“টাইমস অফ ইন্ডিয়া” সংবাদপত্র জানিয়েছে যে, ভারতের হরিয়ানা রাজ্যে এক আইকন শু কোম্পানী নামে আমেরিকার কোম্পানীর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করা হয়েছে, তার কারণ এই কোম্পানী এক ধরনের জুতোয় বুদ্ধের প্রতিকৃতি দিয়ে বের করেছে. মামলা করেছেন এক সক্রিয় পরিবেশ সংরক্ষণ কর্মী নরেশ কাদিয়ান, তার অভিযোগের কারণ হল যে জুতোয় এই প্রতিকৃতি ব্যবহারের ফলে বহু ভারতীয় লোকের ধর্মীয় অনুভবে আঘাত লাগতে পারে. এখানে কথা হচ্ছে যে, এই কোম্পানী শুধু ভারতেই নয়, এমনকি সারা বিশ্বেই এই ধরনের বুদ্ধের প্রতিকৃতি দেওয়া জুতো বিক্রী বন্ধ করতে বাধ্য. নরেশ কাদিয়ান বলেছেন যে, বিশ্বের ৩৬টি দেশ থেকে এই বিষয়ে অভিযোগ এসেছে.

এই মামলা বহু বিখ্যাত বিজ্ঞানীও সমর্থন করেছেন. দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রফেসর ও বৌদ্ধ গবেষণা বিভাগের প্রধান ডঃ সত্যপাল, তাঁর এক সাক্ষাত্কারে “টাইমস অফ ইন্ডিয়া” সংবাদপত্রকে জানিয়েছেন যে, এই কোম্পানী অবিলম্বে এই ধরনের জুতো বিক্রি বন্ধ করতে বাধ্য, সমস্ত বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিতে বাধ্য আর প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে বাধ্য... আমরা একই সঙ্গে জোর দিয়েছি যে, যাতে ভারত সরকারও এই প্রসঙ্গ আন্তর্জাতিক স্তরে উত্থাপন করে.

এখানে খুবই সম্ভব যে, জুতো যারা তৈরী করেছে, তারা কাকেই দুঃখ দিতে চায় নি, - বরং উল্টো হতে পারে যে, ভেবেছিল এই দিয়ে ক্রেতাদের কাছে টানবে, জুতোয় বহু হিন্দু ও বুদ্ধ ধর্মাবলম্বী লোকের জন্য প্রিয় বুদ্ধের প্রতিকৃতি দিয়েই. আর এই সম্পর্কে তাদের জন্য বুদ্ধের প্রতিকৃতি অন্য সব প্রতিকৃতির চেয়ে খুব কম কিছু বিষয়েই আলাদা, যা তারা বিজ্ঞাপনের জন্য ব্যবহার করে থাকে – যেমন, মিকি মাউস, অথবা চে গুয়েভারা. কিন্তু পুরো ইতিহাসটাই দেখিয়ে দিচ্ছে যে, ব্যবসায়ীরা আর রাজনীতিবিদরা, যারা তাদের নিজেদের জন্যই একেবারে সম্পূর্ণ রকমের অন্য ও ভিন্ন সংস্কৃতি গত ভাবে ঐতিহ্যময় দেশে নিজেদের কাজ করার জন্য প্রায়ই কতদূর অমার্জিত হতে পারে, তাই রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এই সবই বলে দেয় যে, যে কোন ধরনের যোগাযোগ, যা বিভিন্ন ধরনের সংস্কৃতির লোকদের হতে পারে, সেখানে অন্তত, আগে থেকে চেষ্টা থাকা দরকার, যাদের সঙ্গে যোগাযোগ হতে চলেছে, সেই সব লোকদের সম্বন্ধে কিছুটা জানার. দুঃখের বিষয় হল যে, বর্তমানের দ্রুত বিশ্বায়ন হয়ে যাওয়া পৃথিবীতে, আরও বেশী করেই উদাহরণ দেখানো হচ্ছে, যখন সহকর্মীদের অনুভূতিকে সম্মান করা হয় না – অথবা অশিক্ষিত বলেই কিংবা জেনে শুনে আর ইচ্ছা করেই অপমান করা হয়ে থাকে”.

যে কোন ভারতীয়ের জন্যই, অন্যান্য আরও বহু দেশের জনতার জন্যও, জুতো – শুধু একটা সাধারন ব্যবহারের জিনিস নয়. অনেকেরই জুতো পরার বিষয় খুবই কঠোর নিয়ম বিধি মেনে পালন করা হয়ে থাকে: যেমন, জুতো অবশ্যই খোলা দরকার হিন্দু ও বুদ্ধ মন্দিরে ঢোকার আগে, মুসলমানদের মসজিদে প্রবেশের আগে. আর জুতো দিয়ে মাথায় মুখে মারা হলে, তাকে মনে করা হয় সবচেয়ে বড় অপমান বলে. মনে করে দেখা যেতে পারে যে, জর্জ বুশের মুখে এক ইরাকের সাংবাদিক জুতো ছুঁড়েই মারতে চেয়েছিল. আর এবারে জুতোয় বুদ্ধের প্রতিকৃতি দেওয়া হয়েছে. আর যদিও সেই ডেনমার্কের কার্টুন শিল্পীদের মতো, এবারে কারোরই হয়ত ইচ্ছা করে ধর্ম ভাবে ঘা দেওয়ার ইচ্ছা ছিল না, তাও এর ফল সেই একই রকমেরই হয়েছে, যা হয়েছিল সেই পয়গম্বর মহম্মদের কার্টুন নিয়ে.

প্রসঙ্গতঃ, অন্য সংস্কৃতির লোক দিয়ে আরেক সংস্কৃতির লোকের অনুভূতিতে আঘাত করা - এটা একটা প্রক্রিয়া, যা প্রায়ই দুই দিকেই চলছে, এই কথা উল্লেখ করে বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“বর্তমানের স্ক্যান্ডাল, যা জুতোয় বুদ্ধের প্রতিকৃতি দিয়ে হয়েছে, তা হয়েছে, ঠিক একই সময়ে, যখন আরেকটি এই ধরনের স্ক্যান্ডাল শেষ হয়ে উঠতে পারে নি – গুজরাট রাজ্যের রাজধানী আহমদাবাদে এক দোকানের নাম হিটলার রাখা নিয়ে যা শুরু হয়েছিল. লোকে বলে যে, দোকানের মালিক নাকি নিজেই জানত না হিটলার কে – এটা ছিল তার পিতামহের একটি প্রচলিত নাম, কারণ তিনি এক সময়ে পাড়ার থিয়েটারে এই ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচারীর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন. কিন্তু দোকানের সাইন বোর্ডে হিটলার লেখা থাকায় অনেকেই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন, বিশেষত ইহুদী সমাজের প্রতিনিধিরা, আর দোকানের মালিকও অবশেষে এই সাইনবোর্ড খুলে নিতে রাজী হয়েছিল”.

অবশ্যই হিটলারের প্রতি সম্পর্ক, সব মিলিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রতি সম্পর্ক ভারতে ততটা এক রকমের নয়, যতটা ইউরোপে রয়েছে. ভারতের এলাকায় সামরিক যুদ্ধ প্রায় হয় নি, আর জার্মান সেনা বাহিনী, যারা ব্রিটেনের বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করেছিল, তাদের এক রকমের জাতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের সহযোগী বলেই ধরে নেওয়া হয়েছিল. শুধু শুধুই এখনও বহু লোকই ভারতে, সুভাষ চন্দ্র বসুকে, যাঁকে নেতাজী বলে ডাকা হয়, তাঁকে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন পথিকৃত বলে মনে করেন, যদিও তিনি চেয়েছিলেন জার্মানীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে ব্রিটিশ বিতাড়ন করবেন. আর হিটলারের “মাইন ক্যাম্পফ” ভারতের বইয়ের দোকানে অবাধেই পাওয়া যায়.