পাকিস্তানের মন্ত্রীসভা ২১শে সেপ্টেম্বর শুক্রবারকে হজরত মহম্মদের প্রতি আনুগত্যের দিবস পালন করা হবে বলে ঘোষণা করেছে. এই জন্য আবার মন্ত্রীসভার তরফ থেকে বিশেষ অধিবেশন ডাকা হয়েছিল, যেখানে আলোচনার কথা ছিল ১৪টি প্রশ্নে, কিন্তু সব গুলিকেই মুলতুবি রেখে দেওয়া হয়েছিল শুধু একটিরই জন্য – এতটাই তীক্ষ্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে পশ্চিমের সঙ্গে ঐস্লামিক বিশ্বের সম্পর্কের সমস্যা.

বাস্তবে, প্রশাসন শুধু “উপর” থেকে বর্ণনা করেছে ও আইন সম্মত করেছে সেই ব্যাপারকেই, যা অবশ্যম্ভাবী ভাবে হতে চলেছিল – দেশের জনগনকে ইসলাম বিরোধী সিনেমা “মুসলমানেরা নির্দোষের” বিরুদ্ধে পথে নামানোর চেষ্টা, যা বহু রাজনৈতিক দল ও ধর্মীয় সংস্থা এই দেশে করার জন্য চেষ্টা করেছে.

আর যদি বা এই সিনেমা ও তার পরে মুসলিম বিশ্ব জোড়া হিংসার ঢেউ কম বলে মনে হয়ে থাকে – তবে অগ্নিতে ঘৃতাহুতি করেছে এবারে ফ্রান্স. “শার্লি হেব্ডো” নামের এক স্ক্যান্ডাল ছাপার জার্নালের সম্পাদকীয় বিভাগ থেকে একটি ক্যারিকেচার ছাপানো হয়েছে, যেখানে হজরত মহম্মদকে আঁকা হয়েছে অপমানজনক ভাবে. তার ওপরে আবার যখন এই জার্নালের সব কটি সংখ্যা বিক্রী হয়ে গিয়েছিল, আর তার বেশীর ভাগই কিনেছিল বহু মুসলমান লোক, যারা জনসমক্ষে এটাকে পোড়ানোর চেষ্টা করেছে, তখন আবার করে জার্নালের পক্ষ থেকে এটার নতুন করে সংখ্যা ছাপানো হয়েছে.

ফ্রান্সের সরকারি মুখপাত্ররা এই প্রসঙ্গে এই জার্নালের সম্বন্ধে খুবই নরম অবস্থান নিয়েছে. ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী জাঁ-মার্ক এরোর ইন্টারনেট সাইটে সরকারি ঘোষণাতে বলা হয়েছে যে, “ফ্রান্সের একটি মূল নীতিই হল নিজের মত প্রকাশের অধিকার... আর তাই প্রধানমন্ত্রী যে কোন ধরনের বাড়াবাড়িতে নিজের পক্ষ থেকে অসহমত প্রকাশ করতে চান”.

সুতরাং, ফ্রান্সের মন্ত্রীসভার নেতৃত্বের মতে, সব বিষয়েই দোষী হল গিয়ে চরমপন্থীরা, যাদের কাজকর্ম “বাড়াবাড়ি” ধরনের হয়ে থাকে, কিন্তু মোটেও সেই সব লোক নয়, যারা নিজেদের পক্ষ থেকে প্ররোচনা দিয়ে বহু লক্ষ লোকের মনে ক্ষোভের সঞ্চার করে – সেই ধরনের ক্ষোভ, যা পরে এত কঠিন হয় নিয়ন্ত্রণ করা.

এই পুরো ইতিহাসে সবচেয়ে দুঃখের হল যে, বহু লোকই এই ধরনের পরিস্থিতিকে খ্রীষ্টান ও ঐস্লামিক সভ্যতার মধ্যে বিরোধ বলে দেখাতে চাইছে, - যা সম্পূর্ণ ভাবেই স্যামুয়েল হান্টিংটনের সেই গত শতকের নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে লেখা “সভ্যতার সংঘাত” নামের বইতে লেখা তত্ত্বের মতো.

আসলে সভ্যতার মধ্যে লড়াই সত্যই চলছে, কিন্তু তা মনে করার দরকার নেই যে, বিভিন্ন ধর্মের প্রতিনিধিদের মধ্যে হচ্ছে বলে, আসলে সেটা একদিকে হচ্ছে পশ্চিমের সমাজের ধর্মে অনাসক্তি ও ধর্ম নিরপেক্ষতার নাম দিয়ে করা কাজের সঙ্গে অন্যদিকে খ্রীষ্টান ধর্ম সহ বিশ্বের সমস্ত প্রধান ধর্মের মধ্যেই, এই রকম মনে করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“সেই সমস্ত লোকই খুব ঠিক যে, যারা নিজেরা মুসলমান না হয়েও ইসলামের প্রতীকের অবমাননার মধ্যে নিজেদের ব্যক্তিগত ভাবেই অপমানিত বলে মনে করে থাকেন. ঠিক একই রকম ভাবেই, কিছু দিন আগে মস্কো শহরের অর্থোডক্স গির্জায় প্ররোচনার ঘটনা ও তার পরে অর্থোডক্স ক্রুশ চিহ্নের উপরে অবমাননার ঢেউ, যা শুধু অর্থোডক্স খ্রীষ্টানদেরই নয়, এমনকি শুধু খ্রীষ্টানদেরই ক্ষোভের কারণ হয় নি. ঠিক একই ভাবে যে কোন ধর্ম বা মতবাদের উপরে অবমাননার প্রচেষ্টা, যা ইহুদী, হিন্দু, বৌদ্ধ অথবা অন্য যে কোন ধর্ম মতের উপরেই করার চেষ্টা করা হলে, তা অবিলম্বে ও একই সঙ্গে সকলেরই, যাদের জন্য “ঈশ্বর”, “বিশ্বাস” ও “বিবেক” ইত্যাদি শব্দ গুলি অর্থহীণ হয়ে যায় নি, তাদের সকলেরই সমালোচনার যোগ্য হওয়া উচিত্.

ওই সিনেমা ও ক্যারিকেচার গুলি যারা বানিয়েছে, তারা যা করেছে – সেটা একটা আহ্বান, যা সম্পূর্ণ ঐতিহ্য ও পরম্পরা মেনে চলা বিশ্বের বিরুদ্ধেই করা হয়েছে সেই সমস্ত শক্তির পক্ষ থেকে, যারা চায় কোন এক ধরনের অবক্ষয়ের ধারণাকে পত্তন করতে, যা পশ্চিমের বহু দেশেই পরিলক্ষিত হয়েছে ও যা দেখে সমগ্র ঐস্লামিক বিশ্বেই একটা শক্তিশালী বিরোধী ঢেউ এসেছে”.

এখানে আশা করার দরকার হবে যে, পাকিস্তানে হজরত মহম্মদের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের দিন, যে রকম এর নামেতেই রয়েছে, ঠিক তেমনই ভাবে শান্তি প্রিয় ভাবেই পালন করা হবে আর তা কোন রকমের হিংসা, মারামারি, ভাঙচুরের দিনে পরিণত হবে না, যা বিগত সপ্তাহ গুলিতে লিবিয়া ও অন্যান্য আরব দেশ গুলিতে হয়েছে. তা না হলে নতুন ধরনের প্ররোচনার অপেক্ষা করা যেতে পারে. আর তখন এই “সভ্যতার সংঘাত” নামের ধারণা, সত্যই হয়ত বাস্তবে পরিণত হতে পারে.