পাকিস্তানের সুপ্রীম কোর্ট রাষ্ট্রপতি আসিফ আলি জারদারির এক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ও দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী রেহমান মালিকের লোকসভার সদস্য পদ বাতিল করেছে. আদালতে প্রমাণিত হয়েছে যে, রেহমান মালিকের পাকিস্তান ছাড়া ব্রিটেনের পাসপোর্টও রয়েছে. পাকিস্তানের সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ইফতিকার চৌধুরীর সভাপতিত্বে এই রায় সুপ্রীম কোর্টের অধিবেশনে ঘোষণা করা হয়েছে. বিষয় নিয়ে বিশদ করে লিখেছেন আমাদের সমীক্ষক গিওর্গি ভানেত্সভ.

রেহমান মালিকের সঙ্গে একসাথে লোকসভার সদস্য পদ হারিয়েছেন রাষ্ট্রপতির পরামর্শদাতা ও  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রাক্তন পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতের স্ত্রী ফারানাজ ইসপাহানী ও আরও কিছু পাকিস্তানের প্রখ্যাত ব্যক্তিত্বও, যাঁদের পাকিস্তান ছাড়াও অন্য দেশের নাগরিকত্ব প্রমাণিত হয়েছে. স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের প্রধানকে পাকিস্তানের বিচারালয় দেশের আইন খুবই ন্যক্কার জনক ভাবে লঙ্ঘনের অভিযোগে দায়ী করেছে, যেখানে পাকিস্তানের নেতৃস্থানীয় কর্মীদের দ্বিতীয় কোন দেশের নাগরিক হওয়ার কোনও অধিকার নেই বলেই উল্লেখ করা রয়েছে. কিন্ত রেহমান মালিক চালাকি করেছিলেন ও চেষ্টা করেছিলেন বিচারালয়কে ভুল পথে পরিচালনা করার. তিনি শপথ নেওয়ার সময়ে ২০০৮ সালে প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিলেন যে, তিনি অন্য কোনও দেশের নাগরিক বা এক্তিয়ারে ভুক্ত নন. এই কথা বলেই দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী দেশের সংবিধান ও আইন ভঙ্গ করেছেন. “গ্রেট ব্রিটেনের এক্তিয়ারে ভুক্ত লোকরা নিজেদের ব্রিটেনের রানীর প্রজা বলেই মনে করে ও তাই তারা পাকিস্তানের আইন সংক্রান্ত কোন নির্দেশ তৈরী ও গ্রহণের কাজে যুক্ত থাকতে পারে না”, - এই কথাই উল্লেখ করা হয়েছে রায় দেওয়ার পরে সুপ্রীম কোর্টের বিচারপতি খিলজি আরিফের বক্তব্যে.

কয়েক দিন আগেই সুপ্রীম কোর্ট রেহমান মালিককে একই সঙ্গে দুটি দেশের নাগরিকত্বের কারণে লোকসভার সদস্য পদ থেকে বাতিল করেছিল. মালিক পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর পদ থেকেও বরখাস্ত হয়েছিলেন. কিন্তু তার এক সপ্তাহ পরেই রাষ্ট্রপতির নির্দেশে তাঁকে রাষ্ট্রপতির স্বরাষ্ট্র বিভাগীয় বিষয়ে পরামর্শ দাতার পদ দেওয়া হয়েছিল. এই বছরের ৪ঠা জুন করাচী শহরে অন্তর্বর্তী কালীণ নির্বাচনে রেহমান মালিক আবার লোক সভার সদস্য পদ জিতে নিয়েছেন ও আবারও পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর পদে বহাল হয়েছিলেন.

রেহমান মালিকের লোকসভার সদস্য পদ কেড়ে নেওয়া পাকিস্তানের সুপ্রীম কোর্টের আবার একটি সাফল্যের লক্ষণ, যে প্রতিযোগিতা দেশের প্রশাসনের সঙ্গে তাদের চলছে, এই কথাই উল্লেখ করে স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ আঝদার কুরতভ বলেছেন:

“দেশের এই খুবই প্রভাবশালী দপ্তরের সিদ্ধান্ত শুধু দেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই প্রভাব ফেলে না, বরং আন্তর্জাতিক নীতিতেও ফেলে থাকে. তাই আমার মতে, এই গৃহীত সিদ্ধান্তের অর্থ হল যে, পাকিস্তানের রাজনীতিতে আবার একটি লড়াই শুরু হল. এখানে আরও একটি বিষয় দৃষ্টি আকর্ষণ করে. সুপ্রীম কোর্টের রায় এই মন্ত্রীর সম্বন্ধে খুবই কঠোর ভাবে দেওয়া হয়েছে, তিনি শুধু তাঁর কুর্সিই হারালেন না, তাঁকে খুবই বড় অঙ্কের অর্থ খেসারতও দিতে হবে. রেহমান মালিক বাধ্য হবেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী থাকাকালীণ, তাঁকে দেওয়া সমস্ত রকমের সম্পত্তি ও আর্থিক অনুদান ফেরত দিতে. এই জায়গা গুলিই নির্দিষ্ট করে দেখিয়ে দিয়েছে যে, সুপ্রীম কোর্টের রায়ের সঙ্গে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও জড়িয়ে গিয়েছে”.

দেশের আদালত ও সরকারের মধ্যে বিরোধে, আদালতের সর্বময় কর্তা সম্ভবতঃ টের পেয়েছেন দেশের সামরিক বাহিনীর কাছ থেকে সমর্থন. পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্বের পক্ষ থেকে সরকারের প্রতি খুবই সিরিয়াস অভিযোগ রয়েছে. যথেষ্ট হবে শুধু মেমোগেট সম্বন্ধে মনে করলেই, যা দেশের অসামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে সামরিক কর্তৃপক্ষের বিরোধ তুঙ্গে তুলে দিয়েছিল. পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ও গুপ্তচর বাহিনী সব সময়েই রাজনীতিতে প্রধান ভূমিকা নিয়েছে. পাকিস্তানে বহু সঙ্কটের সময়েই তারা নিজেদের হাতে দেশের ক্ষমতা তুলে নিয়েছিল. বর্তমানের পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্ব জেনারেল আশফাক কায়ানির তরফ থেকে একাধিকবার ঘোষণা করেছে যে, তারা দেশের প্রশাসন নিজেদের হাতে তুলে নিতে চায় না ও আইন সঙ্গত কাঠামোর মধ্যেই থাকতে চায়.

অসামরিক প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে বিরোধের সময়ে দেশের বিচার ব্যবস্থার ভূমিকা খুব বেশী রকমেরই বেড়ে গিয়েছিল, আর সুপ্রীম কোর্ট পাকিস্তানের রাজনীতির একটি প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে.