এই সপ্তাহে বিশ্ব সমাজ স্মরণ করেছে ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরের ট্র্যাজেডির ঘটনায় নিহতদের. ঠিক ১১ বছর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আল- কায়দা দলের সন্ত্রাসবাদী অন্তর্ঘাত হয়েছিল. সন্ত্রাসবাদী হানার একাদশতম বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে পেন্টাগনের স্মৃতি সৌধের সামনে বক্তৃতা দিতে গিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা ঘোষণা করেছেন যে, ২০১৪ সালের শেষে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে শেষ সৈন্যদল ফেরত নিয়ে যাবে, তখন শেষ হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় যুদ্ধ. কিন্তু বহু পর্যবেক্ষকই এখন অবধি ভরসা করতে পারেন নি যে, আফগানিস্তান থেকে সম্পূর্ণ ভাবে আমেরিকার সৈন্যদল চলে যাবে, বরং মনে করেছেন যে, এই দেশের পরিস্থিতি এখনও স্থিতিশীলতার থেকে অনেক দূরে.

তুরস্কের আন্তর্জাতিক স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা কেন্দ্রের নিরাপত্তা ও আমেরিকার রাজনীতি সংক্রান্ত প্রশ্নের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মেখমেত ইয়েগিন বিশ্বাস করেন যে, বারাক ওবামা যদি আবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে সৈন্যদল প্রত্যাহার করবে. প্রসঙ্গতঃ, তাঁর মতে, আফগানিস্তান থেকে আমেরিকার সৈন্য প্রত্যাহার, খুব সম্ভবতঃ হবে ইরাকের মত করেই, তাই তিনি বলেছেন:

“মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র খুব সম্ভবতঃ ২০১৪ সালেই সেনা প্রত্যাহার করবে. যদি ওবামা পুনর্নির্বাচিত হন, তবে এর সম্ভাবনা খুবই বেশী, কারণ তাঁকে নিজের দেওয়া কথা রাখতে হবে. কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সব ফেলে রেখে এই দেশ থেকে একেবারেই চলে যাবে. আগে যেমন ঘোষণা করা হয়েছিল যে, ইরাক থেকেও মার্কিন সেনা বাহিনী চলে যাবে, কিন্তু পরে ঘোষণা করা হয়েছিল যে, এই এলাকায় প্রায় তিন হাজার মার্কিন সেনা রয়েই গিয়েছে. অবশ্যই, সৈন্যদল প্রত্যাহারের অর্থ এই নয় যে, আমেরিকার এই এলাকায় উপস্থিতি নিশ্চিহ্ণ হয়ে যাওয়া, অর্থাত্ সম্ভবতঃ সৈন্যরা দেশ ছেড়ে যাবে, আর তাদের জায়গায় থাকবে ব্যক্তিগত মালিকানার প্রহরা দেওয়ার কর্মীরা, যারা চুক্তি অনুযায়ী কাজ করবে.

একই সঙ্গে এটাও জানা নেই যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে নিজেদের সেনা বাহিনী সম্পূর্ণ ভাবে ফেরত নিয়ে যাবে কি না. সেই দেশে ঘাঁটি থাকবে কি না? এটা নির্ভর করছে, সেই ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়ার উপরেই, আফগানিস্তানের প্রশাসন ও তাদের বিরোধীদের যোগাযোগের বিন্দু গুলির উপরেই. আর যদি আফগানিস্তানে ঘাঁটি নাও থাকে, তবুও আমার মনে হয় যে, আমেরিকার লোকরা উজবেকিস্তান অথবা কিরগিজিয়াতে থেকে যাবে, সেই সব আঞ্চলিক দেশ গুলিতে, যাদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক”.

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে, এই অঞ্চলের দেশ গুলির সঙ্গে সামরিক ঘাঁটি রাখার বিষয়ে চুক্তি করতে চাইবে, তা নিয়ে সহমত হয়েছেন কাদীর উস্ত্যুয়ুন – তিনি ওয়াশিংটনে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষণের জন্য তুরস্কের তহবিলের বিশ্লেষণ গোষ্ঠীর প্রধান, তিনি তাই বলেছেন:

“ধরে নেওয়া যেতে পারে যে, ইরাকের মত করেই সেনা বাহিনী প্রত্যাহার করা হবে. অর্থাত্ ইরাক থেকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সেই সৈন্যদল, যারা সক্রিয় যুদ্ধে অংশ নিয়েছে, আর তারা এখন রয়েছে পারস্য উপসাগরীয় দেশ গুলিতে. একই সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করেছে যে, আগামী দশ বছরে তারা সেই রাজনীতিই করবে, যাতে নিজেদের এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় উপস্থিতি ফিরিয়ে আনা যায় মজবুত করে. এটা অবশ্যই যে, তার মানে এই নয় যে, নিকট প্রাচ্য থেকে তারা সম্পূর্ণ ভাবেই চলে যাবে, কিন্তু পরিকল্পনা মাফিকই এই এলাকায় নিজেদের উপস্থিতি কমাবে. আর এটাও ঠিক যে, এশিয়াতেও তারা আফগানিস্তান ছেড়ে সম্পূর্ণ ভাবে যেতে চাইবে না ও এই দেশকে আল- কায়দা দলের ইচ্ছামতো ব্যবহারের জন্য ছেড়ে দেবে না. তাই আমি মনে করি যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চেষ্টা করবে এই এলাকার দেশ গুলির সঙ্গে চুক্তি করে এখানেই থেকে যাওয়ার”.

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই রাজনীতি এই এলাকার দেশ গুলিতে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে. যেমন, এই সপ্তাহেই রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রী সের্গেই লাভরভ পশ্চিমকে আহ্বান করেছেন আফগানিস্তান সম্পর্কে নিজেদের পরিকল্পনা ও কাজ সম্বন্ধে যথাসম্ভব বেশী করে জানানোর জন্যে. লাভরভ এশিয়াতে ভরসা ব্যবস্থা ও সহযোগিতা সংস্থার সদস্য দেশ গুলির পররাষ্ট্র মন্ত্রী পর্যায়ের অধিবেশনে বক্তৃতা দিতে গিয়ে অংশতঃ বলেছেন: “আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না, আফগানিস্তানের পরিস্থিতির কি হবে, বিশেষ করে পরস্পর বিরোধী সেই সব ঘোষণার আলোকে যে, ২০১৪ সালে বিদেশী সৈন্যদল এই দেশ ছেড়ে চলে যাবে, কিন্তু বিদেশী সামরিক ঘাঁটি থেকে যাবে. এখানে দরকার স্পষ্ট করে বলার: যদি সন্ত্রাস বিরোধী মিশন শেষ হয়ে গিয়ে থাকে, আর এতে আপাততঃ সন্দেহই রয়েছে, তার অর্থ হল যে, এই সব সামরিক ঘাঁটি কি থাকবে আফগানিস্তানের সঙ্গে যোগ নেই এমন সব কাজের জন্যই?”

বর্তমানে আফগানিস্তানে জোট সৈন্য দলের বহু সংখ্যক সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, তাতে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ সড়ক গুলির সংলগ্ন ছোট ব্লক পোস্ট থেকে শুরু করে, বড় আফগানিস্তানের শহর গুলির উপকণ্ঠে বড় সামরিক ঘাঁটি পর্যন্ত. একই সঙ্গে সমস্ত ঘাঁটির সঠিক সংখ্যা নির্ণয় করা খুবই কঠিন. যেমন, কিছুদিন আগে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছিল যে, ন্যাটো জোটের প্রতিনিধি লেফটেন্যান্ট কর্নেল ডেভিড অলসনের কথামতো ২০১১ সালের অক্টোবর মাসের পরিস্থিতি অনুযায়ী আফগানিস্তানে ছিল প্রায় ৮০০ টি ঘাঁটি, কিন্তু তার পর থেকে বন্ধ করা হয়েছিল ২০২ টি, আর আরও ২৮২ টি ঘাঁটি আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণে দেওয়া হয়েছে. অর্থাত্, বাস্তবে ন্যাটো জোটের আফগানিস্তানে আরও প্রায় ৩০০ টি ঘাঁটি রয়েছে. এক দিক থেকে আফগানিস্তানে নির্দিষ্ট সংখ্যক সামরিক ঘাঁটি রেখে দেওয়ার ইচ্ছা, আর অন্য দিক থেকে – এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশে নতুন সামরিক ঘাঁটি তৈরীর অভিপ্রায়, স্বাভাবিক ভাবেই অনেক প্রশ্নের সূচনা করে, যা আমেরিকার নেতৃত্বের সত্যিকারের ইচ্ছা নিয়েই অনেক প্রশ্নের সামনে খাড়া করে দেয়.