১৮১২ সালের ৭ই ডিসেম্বর রাশিয়ার সেনা বাহিনীর প্রধান মিখাইল কুতুজভের কথামতো এক “চির দিনের জন্য রুশ সৈন্যদের বীরত্ব ও পুরুষকারের স্মৃতি দিবস” হয়েছিল. তখন বর্তমানের বরোদিনো গ্রামের কাছে রাশিয়ার সেনা বাহিনী তাঁর নেতৃত্বে নেপোলিয়নের সেনা বাহিনীর সঙ্গে এক ভীষণ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল.

“বন্দীরা কোথায়?” – সমস্ত ইউরোপীয় মহাদেশ বিজয়ের পরে এই দিনের যুদ্ধ শেষে নেপোলিয়ন, ফ্রান্সের সম্রাট অবাক হয়ে এই প্রশ্নই করেছিলেন. কোনও যুদ্ধ বন্দীই ছিল না. রুশীরা সেই দিন যুদ্ধ করেছিল দুর্দান্ত রকমের. ইতিহাস এখনও অবধি এই ধরনের আর কোনও যুদ্ধের খবর জানে না. ৫০ স্কোয়ার কিলোমিটার জোড়া বরোদিনোর মাঠে অবিরত গোলা বর্ষণ করেছিল হাজার কামান. আড়াই লক্ষের বেশী সেনা ভোর থেকে যুদ্ধ করেছিল সন্ধ্যা অবধি, যতক্ষণ না পর্যন্ত সন্ধ্যার আলো অন্ধকারে বিপক্ষকে চাক্ষুষ দেখা সম্ভব হয়. আর প্রতি ঘন্টায় এই যুদ্ধের মাঠে মারা গিয়েছিল আড়াই হাজার করে সেনা, এই কথাই উল্লেখ করে রুশ বিজ্ঞান একাডেমীর প্রতিনিধি সদস্য ও ইতিহাসে ডক্টরেট আন্দ্রেই সাখারোভ বলেছেন:

“বরোদিনোর যুদ্ধের কয়েকটি দিক ছিল. সবচেয়ে মুখ্য হল – রুশ সেনা বাহিনীর জন্য এর বিশাল বিবেক – মূল্যবোধের দিক, রুশী জনগন ও সব মিলিয়ে রাশিয়ার ইতিহাসের জন্যও. যুদ্ধ শেষ হয়েছিল, বলা যেতে পারে সেই দিনে ড্র অবস্থায়. ফরাসীরা জিততে পারে নি, আর রুশীরাও পিছিয়ে যায় নি. বিরোধীরা শেষ অবধি নিজেদের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে ছিল. কিন্তু এই ভয়ঙ্কর দানবের সঙ্গে লড়াইতে, ইউরোপের এই অতিকায় শক্তির প্রতীক অজেয় নেপোলিয়নের সঙ্গে যুদ্ধে রুশী সেনা বাহিনী জায়গা না ছাড়া – এটা মনে হয়েছিল একেবারেই অবিশ্বাস্য”.

১৮১২ সালের যুদ্ধের এক অংশগ্রহণকারী ও বিখ্যাত সামরিক চিন্তাবিদ ক্লাউজেভিত্স মনে করেছিলেন যে, “রাশিয়াকে জয় করার একমাত্র মাধ্যম – এটা প্রশাসন ও জনগনের মধ্যে আভ্যন্তরীণ মতভেদকে ব্যবহার করা. যদি তা না থাকে, তবে তাকে জয় করা সম্ভব নয়”. বরোদিনো যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছিল যে, কোনও মতভেদ ছিল না, তাই আন্দ্রেই সাখারোভ বলেছেন:

“১৮১২ সালের যুদ্ধকে কেন বিশেষ করে নাম দেওয়া হয়েছে পিতৃভূমি রক্ষার যুদ্ধ? কারণ তা দেশের জনতাকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল. বরোদিনো এটাই ঠিক দেখিয়ে দিয়েছে – নাগরিক ঐক্য”.

নেপোলিয়ন বরোদিনো যুদ্ধকে নাম দিয়েছিলেন তাঁর ৫০টি যুদ্ধের মদ্যে সবচেয়ে মহান বলেই. উনবিংশ শতাব্দীতে সেটাই ছিল সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ. তাতে দুই পক্ষের প্রায় এক লক্ষ সৈন্য নিহত হয়েছিলেন, কিন্তু ফরাসী সম্রাট নিজের লক্ষ্য সাধনে অসমর্থ হয়েছিলেন, এই কথাই উল্লেখ করে ইতিহাস বিজ্ঞানে ডক্টরেট ভাদিম রোগিনস্কি বলেছেন:

“কারণ নেপোলিয়নের পক্ষে সম্ভব হয়নি মুখ্য সমস্যার সমাধান – রুশী সেনা বাহিনীকে ধ্বংস করে দেওয়া. আর এটা অনেক দিক থেকেই তাঁর জন্য সমস্ত যুদ্ধের পরিনামকে নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল”.

বরোদিনো যুদ্ধের কয়েক মাস পরে নেপোলিয়নের মহান সৈন্য দল সম্পূর্ণ ভাবে ছত্রভঙ্গ হয়ে গিয়েছিল. পরে তিনি নিজের রুশ দেশে যাত্রাকে বলেছিলেন এক “মারাত্মক ত্রুটি”.

আর এই যুদ্ধ না হতেও পারত. বরোদিনো যুদ্ধের ১১ বছর আগে নেপোলিয়ন রুশ সম্রাট প্রথম পাভেলকে প্রস্তাব করেছিলেন শক্তি ঐক্যবদ্ধ করে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে ও একত্রে ভারত অভিযানে যাওয়ার. ১৮০১ সালে সত্যই কুড়ি হাজার রুশ কসাক সেনা ভারত অভিযানে রওয়ানা হয়েছিল. এই অভিযান কিভাবে শেষ হয়েছিল, তা আপনারা জানতে পারবেন “রেডিও রাশিয়ার” বিশেষ প্রকল্প “উনবিংশ শতক: এশিয়াতে রুশ- ব্রিটেন বিরোধ” নামের অনুষ্ঠানের প্রথমটিতে.