সেপ্টেম্বরে মস্কো আসছেন পাকিস্তানের পদাতিক বাহিনীর প্রধান জেনারেল আশফাক পারভেজ কিয়ানি, খবর দিয়েছে পাকিস্তানের সংবাদ মাধ্যম. মস্কো শহরে তিনি শুধু তাঁর সম পর্যায়ের রুশ সেনা বাহিনীর সহকর্মীদের সঙ্গেই দেখা করবেন না, বরং দেখা করবেন রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গেও. বাস্তবে একই সময়ে ৯ই সেপ্টেম্বর পাকিস্তানে পৌঁছবে রাশিয়া থেকে প্রশাসনের প্রতিনিধি দল, যাঁরা সেখানে পাকিস্তানের সহকর্মীদের সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতার প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করবেন. আর এই সবই হচ্ছে পাকিস্তানে রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিনের হেমন্ত কালে রাষ্ট্রীয় সফরের আগেই.

পাকিস্তানের সংবাদ মাধ্যমে একটি সকলের ঐক্যমতে পৌঁছনো মূল্যায়ণ করে বলা হয়েছে যে, এই রকমের পারস্পরিক সফরে দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে এক নতুন অধ্যায়ের শুরু হতে চলেছে. অনেক ক্ষেত্রেই এটা বাস্তবে এই রকমের: রাশিয়া ও পাকিস্তান বিগত বছর গুলিতে ঠাণ্ডা যুদ্ধের সময়ের পরস্পরের থেকে দূরবর্তী অবস্থান ছেড়ে, প্রায়ই যা খোলাখুলি বিরোধে পরিণত হয়েছিল, তা থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে. কিন্তু মসৃণ করে বলা কূটনৈতিক বাক্য বিন্যাসের পিছনে, যা সংবাদ মাধ্যমে উদ্ধৃতি দেওয়া হয়ে থাকে, প্রায়ই খুব কষ্ট হয় গভীরে চলা প্রক্রিয়া গুলিকে লক্ষ্য করতে, যা রুশ পাকিস্তান সম্পর্কের ক্ষেত্রে হচ্ছে, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“কিন্তু এখানে বাস্তব এটাই, যে এশিয়াতে ও অংশতঃ, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াতে একেবারেই নতুন ধরনের সম্পর্ক সমস্ত আগ্রহী খেলোয়াড়দের মধ্যে হচ্ছে. আজকের দিনে প্রধান বিষয়, যা এই এলাকার পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলেছে – এটা আফগানিস্তানে চলতে থাকা যুদ্ধ ও সেখানে ন্যাটো জোটের আগ্রাসী সেনা দলের উপস্থিতি, প্রাথমিক ভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনা বাহিনীর. কিন্তু ২০১৪ সালে যেমন বিদেশী সেনা বাহিনী আফগানিস্তান ছেড়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে, তাই প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে: তার পরে কি হবে”?

আমেরিকার সেনা বাহিনীর সম্পূর্ণ ভাবে বেরিয়ে যাওয়া খুবই কম সম্ভাব্য: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই এলাকাকে খুবই বড় গুরুত্ব দিয়েছে. তাই মনে হয় যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখানে কিছু সেনা বাহিনীর ছাউনি রেখে দেবে সৈন্য সমেত.

কিন্তু তারই সঙ্গে খুব কমই সম্ভাব্য মনে হয়েছে যে, বিদেশী সেনা বাহিনীর চলে যাওয়ার সঙ্গে আফগানিস্তানে পরিস্থিতি ঠিক হবে বলে. বরং হতে পারে তার উল্টোই – বর্তমানের প্রশাসনের বিপক্ষ দলেরই সেখানে সক্রিয়তা বৃদ্ধি হতে দেখা যেতে পারে.

আফগানিস্তানের এলাকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি থাকা, অথবা এই এলাকায় আরও বেশী করে অস্থিতিশীলতার সৃষ্টি হওয়া কারও জন্যই লাভজনক নয়, তাই বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এটা পাকিস্তানের জন্য লাভজনক নয়, ইরানের জন্য বা মধ্য এশিয়ার আফগানিস্তানের নিকটবর্তী প্রতিবেশী দেশ গুলির জন্যও লাভজনক নয়. এটা ভারত ও চিনের জন্যও লাভজনক নয়, যারা এক দিক থেকে নিজেদের আফগানিস্তানে করা বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন, আর অন্য দিক থেকে – খুবই ভিত্তি মূলক উদ্বেগ এই কারণেই রাখে যে, আফগানিস্তানের মাটিতে ঘাঁটি গেড়ে বসেছে নানা ধরনের সন্ত্রাসবাদী ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের চক্র. আর, এটা অবশ্যই রাশিয়ার জন্যও লাভজনক নয়, কারণ আফগানিস্তানে অস্থিতিশীলতা নিজেদের সমস্ত দিকেরই স্ট্র্যাটেজিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ গুলিকে বিপদের মুখে ঠেলে দেয়. এই পরিস্থিতিতে রুশ – পাকিস্তান সহযোগিতা নতুন মাত্রা এনে দেয়.বলা যেতে পারে, এই প্রথম গত শতকের আশির দশকে সোভিয়েত দেশের আফগানিস্তানে সামরিক অপারেশনের পর থেকে দুই দেশের স্বার্থ এতটা ঘনিষ্ঠ হতে পেরেছে. কিন্তু যদি আশির দশকে সেই স্বার্থ ছিল পরস্পর বিরোধী, তবে আজ দুই দেশেরই স্বার্থ বাস্তবে একই রকমের”.

রাশিয়া ও পাকিস্তানের যোগাযোগ সক্রিয় হওয়া পর থেকে তা পরবর্তী কালে এই এলাকার দেশ গুলির মধ্যে এক সুদূর প্রসারিত সহযোগের সৃষ্টি করতে পারে – প্রাথমিক ভাবে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার পর্যবেক্ষক দেশ হিসাবে - যারা পারে ও যাদের উচিত্ এক কিছুতেই শেষ না হওয়া যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে শান্তি পূর্ণ জীবন পুনঃ প্রতিষ্ঠার কাজে এক হতে.

সংবাদ মাধ্যমে সেই প্রশ্নের উত্তরও হয়েছে নানা রকমের: কেন রাশিয়ার রাষ্ট্রপতির পাকিস্তান সফরের অব্যবহিত আগেই মস্কো এসেছেন পাকিস্তানের সর্বময় সামরিক প্রধান? বরিস ভলখোনস্কি এই প্রসঙ্গে বলেছেন:

“কিছু মন্তব্যকারী মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, পাকিস্তানে সামরিক অভ্যুত্থান হওয়ার প্রসঙ্গ. আমার মনে হয়, যে এই ধরনের কথাবার্তার খুব একটা ভিত্তি নেই: সমস্ত বিগত বছর গুলিতে পাকিস্তানের সেনা বাহিনী ও জেনারেল কিয়ানি নিজে দেখিয়েছেন যে, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী দেশের সংবিধানের মধ্যেই থাকতে চায়. অন্য প্রসঙ্গ হল: পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী আগের মতই দেশে সবচেয়ে শক্তিশালী শক্তি হয়ে রয়েছে, যারা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দিয়ে থাকে, দেশের অখণ্ডতা ও যে কোন রকমের চরমপন্থী হামলাকে মোকাবিলা করে থাকে”.

আগামী নির্বাচনের পরে কে দেশের নেতা হতে চলেছেন, আপাততঃ কেউ তা বলতে চাইবেন না. আসিফ আলি জারদারি গেলে অন্য কেউ আসবেন. কিন্তু সামরিক বাহিনী কোথাও যাবে না. জেনারেল কিয়ানির এই সফর বলে দিচ্ছে যে, রুশ – পাকিস্তান সম্পর্ক – এটা এই মুহূর্তের কোন খেলার দান নয়, বরং একটা প্রক্রিয়া, যা বহু বছর পরের কথা ভেবেই করা হচ্ছে.