বিগত সপ্তাহের শেষে সারা ভারত জুড়ে হওয়া প্রতিবাদের ঢেউ প্রতিবেশী পাকিস্তান বা ঐস্লামিক বিশ্বের মতো রাগী ও হিংসাশ্রয়ী না হলেও আর কোন রকমের মানবিক ক্ষতি না করালেও, বেশ জোরদারই হয়েছে. প্রসঙ্গতঃ, বৃহত্ রাজনীতির জন্য এই প্রতিবাদের প্রভাব কিন্তু কিছু কম সংজ্ঞাবহ না হতেও পারে, যেমন স্ক্যান্ডাল সৃষ্টি করা সিনেমার কারণে মুসলমান দেশ গুলিতে ক্ষোভের ঢেউ তৈরী করেছে. ভারতে জনগনের গণ প্রতিবাদের কারণ ছিল শুধুই অর্থনীতির কারণে. প্রধান কারণ হয়েছিল দেশের মন্ত্রীসভার পক্ষ থেকে খুচরো ব্যবসায়ে সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগের সুযোগ করে দেওয়া, যা এই দেশে বিদেশী বৃহত্ পূঁজির পণ্য বিপণনের নেটওয়ার্ক কোম্পানী গুলিকে আসার পথ খুলে দিয়েছে ও সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে বহু লক্ষ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের দেউলিয়া হওয়ার সম্ভাবনাকেও. আর মনে তো হয় না যে, এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এমনিতেই আরও একটি সিদ্ধান্তের সময়ের সাথে এক সঙ্গে ঠিক করা হয়েছে – ডিজেল জ্বালানীর ক্ষেত্রে সরকারি ভর্তুকি কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে যা করা হয়েছে, যার ফলে প্রাথমিক নিত্য প্রয়োজনীয় বহু জিনিষেরই দাম আপনা হতেই বাড়তে বাধ্য হবে. এই দুটি সিদ্ধান্তই নেওয়া হয়েছে সেই সরকারের পক্ষ থেকে, যারা বিগত কয়েক বছরে এবং এখনও ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সঙ্কটের সামনে উপস্থিত হয়েছে. গত বছরে এই সঙ্কটের কারণেই দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির গতি শ্লথ হয়েছে. প্রথম সিদ্ধান্তটি দেশের এক বড় অংশের মধ্যবিত্ত জনগনের স্বার্থে আঘাত করেছে ও দ্বিতীয়টি – প্রধাণতঃ দেশের সবচেয়ে দরিদ্র স্তরের মানুষের উপরেই.

শুক্রবারে দেশের টেলিভিশনে বক্তৃতা দিতে গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ডঃ মনমোহন সিংহ এই ধরনের কড়া ও বেদনাদায়ক সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বলতে গিয়ে ১৯৯০ সালের অভিজ্ঞতার কথা তুলেছেন. তখন দেশ একই ভাবে এখনের মতই খুবই কড়া সংশোধনের প্রয়োজনের সামনে উপস্থিত হয়েছিল.

ভারতের সংশোধন গুলির সত্যই প্রয়োজন ছিল, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“যে কোন সংশোধনের পরিণাম প্রায় সব সময়েই হয় দেশের জনগনের এক বিশাল অংশের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হয়ে যাওয়া – কখনও তা হয় সাময়িক, কখনও দীর্ঘস্থায়ী. আর তা আগে থেকে বলা যে, এই বারে সেই বিষয়টা কি রকমের হবে, তা আজকে কেউই বলে দিতে চাইবেন না. কিন্তু সব সময়েই সেই ধরণের শক্তি দেখতে পাওয়া যাবে, যারা এই নতুন সৃষ্টি হওয়া পরিস্থিতিতে নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতে চাইবে. এই বারেও সেই রকমেরই হয়েছে, তাই প্রশ্ন স্পষ্টই অর্থনৈতিক স্তর থেকে বেড়ে রাজনৈতিক হয়ে দাঁড়িয়েছে. গণ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে দেশের সমস্ত বিরোধী দলই – তা যেমন দক্ষিণ পন্থী, তেমনই বাম পন্থীরাও, আর কিছু ক্ষেত্রে প্রশাসনের পিছনে থাকা ক্ষমতাসীন ইউপিএ জোটের সঙ্গে আগে গাঁটছড়া বেঁধে রাখা কিছু দলও.

আজ স্পষ্টতই এক রাজনৈতিক সঙ্কটের পটভূমিকায় রাজনীতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের করা প্রধান প্রশ্ন হয়েছে: মনমোহন সিংহের নেতৃত্বে মন্ত্রীসভা নিজেদের সংবিধান সম্মত দায়িত্বের সময়সীমা (২০১৪ সালের শুরু) পর্যন্ত কেন্দ্রে টিকে থাকতে পারবে তো, নাকি অন্তর্বর্তী কালীণ দেশ জুড়ে নির্বাচন হবে অবশ্যম্ভাবী”?

আপাততঃ, যখন ক্ষমতাসীন দলের মুখপাত্ররা জোর গলায় বলছেন যে, সরকার আগের মতই দেশের লোকসভায় আরও ছোট ও আঞ্চলিক দলের পক্ষ থেকে যথেষ্ট সমর্থন পেয়েছে, আর তার মানে হল সরকারের প্রতি যে কোন ধরনের অনাস্থা প্রস্তাব আনা হলে তাতে ভোটের ফল আগেই জানা আছে নেতিবাচক বলে. কিন্তু এখানে প্রয়োজন পড়বে এই বিষয়কে হিসাবের মধ্যে আনার যে, ছোট দলের রাজনীতির মূল কথাই হল দেশের দুটি বৃহত্তম দল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস অথবা ভারতীয় জনতা পার্টির কোন একটির সঙ্গে জোট বেঁধে স্থানীয় ক্ষমতার আসনে নিজেদের জন্য জায়গা তৈরী করা.

তাই যখন আজ এক গুচ্ছ অর্থনৈতিক প্রশ্নের সমন্বয় স্পষ্টই দেখা যাওয়ার মতো রাজনৈতিক স্বরের ইঙ্গিত দিয়েছে, তখন এই বেচাকেনার প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক ভাবে দল বদলের বিষয় বিশেষ করেই লক্ষ্যনীয় হয়েছে, এই কথা উল্লেখ করে বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“গত সপ্তাহে জোট ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস দল, যারা পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করেছে. প্রতিবাদী আন্দোলনে নিজেদের সমর্থনের কথা জানিয়েছে আরও একটি আঞ্চলিক দল দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কাঝগম (তামিলনাড়ু রাজ্য). আবার ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস আচমকাই সমর্থন পেয়েছে দেশের সবথেকে জনসংখ্যা বহুল রাজ্য উত্তর প্রদেশে নিজেদের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী দল সমাজবাদী দলের কাছ থেকে. এই দল, প্রতিবাদী আন্দোলনকে সমর্থন করে ও প্রশাসনিক জোটে না প্রবেশ করে ঘোষণা করেছে যে, তারা মন্ত্রীসভাকে “বাইরে” থেকে সমর্থন করবে”.

এক জোট ভেঙে যাওয়া ও অন্য জোট গড়ার প্রক্রিয়া এখন গতি পেয়েছে . আর যদিও আজ ক্ষমতাসীন জোট নিজেদের নিরাপদ বলে মনে করতেও পারে, তবে কে জানে আগামী বছরে ঘটনা পরম্পরা কোন দিকে যাবে?