১৫৫ বছর আগে (১৭ই সেপ্টেম্বর) রাশিয়ার এক প্রত্যন্ত গ্রামে জন্মেছিলেন আধুনিক মহাকাশ বিজ্ঞানের জনক কনস্তানতিন শিয়ালকোভস্কি. পৃথিবী – মানব সভ্যতার শিশু বয়সের পালঙ্ক, কিন্তু চিরকাল বাচ্চার দোলনায় থাকা সম্ভব নয়, - তিনি বলতেন. মহাকাশ যুগের বহু দিন আগেই এই জিনিয়াস বিজ্ঞানীর পক্ষে সম্ভব হয়েছিল সেই ফর্মুলা আবিষ্কার করার, যা ব্যবহার করে আজও রকেট পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে পার হয়ে যেতে পারছে.

শিয়ালকোভস্কির চারশো বৈজ্ঞানিক কাজ বর্তমানে জানা গিয়েছে. এর মধ্যে রয়েছে – রিয়্যাক্টিভ রকেটের ড্রয়িং, পূর্বাভাস, দার্শনিক চিন্তা ভাবনা ও আন্তর্গ্রহ পরিভ্রমণ সংক্রান্ত কল্প বিজ্ঞানের উপন্যাস. তিনি মহাকাশ নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন একেবারেই শিশু বয়স থেকে, এই কথা উল্লেখ করে শিয়ালকোভস্কির নামাঙ্কিত মহাকাশ বিজ্ঞানের ইতিহাস নামের জাদুঘরের সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রধান তাতিয়ানা ঝেলনিনা বলেছেন:

“তাঁর মনে হয়েছিল যে, তিনি এই স্বপ্ন নিয়েই জন্মেছিলেন. শিয়ালকোভস্কি বহু দিন পর্যন্ত জানতেন না কি করে মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে পার হওয়া যাবে. এই শক্তিকে পার হতে হলে, কম করে হলেও গতিবেগ ঘন্টায় ২৮ হাজার কিলোমিটার করতে হবে, সেই খবর তিনি পেয়েছিলেন, তাঁর পনেরো বছর বয়সে মালিনিন নামক এক বিজ্ঞানীর পাঠ্য বই থেকে. এটা সেই সময়ে রাশিয়ার সেরা পদার্থ বিদ্যার বইয়ের একটি ছিল. কিন্তু কি রকম হবে সেই ওড়ার যন্ত্র, যা মহাকাশে যাওয়ার মতো গতিবেগ অর্জন করতে পারে, তা তিনি জানতেন না”.

১৭ বছর বয়সে, তিনি তাঁর মনে হয়েছিল যে, তিনি এই ধরনের যন্ত্র আবিষ্কার করতে পেরেছেন. তিনি সারা রাত ধরে মস্কোর রাস্তায় হেঁটেছিলেন, তখন এই শহরেই তিনি থাকতেন, আর সকালে বুঝতে পেরেছিলেন যে, তাঁর হিসাবে ভুল হয়েছে. পরবর্তী ২০ বছর শিয়ালকোভস্কি মহাকাশের পরিপার্শ্বিক চিন্তায় কাটিয়ে ছিলেন, তাই তাতিয়ানা ঝেলনিনা বলেছেন:

“যদি এই রকমের হত যে, মহাকাশ জীবন্ত মানব দেহকে কিছুতেই থাকতে দেবে না, তবে কোন যন্ত্র আবিষ্কার করে সেখানে যাওয়ার চেষ্টা করার কোন দরকারই থাকত না আর মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে জয় করার কোনও দরকার হত না. তিনি কিছু ভাল বই লিখেছিলেন. আর সেখানেই তিনি সেই বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, যা আজ জানা রয়েছে পদার্থবিদ্যার এক শাখা ভরহীণতা বিজ্ঞান বলে. আর তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, মহাকাশের পরিপার্শ্বিক মানুষকে মেরে ফেলবে না. সে পারবে সেখানে মানিয়ে নিতে, ভরহীণতা সংক্রান্ত বিপজ্জনক প্রভাবকে কাটিয়ে উঠতে পারবে”.

0বিশ্বের প্রথম মহাকাশচারী ইউরি গাগারীন বলেছিলেন যে, তিনি বাস্তবে শিয়ালকোভস্কির করা মহাকাশ যাত্রার প্রভাব সম্বন্ধে ধারণা যে কত নিখুঁত ছিল, তা বুঝতে পেরেছিলেন. ১৯০৩ সালে বৈজ্ঞানিক পরিদর্শন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল “জাগতিক এলাকায় রিয়্যাক্টিভ যন্ত্র দিয়ে পরীক্ষা” নামে এক প্রবন্ধ. তাতে প্রথম প্রস্তাব করা হয়েছিল শিয়ালকোভস্কির ফর্মুলা নামে প্রখ্যাত বিষয়. তা ছিল খুবই সহজ – মহাকাশের গতিবেগ অর্জন করার জন্য জ্বালানীর ওজন হতে হবে, মহাকাশ যানের ওজনের চেয়ে চার গুণ বেশী. বাস্তবে এই কাজ করার জন্য গবেষক প্রস্তাব করেছিলেন বহু পর্যায়ে গতিবেগ অর্জন কারী মহাকাশ যানের নীতি. গবেষকরা এখনও অবধি অবাক হয়েছেন যে, শিয়ালকোভস্কি কত দূরদর্শী ছিলেন, যিনি আগেই বর্তমানের পারস্পরিক ভাবে যোগ করা কক্ষের কথা বলেছিলেন ও খোলা মহাকাশে বের হওয়ার উপযুক্ত মহাকাশ যাত্রীর পোষাকের বর্ণনা দিয়েছিলেন. বর্তমানে পৃথিবীর মানুষের কাছে রয়েছে কক্ষ পথে নিজেদের গৃহ – আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন. এই ২০০ টন ওজনের মহাকাশ যান সহজেই পৃথিবীর কাছের বায়ু মণ্ডল ছাড়া কক্ষপথে অবিরত ঘুরপাক খাচ্ছে. এই ধরনের পৃথিবীর কাছের কক্ষপথে মহাকাশ স্টেশনের ধারণাও প্রথম করেছিলেন শিয়ালকোভস্কি. কিন্তু তাঁর চিন্তার লক্ষ্য ছিল আরও অনেক দূরে. তিনি বিশ্বাস করতেন যে, ভবিষ্যতে চন্দ্রে ও মঙ্গল গ্রহে গিয়ে থাকা সম্ভব হবে. কারণ কনস্তানতিন শিয়ালকোভস্কির মতে মানব সমাজের বেঁচে থাকার জন্যই প্রয়োজন পড়বে “এমন এক গুচ্ছ জায়গার, যা অন্তত পক্ষে আমাদের সৌর মণ্ডলের গ্রহ গুলিতেই থাকতে পারে”.