ভারতে কর্নাটক রাজ্যের হাই কোর্টের বিচারপতি কে. ভক্তভটসালার উক্তিকে কেন্দ্র করে এক স্ক্যান্ডাল হয়েছে. “বাল্টিমোর মিরর” সংবাদপত্র খবর দিয়েছে যে, কয়েক দিন আগে আদালতে এক শুনানীর সময়ে এই বিচারপতি এক অভিযোগকারিনী মহিলা, যিনি স্বামী মারধর করেছেন বলে বিবাহ বিচ্ছেদ চাইতে আদালতের শরণাপন্না হয়েছিলেন, তাঁকে বলেছেন: “মহিলারা সব রকমেরই বিয়েতে কষ্ট পেয়ে থাকেন. আপনি বিবাহিতা, আপনার দুটি ছেলেমেয়ে রয়েছে, আর আপনি জানেন যে এর কি মানে – কষ্ট পাওয়া, মহিলা বলেই... আপনার স্বামীর ভাল ব্যবসা রয়েছে, তিনি আপনাদের দেখাশোনা করবেন. তাহলে আপনি কেন মারধর করার কথা বলেই যাচ্ছেন?” বিচারপতির এই ঘোষণা নারী জাতির অধিকার সংরক্ষণের মানবাধিকার রক্ষা সংস্থা গুলির ক্ষোভের কারণ হয়েছে. তারা এক রিট পিটিশনের জন্য স্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযানে নেমেছে, উদ্দেশ্য বিচারপতি কে. ভক্তভটসালার বরখাস্তের দাবী অথবা ন্যূনতম ভাবে তাঁর নর নারী সম্পর্ক সংক্রান্ত মামলায় বিচার করার অধিকার রদ করা.

প্যারাডক্স হলেও এই ঘটনার দুই এক দিন আগেই ভারতের “হিন্দু” সংবাদপত্র এক সংবাদ প্রকাশ করেছিল, যাতে এই বিচারপতি একেবারেই অন্য আলোকে বর্ণিত হয়েছিলেন, তিনি সেপ্টেম্বর মাসের শুরুতে ম্যাঙ্গালোর শহরে এখানের অ্যাডভোকেট সংগঠনের ভবনের শিলান্যাস করেছিলেন. এই অনুষ্ঠানে বিচারপতি বলেছিলেন: “আমরা জন্ম নিই মহিলাদের অনুগ্রহেই. আমাদের উচিত্ মহিলাদের সম্মান করা... কিন্তু আমরা এখন কি করছি? মহিলারা দেবীর মতো, এটা বুঝতে শিখুন! আপনাদের কাছে আবেদন করি, মহিলাদের সম্মান করুন ও তাদের সেবা করুন”. আসলে এখানে একজন নির্দিষ্ট বিচারপতিকে নিয়ে ও উল্লিখিত তাঁর করা পরস্পর বিরোধী বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করা কাজ নয়. আর এমনকি যদি নারীবাদী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মীদের পক্ষে যদি সম্ভবও হয় তাঁর পদত্যাগ, তবুও গভীরে থাকা সমস্যা সমাধান হবে না. আর এখানে নির্দিষ্ট করে বিচারপতি কে. ভক্তভটসালার কথা উঠেছে শুধু এই জন্যই যে, তাঁর উক্তিতেই বর্তমান ভারতের মহিলাদের অবস্থার পরস্পর বিরোধী চিত্র ফুটে উঠেছে, এই রকম মনে করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“একদিকে হিন্দু ধর্মে নারীকে পূজা করা হয়েছে মহাশক্তি মহামায়া – কালি, দুর্গা, লক্ষ্মী ও সরস্বতী রূপে. এই শক্তি সৃষ্টির (মায়ার) শক্তি, যা বাদ দিয়ে একটিও উচ্চ কোটির হিন্দু দেবতার নাম করা সম্ভব নয়. বর্তমানের রাজনীতিতে মহিলারা একই সঙ্গে বিরাট ভূমিকা পালন করছেন. ইন্দিরা গান্ধী, সোনিয়া গান্ধী, প্রতিভা পাতিল, মায়াবতী, মমতা ব্যানার্জি, জয়ললিতা –এঁদের প্রত্যেকের প্রতি যে রকম ভাবেই আলাদা করে দেখা হোক না কেন, তাঁরা সকলেই আগে এবং এখনও ভারতের রাজনীতিতে ও সমাজ জীবনে উল্লেখ যোগ্য ভূমিকা পালন করেছেন.

আর এই রকমের পরিস্থিতিতে খুবই বন্য মনে হয় সমাজে কিছু নির্বাচিত মহিলা মহলের প্রতিনিধির অবস্থানের সঙ্গে বাকি দেশের বহু কোটি মহিলার অবস্থানের দূরত্ব, বিশেষত ভারতেরই “প্রত্যন্ত” প্রদেশ গুলিতে”.

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী ভারতের শতকরা ৩৭ ভাগ মহিলা বাড়ীতেই নিগৃহীতা ও লাঞ্ছিতা হন - তা কোন না কোন ভাবে – প্রায় “কোন দোষই হয় নি” এই রকমের কেশ আকর্ষণ করে টেনে নিয়ে যাওয়া থেকে, সেই রকমের অ্যাক্সিডেন্ট – যখন, সদ্য বিবাহিতা বধুর কাছ থেকে, অর্থাত্ তার পিতা মাতার কাছ থেকে পণ সম্পূর্ণ আদায় হয় নি, এই অজুহাতে বরের অভিভাবকরা গায়ে কেরোসিন ঢেলে দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দেন. এখানে আরও যোগ করা যেতে পারে মহিলাদের কন্যা সন্তান হতে পারে, জানতে পেরে গর্ভপাতে বাধ্য করা, আর তারই সঙ্গে পরিবারের “সম্মান রক্ষার্থে” হত্যা, যখন পরিবারের মুখে কালি লাগিয়েছে বলে আত্মীয়রাই ঘরের মেয়েকে হত্যা করে. মানবাধিকার রক্ষাকারী সংস্থা গুলি উল্লেখ করেছে যে, এই ধরনের ঘটনার সংখ্যা সরকারি ভাবে প্রকাশিত পরিসংখ্যানের প্রায় দ্বিগুন – কারণ বহু রমণীই প্রশাসনকে অত্যাচারের কথা জানাতে ভয় পেয়ে থাকেন.

আর যদি সেই ধরনের ঘটনা – যা খুব কমই হয়ে থাকে – সতীদাহ ঘটে, তবে তা সব সময়েই সমাজের খুবই মনোযোগ আকর্ষণ করে ও প্রচুর আবেগের সৃষ্টি করা থাকে, তবে অল্প বয়সী মেয়েদের পতির অভিভাবকদের হাতে আগুনে পুড়ে মৃত্যুর ঘটনা প্রায় বাস্তবে লক্ষ্যই করা হয় না: “দুর্ঘটনা” বিভাগে তিনটি ছত্রেই তার বর্ণনা শেষ হয়ে যায়.

এই ধরনের ভারতীয় মহিলাদের প্রতি অত্যাচারের প্রসারতা অনেকই বেশী, যতটা ভাবা হয়ে থাকে তার চেয়ে. এই বছরের বসন্ত কালে ভারতের মহিলা সাংবাদিক নিতা ভাল্লা, নিজেই বাড়ীতে অত্যাচারের শিকার হয়ে, বিবিসি সংস্থার জন্য নিজের প্রবন্ধে লিখেছেন যে, প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী নিগ্রহের শিকার হয়ে থাকেন সাধারণতঃ অশিক্ষিত মহিলারাই দরিদ্র পরিবারের যারা সদস্যা. কিন্তু আসলে এমনকি নিজের পেশায় যথেষ্ট প্রতিষ্ঠিত তারই মতন মহিলারাও নিজেদের নিরাপদ ভাবতে পারেন না.

(লেখক পরিচিতি: বরিস ভলখোনস্কি পাশ করেছেন মস্কো শহরের এশিয়া আফ্রিকা দেশ সমূহের ইনস্টিটিউট থেকে ১৯৭৮ সালে. কোন দিনও সরকারি কোন পদে প্রতিষ্ঠার সুযোগ আসে নি, বর্তমানে একটি সদ্য গজিয়ে ওঠা ইনস্টিটিউটের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন, নিজেকে একজন ভারত ও ভারত মহাসাগরীয় দেশ সমূহের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ বলেই মনে করে থাকেন. “রেডিও রাশিয়ার” ভারত - পাকিস্তান ও বাংলাদেশ বিভাগের বর্তমানের প্রধান ইরিনা ম্যাক্সিমেঙ্কো, যিনি উর্দু ভাষার পাঠ ভারতের ইলাহাবাদে সম্পন্ন করলেও যোগ্যতার অভাবে কোন রাষ্ট্রীয় পদ আগে অর্জন করতে পারেন নি ও স্বাভাবিক কারণেই ভারতের প্রতি বিরাগ ভাজন, তাঁর সঙ্গে ভাল পরিচয়ের সুবাদে প্রতি দিনই “রেডিও রাশিয়ার” বেতার তরঙ্গে ও ইন্টারনেট সাইটে ভারতের সমালোচনা (প্রায়ই যা অতিরঞ্জিত) প্রকাশ করে থাকেন. এই সব প্রবন্ধ গুলিই ব্যক্তিগত ধারণা মাত্র ও “রেডিও রাশিয়ার” সম্পাদকীয় বিভাগ এই লেখকের মতের সঙ্গে কখনোই একমত নন.)