ভারতের এক ব্যক্তি যশবিন্দর সিং সঞ্জনওয়ালিয়া ও তাঁর পরিবার, যাঁরা নিজেদের মনে করেন মহারাজ দলীপ সিংহের উত্তরাধিকারী বলেই, তাঁরা ঠিক করেছেন গ্রেট ব্রিটেনের কাছ থেকে বিশ্বের একটি সর্ব বৃহত্ হীরে কোহিনূর, যা আজ ব্রিটেনের মহারানীর মুকুটে শোভা পাচ্ছে, তা দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার. যশবিন্দর সিং সঞ্জনওয়ালিয়া মনে করেন যে তাঁর পূর্বপুরুষ মহারাজ দলীপ সিংহ ১৮৫০ সালে একেবারেই বাল্য বয়সে বাধ্য হয়েছিলেন ইংরেজের হাতে বিশ্বের একটি সবচেয়ে দামী পাথর তুলে দিতে.

এই বাস্তবে এক নাটকীয় ইতিহাসের বিশদ বিবরণ আমাদের সমীক্ষক গিওর্গি ভানেত্সভের কাছে পাওয়া যাবে.

কোহিনূর হীরের ইতিহাস বহু শতক আগে শুরু হয়েছিল. তা অনেক পুরাণ ও কল্প কাহিনী দিয়ে পূর্ণ. এই হীরে প্রথম ছিল ভারতের পৌরাণিক বীর বিক্রমাদিত্যের উষ্ণীষে. তারপরে মাল্য রাজ পরিবারের শাসকদের মুকুটে শোভা পেত এই হীরা. তারপরে বহু দিন ধরে মুঘল সম্রাটদের আয়ত্বে ছিল কোহিনূর. ১৭৩৯ সালে এই হীরের পরবর্তী অধিকার ছিল পারস্যের সম্রাট নাদির শাহের. এর ঝলক দেখে অভিভূত নাদির শাহ বলেছিলেন: “কোহ-ই-নূর!” (“আলোর পাহাড়!”), এই ভাবেই এই পাথরের বর্তমান নামকরণ হয়েছিল. তারপরে এই হীরের মালিক হয়েছিলেন আফগানিস্তানের আমীর বংশ, তাদের থেকেই এই পাথর এসেছিল শিখ মহারাজ বংশের দখলে. যখন ১৮৪৮ সালে দুটি শিখ রেজিমেন্টে বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল, তখন সমস্ত হীরে, মাণিক্য ও স্বর্ণালঙ্কার ইংরেজ বাহিনী নিজেদের যুদ্ধ জয়ের ট্রফি হিসেবে নিয়ে গিয়েছিল. কোহিনূর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী পাঞ্জাবের সামরিক বাহিনীর আত্ম সমর্পণের পরে লাহোর চুক্তির মধ্যেই কেড়ে নিয়েছিল. ১৯৪৯ সালের ২৯শে মার্চ এই চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল পাঞ্জাব সামরিক বাহিনীর পক্ষে মহারাজ দলীপ সিংহ ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর প্রতিনিধি লর্ড ডালহৌসীর মধ্যে. দলীপ সিংহের তখন বয়স ছিল ১১ বছর. সেই বছরেই ১৮৬ ক্যারেট ওজনের পালিশ না করা এই হীরে ইংল্যান্ডের রাণী ভিক্টোরিয়াকে দেওয়া হয়েছিল উপহার হিসাবে. তিনি আদেশ করেছিলেন এই হীরে কেটে পালিশ করার, যা করার পরে হীরের ওজন কমে হয় একশ নয় ক্যারেট. ১৯১১ সালে রাণী মেরির যখন অভিষেক হয়েছিল, তখন তাঁর প্রধান অলঙ্কার হয়েছিল এই ঐতিহ্যময় পাথর.

এই পাথরের দীর্ঘ ইতিহাসে এর আঠেরোজন মালিকের মধ্যে একদল মারা গিয়েছিল বিশ্বাসঘাতকের হাতে, অন্যেরা যুদ্ধে, তৃতীয় একদল বহিষ্কৃত হয়ে নিঃস্ব হয়ে মারা পড়েছিলেন. এই কারণেই এই হীরার কুখ্যাতি রয়েছে. ভারতে মনে করা হয়েছিল যে, “এই হীরা যার কাছে থাকবে, সার দুনিয়া তারই হবে, কিন্তু এই বিশ্বের সমস্ত দুর্দশাও তাকে ভোগ করতে হবে. শুধু ঈশ্বর ও নারী এই হীরা বিনা শাস্তিতে ধারণ করতে পারে”.

এই হীরা ফিরিয়ে আনার জন্য যশবিন্দর সিং কে প্রথমে প্রমাণ করতে হবে ভারতীয় আদালতে যে, তিনি মহারাজ দলীপ সিংহের উত্তরাধিকারী. এই প্রমাণ তিনি ঠিক করেছেন সেই চিঠির ভিত্তিতে করবেন, যা দলীপ সিংহকে ১৮৮৯ সালে যশবিন্দর সিংহের পরিবারের তিন সদস্য মিলে লিখেছিলেন, আর যে চিঠিতে নাকি তথ্য রয়েছে যে, তাঁরা এই শাসক পরিবারের অংশ. যশবিন্দর সিং তাই প্রমাণ করতে চান যে, তাঁর প্রপিতামহ ছিলেন মহারাজের খুড়তুতো ভাই ও পোষ্য পুত্র. যদি এই প্রমাণ স্বীকৃত হয়, তবে যশবিন্দর ঠিক করেছেন ভারত সরকারের কাছে সাহায্যের জন্য আবেদন করবেন ও শক্তি প্রয়োগ বাড়িয়ে এই দামী পাথর দেশে ফিরিয়ে আনবেন. যশবিন্দর সিংহ আশ্বাস দিয়েছেন যে, যেই কোহিনূর ভারতে ফিরে আসবে, তিনি তক্ষুণি তা অমৃতসর শহরের স্বর্ণ মন্দিরে দিয়ে দেবেন.

ভারতে এই ঐতিহ্যময় সম্পদের জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে. এই হীরে ফেরত নেওয়ার প্রসঙ্গ বহুবারই বারত সরকার উত্থাপন করেছে. ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ভারতীয় বংশোদ্ভূত সদস্যরা এমনকি কোহিনূর দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিশেষ আন্দোলনও করেছেন. এই প্রসঙ্গে ভারতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লর্ড ক্যামেরনের সফরের সময়েও তোলা হয়েছিল. কিন্তু লন্ডন এই ঐতিহ্যময় হীরা ফেরতের ব্যাপারে কোনও আগ্রহ দেখাচ্ছে না, অন্য কোনও মূল্যবান জিনিসও ফেরত দিতে তারা তৈরী নয়, যা ভারতে ব্রিটেনের উপনিবেশবাদী লোকরা লুঠ করেছিল. সেখানে খুবই ভয় পাওয়া হয়েছে এই সব বিষয়ে কোন প্রথম রায় দেওয়া নিয়ে. যদি এক জনকে বলা হয় “হ্যাঁ”, তাহলে এমন এক দিন আসবে, যখন ব্রিটিশ মিউজিয়ামে কিছুই থাকবে না – দিল্লীতে এই মন্তব্য করেছিলেন লর্ড ক্যামেরন.

যুদ্ধের সময়ে বা জোর করে লুঠ করে আনা জিনিষ ফেরত সমস্যা খুবই বড় সমস্যা আর বিভিন্ন দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক ভাবে মূল্যবান জিনিষ তাঁদের সত্যিকারের মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া নিয়ে সমস্যা সমাধানের জন্য সহযোগিতার প্রয়োজন, এই রকম মনে করে মস্কোর ভারতীয় গবেষণা কেন্দ্রের ডিরেক্টর তাতিয়ানা শাউমিয়ান বলেছেন:

“এই ইতিহাস এই রকম ভাবেই হয়েছে যে, বিশ্বের বিখ্যাত সব জাদুঘরগুলি - যেমন ব্রিটিশ মিউজিয়াম, ল্যুভর, মেট্রোপলিটান - সবই ঐতিহাসিক ভাবে মূল্যবান জিনিষে পূর্ণ, যা বিভিন্ন সময়ে প্রাক্তন কলোনি গুলি থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল. এই সব জিনিষ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া খুবই জটিল. এই সব জিনিষ চলাফেরা হওয়া দরকার সারা দুনিয়া জুড়েই. মনে তো হয় না যে, ব্রিটেন তাদের জাদুঘরে যা রয়েছে, তা ফেরত দিতে চাইবে. আমার পক্ষে সেই সব লোকদের অনুভূতি বোঝা সম্ভব, এই সব মূল্যবান জিনিষ যাদের এক সময়ে নিজেদের কাছেই ছিল. এই গুলি ফিরিয়ে দেওয়া ন্যায় সঙ্গত ব্যাপারই হত. কিন্তু প্রশ্ন হল কি করে এটা করা হবে”?

ভারত তার নিজের মূল্যবান জিনিষ ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারবে কি না বলা মুশকিল. এই কথা ঠিকই যে, যদি ভারত তাদের শক্তি ইজিপ্ট, গ্রীস, তুরস্ক ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে এক করে, অর্থাত্, যেসব দেশ উপনিবেশবাদী রাষ্ট্রের হাতে সবচেয়ে বেশী কষ্ট পেয়েছে, তাদের সাথে, তবে হয়তো ন্যায় সঙ্গত বিচার আশা করার সম্ভাবনা বাড়তে পারে. হতে পারে যে, এই সমস্ত দেশ একসাথে এক গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনও সাংস্কৃতিক ভাবে মূল্যবান জিনিষ ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া নিয়ে আয়োজন করতেই পারে.