গত শুক্রবারে ভারতের মন্ত্রীসভা সম্ভবতঃ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আর নিজেদের এই বারের প্রশাসনিক সময়ে সবচেয়ে ঝুঁকি পূর্ণ এক সিদ্ধান্ত নিয়েছে. তারা বিদেশের বৃহত্ খুচরো পণ্য বিপণন নেটওয়ার্ক গুলিকে – যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ালমার্ট অথবা ব্রিটেনের টেসকো ইত্যাদি সংস্থা গুলিকে দেশে নিজেদের হাইপার মার্কেট খোলার ব্যবস্থা করার সম্ভাবনা দিয়েছে. প্রসঙ্গতঃ বিদেশী কোম্পানী গুলির এই ধরনের প্রকল্পে শেয়ার হতে পারে শতকরা ৫১ ভাগ অবধি. এতদিন অবধি বিদেশের খুচরো পণ্য বিপণন সংস্থা গুলি ভারতে কাজ করতে পারত, কিন্তু তাদের ব্যবসা করার অধিকার ছিল শুধু স্থানীয় ও আরও ক্ষুদ্র খুচরো ব্যবসায়ী সংস্থা গুলির মাধ্যমেই.

গত বছরের নভেম্বর মাসেই মন্ত্রীসভা এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ঠিক করেছিল, কিন্তু তখন গণ প্রতিবাদের ঠেলায় বাধ্য হয়েছিল, তা বাতিল করার. বর্তমানে সব প্রতিবাদ স্বত্ত্বেও এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পিছনে জোরের কারণ হয়েছে বিগত কয়েক মাস ধরে ভারতের অর্থনৈতিক উন্নতির গতিতে মন্দা. আরও সক্রিয়ভাবে ভারতের অর্থনীতিতে বহুজাতিক সংস্থা গুলিকে অংশ নিতে আহ্বানের কারণ নতুন বিনিয়োগ পাওয়ার অভিপ্রায়, আর এতে বহু অর্থনীতিবিদ ও ভারতের বৃহত্ ব্যবসায়ের প্রতিনিধিরা দেখতে পেয়েছেন একমাত্র উদ্ধারের পথ.

“অর্থনৈতিক বিকাশের লক্ষ্য শতকরা ৮, ২ ভাগ উন্নতি সাধনের জন্য আমাদের উচিত্ বিনিয়োগ বাড়তে দেওয়া”, - বলেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ, তিনি এই ভাবেই এই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা করেছেন. “এর জন্য প্রয়োজন পুরুষকার ও কিছু ঝুঁকি জেনেশুনেই নেওয়া, কিন্তু আমাদের কাজ হওয়া উচিত্ এই শুরুকেই বাস্তবায়িত করা”.

আসলে, যখন প্রধানমন্ত্রী ঝুঁকির কথা বলেছেন, তখন তিনি সরাসরি কেন্দ্র বিন্দুতেই আঘাত করেছেন. এটা শুধু এই রকমই নয় যে, এই ধরনের সিদ্ধান্তের থেকে লাভ মোটেও এতটা দৃষ্টি গ্রাহ্য নয়, বরং তার থেকে পরিনাম একেবারে প্রথমেই দেখতে পাওয়া যাবে. যে মুহূর্তে বড় পণ্য বিপণন সংস্থা গুলি কাজ করতে শুরু করবে, তখনই বহু লক্ষ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে কাজ করা লোক – যারা শুধু ভারতের সবচেয়ে বড় সামাজিক স্তরই নয়, বরং বিশেষ করে ভারতের “প্রত্যন্ত” এলাকায় উল্লেখ যোগ্য সামাজিক পরিবর্তনের দূত, তারা সকলেই দেউলিয়া হয়ে যাবে, এই রকম মনে করে রুশ স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এখন ভারতের মন্ত্রীসভা ও বহু অর্থনীতিবিদই বলছেন যে, বৃহত্ প্রকল্পের রূপায়ণ হলে বেশীর ভাগ ক্রেতার জন্যই জিনিষের দাম কমবে ও বহু লক্ষ কর্ম সংস্থান হবে. সম্ভবতঃ এটা তাই হবে. কিন্তু তার আগে পার হতে হবে এত বেদনা দায়ক বহু সংখ্যক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার মতো সময়”.

এটা হঠাত্ করেই, নাকি তা নয়, তবে এই দিন গুলিতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে এক সংজ্ঞাবহ খবর এসে পৌঁছেছে. নিউইয়র্ক শহরের প্রশাসন ওয়ালমার্ট কোম্পানীর তরফ থেকে সেই শহরে প্রথম বিপণন কেন্দ্র খোলার প্রচেষ্টা বাতিল করে দিয়েছে. এটা সেই দেশেই – যেখানে ওয়ালমার্ট কোম্পানীর সারা দেশ জুড়ে চার হাজার এই রকমের কেন্দ্র রয়েছে. শহরের প্রশাসনের এই প্রসঙ্গে যুক্তি অকাট্য: ওয়ালমার্ট কোম্পানীর দোকান খোলা হলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী দেউলিয়া হয়ে যাবে. এই কোম্পানীর স্বপক্ষে সেই তথ্যও নয় যে, তারা তাদের কর্মীদের খুব কম বেতন দিয়ে থাকে ও কোন সামাজিক সুবিধা দেয় না. সুতরাং সেই সব অর্থনীতিবিদদের ভবিষ্যদ্বাণী যে, ভারতে এই ধরনের নেটওয়ার্ক খুলতে দেওয়া হলে বহু লক্ষ কর্ম সংস্থান হবে, সেটাও দেখা দরকার সাবধান হয়েই.

বৃহত্ বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানকে খুচরো ব্যবসায়ে ঢুকতে দেওয়া ঠিক হবে কি হবে না, এই দোনামোনার কম করে হলেও দুটো দিক রয়েছে: সব মিলিয়ে সভ্যতা সংক্রান্ত ও রাজনৈতিক, তাই বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“আজ বাস্তবে প্রায় সমগ্র মানব জাতিই বিশ্বায়নের সামনে সমস্যায় পড়েছে ও উত্তর দিতে অসমর্থ যে, এর সঙ্গে আরও কি আসছে, - তা শুভ – তুলনামূলক ভাবে কম দামে যে কোন ধরনের পণ্যের মধ্যে দিয়ে যা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, নাকি অশুভ – যা, ঐতিহ্য অনুযায়ী জীবনের ধারাকে নষ্ট করে দিচ্ছে. এই প্রশ্নের কোন একটি মাত্র উত্তর দেওয়াই সম্ভব নয়.

কিন্তু যা সহজেই চোখে পড়ছে, তা হল ভারতে ঠিক এই সময়েই এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক ভাবে মোটেও ভাল সময় বাছা হয় নি. বিগত দেড় দুই বছরে ভারতে হয়েছে একের পর এক বিশাল স্ক্যান্ডাল, আর মন্ত্রীসভার জনপ্রিয়তা কমে গিয়েছে খুবই. তার সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত, যা ভারতের বহু লক্ষ মানুষের জীবনে রেখাপাত করবে, তা নেওয়া হয়েছে ঠিক তার পরের দিনই, যখন সারা দেশে ডিজেল জ্বালানীর দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এক ধাক্কায় শতকরা ১৪ শতাংশ”.

এখন অপেক্ষা করা যেতে পারে খুবই শক্তিশালী প্রতিবাদী প্রতিক্রিয়ার ও মন্ত্রীসভার জনপ্রিয়তা আরও কম হয়ে যাওয়ার. বাস্তবে ভারতের সমস্ত বিরোধী দল সরকারের এই সিদ্ধান্তকে নাম দিয়েছে “গণতন্ত্রের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা” বলে. আর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ও জোট সরকারের এক শরিক দল তৃণমূল কংগ্রেস দলের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হুমকি দিয়েছেন যে, তিনি মন্ত্রীসভা থেকে নিজেদের দলের মন্ত্রীদের পদত্যাগ করিয়ে ফেরত নিয়ে যাবেন.