ইরান নতুন মডেলের অর্থনীতি বিকাশের পথ ধরেছে, যা দেশের আভ্যন্তরীণ বাজার ও একই সময়ে খনিজ তেল রপ্তানীর উপর থেকে নির্ভরশীলতা কম করার উপরে তৈরী করা হয়েছে. এই বিষয়ে ঘোষণা করেছেন ঐস্লামিক প্রজাতন্ত্রের প্রভাবশালী প্রয়োজনীয়তা সভার সম্পাদক মেসিন রেজাই. “এক নতুন ব্যবস্থা তৈরী করা হচ্ছে, যা আসন্ন বছর দুয়েকের মধ্যেই দেশের অর্থনীতিকে নতুন করে তুলবে”, তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে, “এটা কঠোর ব্যয় সঙ্কোচ, বা কালো বাজারের উপরে নির্ভর করা কোনও অর্থনীতি নয়, বরং নিষেধাজ্ঞার বেড়ীর মধ্যে অর্থনীতি কাজ করার মডেল”. রেজাই এর কথামতো, নতুন অর্থনৈতিক রাজনীতির ভিত্তি হিসাবে রয়েছে নিজেদের শক্তির উপরেই বেশী করে নির্ভরতা.

ঐস্লামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের জন্য এই ধারণা নতুন নয়. জাতীয় শিল্প তৈরীর প্রয়োজন ও দেশের বিজ্ঞানের উন্নতিকে দেশের জাতীয় অর্থনীতি বলে ঘোষণা করেছিলেন ইমাম খোমেইনি নিজেই. আর এই নীতি গুলিকে পরিকল্পনা মাফিক বাস্তবায়ন করাও হচ্ছিল. দশ বছর আগেও ইরানের ছিল খুবই শক্তিশালী রকমের বিকাশের ধারা সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেই. তার মধ্যে অর্থনীতিও ছিল. বহু শক্তি প্রয়োগ করা হয়েছিল যাতে দেশে নিজেদের শিল্প ও তার মধ্যে প্রতিরক্ষা শিল্পেরও উন্নতি হয়. যখন ইরানের বিরুদ্ধে পশ্চিমের দেশ গুলিতে নিষেধাজ্ঞা নেওয়া শুরু হয়েছিল, ইরানের বিশেষজ্ঞ ও প্রযুক্তিবিদরা বাস্তবে আমেরিকার অস্ত্র ব্যবস্থার নকল করে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিল, একই রকম হয়েছিল অসামরিক শিল্প ক্ষেত্রেও. আর এই রকমের নকল করা দিয়েই সৃষ্টি করা হয়েছিল জাতীয় শিল্প, যা ঐস্লামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের জাতীয় অর্থনীতির ভিত্তি.

কিন্তু বিশ্বায়ন, অবশ্যই ইরানকেও স্পর্শ করেছে. ইরানের বাজারে বেশী করেই এখন চিনের পণ্য দ্রব্য এসেছে, অন্যান্য দেশ থেকেও এসেছে. ইরানের অর্থনীতি অবিচ্ছেদ্য ভাবেই হয়েছে বিশ্ব অর্থনীতির অঙ্গ. নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে কঠোর হওয়ার ফলে ইরানে বিনিয়োগের প্রবাহ শুকিয়ে গিয়েছে, ইরানের সঙ্গে অন্যান্য দেশের সামরিক প্রযুক্তি ও অসামরিক উত্পাদনের ক্ষেত্রেও সহযোগিতা ক্ষীণ হয়েছে. এই ভাবেই দেশে তৈরী হয়েছে বিদেশী মুদ্রার অভাব, আর তার সঙ্গেই বাইরের দেশ থেকে পণ্য ও প্রযুক্তি ক্রয়ের বিষয়ে অসুবিধা.

খনিজ তেল রপ্তানীর বিষয়েও নিষেধাজ্ঞা জারী করা হয়েছে. দেশের বাজেট ভর্তুকি দেওয়ার জন্য এইটি ছিল প্রধান আর্থিক উত্স, আর এর অর্থ হয়েছে – ইরানের সামগ্রিক ভাবে দেশের অর্থনৈতিক বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় উত্সই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে.

নতুন অর্থনৈতিক নীতির প্রধান দিক গুলির মধ্যে- শুধু দেশের ভিতরে উত্পাদিত জিনিষ দিয়েই শুধু আমদানী করা পণ্যের বদলের কথা বলা হয় নি ও উত্পাদনের ক্ষেত্রে কর কমানোর কথা বলা হয় নি, বরং খনিজ তেল রপ্তানীর উপরেও নির্ভরশীলতা কমানোর কথা বলা হয়েছে. এই প্রসঙ্গে ভূ রাজনৈতিক সমস্যা গবেষণা একাডেমীর সভাপতি লিওনিদ ইভাশভ বলেছেন:

“ইরান সেই সমস্ত দেশের মধ্যে প্রথম একটি দেশ যারা জাতীয় মুদ্রার বিনিময়ে খনিজ তেল রপ্তানীর কথা বলেছে. নতুন অর্থনৈতিক নীতির পরিস্থিতিতে দেশের মুদ্রা রিয়াল অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার এঞ্জিন হয়েছে, যা দেশের ভিতরের প্রয়োজনকেও মেটানোর উত্স. এটা একটা আশা দেয় যে, অর্থনৈতিক সঙ্কট থেকে বর হওয়া সম্ভব হবে, নিজেদের অর্থনীতিকে উন্নত করে ও নিজেদের দেশেই পণ্য উত্পাদন করে এই কাজ করা সম্ভব হবে, তা নিষেধাজ্ঞা থাকা বা তুলে নেওয়ার মধ্যেও করা হবে. ইরানের সম্ভাবনা হবে অন্যান্য দেশে নিজেদের তৈরী জিনিষ পাঠানোর ও নিজেদের অর্থনীতির কার্বন যৌগের উপরে নির্ভরতা কমানোর”.

কিন্তু রেজাই যে ঘোষণা করেছেন তা হয়েছে রিয়াল মুদ্রার দাম থেমে থাকার পরিপ্রেক্ষিতে. বিগত মাস গুলিতে দেশে প্রাথমিক প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে, একই সঙ্গে বেড়েছে দেশের বিশাল সংখ্যক মানুষের মধ্যে অসন্তোষ, তাই অর্থনীতি- আইন স্কুলের জেনারেল ডিরেক্টর সের্গেই পিয়াতেঙ্কো বলেছেন:

“অবশ্যই এই উল্লেখ করা আধুনিকীকরণের নীতি ইরানের অর্থনীতিকে এক মুহূর্তেই সঙ্কট মুক্ত করে দেবে না, বরং তার জন্য প্রয়োজন হবে সময়ের – সব মিলিয়ে উত্তর কোরিয়া ও কিউবা দেশের উদাহরণ আমাদের যেমন দেখিয়েছে যে, এই নীতিতে চললে, পথ যা কানাগলিতেই. এই সব দেশের বেশীর বাগ লোকই থাকেন দারিদ্র সীমার নীচে”.

ইরানের অবশ্য নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতা ধার করার দরকার নেই, এই ধরনের অভিজ্ঞতা তাদের এক দশক ধরেই পেতে হচ্ছে না. এই সময়ের মধ্যে প্রতিরোধের অর্থনীতি নিজের কাজ করার ক্ষমতা দেখিয়েছে, পশ্চিমের তরফ থেকে সদা পরিবর্তনশীল নিষেধাজ্ঞার প্রতিক্রিয়া করেই. এই বারে কি হবে সেটাই দেখার বিষয়.