাজনীতিবিদের ভাগ্যচক্র নিয়ে কথা বলার (“ফোর্বস” জার্নালে যেমন লেখা হয়েছে যে, নেহরুর পরে ভারতের সেরা প্রধানমন্ত্রী), বরং ভারতের জন্য মনমোহন সিংহের রাজনীতির মঞ্চ থেকে সরে যাওয়ার পরের পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়েও. আর তাঁর সরে যাওয়া আগামী নির্বাচনের পরে মনে হচ্ছে অবশ্যম্ভাবী. আর সেটা শুধু বয়সের জন্যই নয়, বরং তার সঙ্গে এই কারণেও যে, দেশ একটা কানাগলিতে আটকে পড়েছে – তা যেমন অর্থনৈতিক ভাবে, তেমনই রাজনৈতিক ভাবেও.

মনমোহন সিংহের শাসনের সময়ের প্যারাডক্স এইটাই যে, তিনিই নব্বইয়ের দশকের শুরুতে অর্থমন্ত্রীর পদে থাকা কালীণ এক দ্রুত পরিবর্তনশীল অর্থনৈতিক সংশোধনের স্রষ্টা ছিলেন. এই সংশোধন ছিল খুবই সার্থক: ভারত পরিবর্তিত হয়েছিল একটি সবচেয়ে দ্রুত উন্নতিশীল দেশ হিসাবে, আর বিশ্বের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নেতৃস্থানীয় পদেও বেরিয়ে আসতে পেরেছে.

আজ, যখন দেশ আবারও এক জটিল অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে উপনীত হয়েছে, নতুন করে সংশোধনের প্রয়োজন স্পষ্টই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে. আর বোধহয় প্রশাসন বেশ কয়েকটি পদক্ষেপও নিয়েছে – অংশতঃ, দেশের খুচরো ব্যবসায়ে আরও বেশী করে স্বাধীনতা দিয়েছে. কিন্তু এবারে এই সংশোধনই বিফল হবে বলেই মনে হচ্ছে – বাস্তবে প্রায় সমস্ত বিরোধী দলই, তা যেমন দক্ষিণ পন্থী, তেমনই বামপন্থীরা একসাথেই বিপক্ষে মত দিয়েছে. আর তাই অন্তর্বর্তী কালীণ নির্বাচনের সম্ভাবনা খুবই পরিষ্কার করে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে. এই সব প্যারাডক্সের উপরেই, যা মনমোহন সিংহের ব্যক্তি পরিচয়ের সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে, আরও অনেক কিছু চাপা পড়েছে, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“মনমোহন সিংহ নিজে এক অত্যন্ত সত্ ব্যক্তি বলেই পরিচিত. কিন্তু এই কথা তাঁর নেতৃত্বে থাকা মন্ত্রীসভা সম্বন্ধে বলা যায় না. বিগত বছর গুলিতে তার ভিত নড়িয়ে দিয়েছে খুবই জোরালো আওয়াজের দুর্নীতি সংক্রান্ত স্ক্যান্ডাল: টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা সংক্রান্ত কোম্পানী গুলিকে লাইসেন্স দেওয়া নিয়ে, কমনওয়েলথ গেমসের সময়ে বরাদ্দ অর্থ লুঠ ও লক্ষ্য ব্যতিরেকে খরচ নিয়ে, আর সর্বশেষ তথাকথিত কোলগেট স্ক্যান্ডাল নিয়ে – যেখানে কয়লা খনির লাইসেন্স বিক্রী করা হয়েছে স্বজন পোষণের দুর্নীতি করে. ডঃ সিংহের এক ঘনিষ্ঠ যেমন বলেছেন যে, “তিনি – সবচেয়ে অসত্ মন্ত্রীসভার সবচেয়ে সত্ প্রধানমন্ত্রী””.

বাস্তবে প্রায় সব কিছুই – তা যেমন মন্ত্রীসভায়, তেমনই বিরোধী পক্ষে – বলে দিচ্ছে যে, সরকারের নেতৃত্বে পরিবর্তন এই বারে অবশ্যম্ভাবী হয়েছে, কিন্তু কেউই দেশের জন্য এই অবস্থায় দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত নয়.

ভারতের জাতীয় কংগ্রেসে বহু বছর ধরেই মনমোহন সিংহের পরবর্তী উত্তরসুরী হিসাবে অবধারিত ভাবেই দেখা হচ্ছিল জওহরলাল নেহরুর প্রপৌত্র রাহুল গান্ধীকে. কিন্তু উত্তর প্রদেশ রাজ্যে আঞ্চলিক নির্বাচনের একেবারেই অসফল পরিনামের পরে রাহুল বাস্তবে নেপথ্যেই চলে গিয়েছেন. তিনি একাধিকবার মনমোহন সিংহের মন্ত্রীসভায় ক্যাবিনেটের মিনিস্টারের পদ নিতে অস্বীকার করেছেন, আর এখন, বলাবলি করা হচ্ছে যে, তিনি একেবারেই আগামী সারা দেশের নির্বাচনে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সম্ভাবনা নিয়ে হতাশায় ভুগছেন.

বিরোধী ভারতীয় জনতা পার্টি কথায় বলছে যে, তারা নিজেদের হাতে ক্ষমতা নিতে যে কোন সময়েই তৈরী রয়েছে, কিন্তু যখনই সরকারের প্রতি অনাস্থা প্রস্তাবের কথা ওঠে, তাদের এই আত্মবিশ্বাস তখনই উবে যায়. “আমরা এই অনাস্থা প্রস্তাব আনবো না – সরকারের পতন ঘটানো, এটা আমাদের কাজ নয়” – ঘোষণা করেছেন কয়েকদিন আগে এই দলের নেতা নিতিন গড়কড়ি.

আর মনে হয়েছিল যে, সরকারকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করার মত মুহূর্ত এখনই সব চেয়ে উপযুক্ত. জোট থেকে পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস বেরিয়ে গিয়েছে, আর তাদের নেতৃ, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জ্জী ঘোষণা করেছেন দেশে তৃতীয় জোট শক্তির প্রয়োজনের তাগিদ – নাম দিয়েছেন রাষ্ট্র ফ্রন্ট. কিন্তু সেই মুহূর্তেই মন্ত্রীসভার জন্য তত্ক্ষণাত বিরোধী পক্ষের মধ্য থেকেই সমর্থক জুটে গিয়েছে – এরা আঞ্চলিক দল, যাদের উত্তর প্রদেশ রাজ্যেই প্রাথমিক ভাবে প্রভাব রয়েছে – সমাজবাদী দল ও বহুজন সমাজ পার্টি. সুতরাং খুবই সম্ভব যে, এখানে কথা হচ্ছে প্রাথমিক ভাবে একটা রাজনৈতিক লেনদেনের, এই রকম মনে করে বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“আজকের দিনে প্রধান প্রশ্ন মনমোহন সিংহের ব্যক্তিগত ভাগ্য নিয়ে করা হচ্ছে না (তিনি ইতিমধ্যেই তাঁর উপযুক্ত জায়গা ভারতের ইতিহাসে করতে পেরেছেন), এমনকি তাঁর উত্তরসুরী কে হবেন, তাঁকে নিয়েও করা হচ্ছে না, এমনকি সর্বজনীন ভোটের ফলাফল নিয়েও করা হচ্ছে না, যখনই তা ঘটুক না কেন – সময় মতো, নাকি সময়ের আগেই. কথা হচ্ছে সেই বিষয়ে যে, ভারত এই নির্বাচনের পরে কোন দিকে যাবে”.

আঞ্চলিক দল গুলির রাষ্ট্রীয় ফ্রন্ট আজ দেশের দুটি জাতীয় দলের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার পটভূমিতে মনে হতে পারে যে, একটা পছন্দসই ধারণা বলে. কিন্তু ইতিহাসই দেখিয়েছে যে, আঞ্চলিক দল গুলির জোট দীর্ঘস্থায়ী হয় না. আর প্রধান হল – ক্ষমতায় এত রকমের নানা রকমের দলের আগমনের ফল ভারতের জন্য কেন্দ্র বিমুখ প্রবণতা বৃদ্ধির খুবই সিরিয়াস হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে.