বিগত সপ্তাহ দেখিয়ে দিয়েছে যে, সিরিয়া সঙ্কট থেকে বের হওয়ার পথ নিয়ে নিজেদের অবস্থান ব্যক্ত করার বিষয়ে যেমন রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের চেষ্টা, তেমনই জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন সংস্থার শীর্ষ সম্মেলনের প্রচেষ্টাও আশা ব্যঞ্জক কিছু দেওয়ার চেয়ে বেশী করেই হতাশার উদ্রেক করেছে.

গত সপ্তাহে ফ্রান্স চেষ্টা করেছিল নিউইয়র্কে রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের এক জরুরী অধিবেশনে সিরিয়ার সঙ্কট সমাধানে কর্মরত এই সংস্থার স্থায়ী সদস্য দেশ গুলির পররাষ্ট্র দপ্তর গুলির প্রধানদের একত্রিত করতে. কিন্তু হতাশার বিষয় হল যে, যখন স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, এই অধিবেশনের পরে কোনও ফলাফল সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে না, তখন এই স্থায়ী সদস্য দেশ গুলির পাঁচটির মধ্যে চারটিই – রাশিয়া, চিন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও গ্রেট ব্রিটেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রীরা এই অধিবেশনে অংশ নিতে যান নি. মস্কো ও বেজিংয়ের এই প্রশ্নে এক অবস্থান ও প্যারিস, লন্ডন ও ওয়াশিংটনের অন্য দিক থেকে এই প্রশ্নে অবস্থান – অনেকটাই অমিল রয়েছে.

এই অধিবেশনের বৈঠকে একটি তীক্ষ্ণ বিতর্কে বিষয় বস্তু হয়েছিল সিরিয়ার ভিতরে এক “বাফার জোন” বা “করিডর” তৈরী করার প্রচেষ্টা. এই প্রস্তাব খুবই সক্রিয়ভাবে এগিয়ে দিতে চেয়েছিল তুরস্ক. রাষ্ট্রসঙ্ঘের উদ্বাস্তু সংক্রান্ত বিষয়ে হাই কমিশনার আন্তোনিও গুত্তিয়েরেস এই প্রস্তাবকে সমর্থন করেন নি. তাঁকে সমর্থন করেছেন রাষ্ট্রসঙ্ঘে রাশিয়ার পক্ষ থেকে স্থায়ী প্রতিনিধি ভিতালি চুরকিন. এই ধরনের বাফার জোন তৈরী করার প্রস্তাবের পিছনে রয়েছে সিরিয়ার আভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার নতুন প্রচেষ্টা, এই রকমই মনে করে রাজনীতিবিদ পাভেল স্ভিয়াতেনকভ বলেছেন:

“এটা হল সেই দেশের ভিতরেই একটা এলাকা তৈরী করে দেওয়ার চেষ্টা, যেখানে সিরিয়ার জাতীয় সেনা বাহিনীর কোন পৌঁছনোর পথ থাকবে না, আর যেখানে জঙ্গীরা, যারা সিরিয়ার সরকারের বিরুদ্ধে, তারা বিশ্রাম নিতে পারবে আর নতুন করে অস্ত্র পেতে পারবে. আর যেখান যেকে তারা সিরিয়ার সেনা বাহিনীকেও আক্রমণ করতে পারবে নিজেরা একটা প্রতিরক্ষা বলয়ের মধ্যে থেকে, ধরা যাক, যে বলয় তৈরী করে দেবে ন্যাটো জোটের বিমান বাহিনী. এটা স্বাভাবিক যে, এই ধরনের নিরাপত্তা এলাকা তৈরী করার যুক্তি সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই মেনে নেওয়া সম্ভব নয়, কারণ এটা হবে আসাদকে পদচ্যুত করার জন্য চেষ্টা ও বিরোধী পক্ষের জঙ্গীদের জন্য সবচেয়ে বেশী ভাল পরিস্থিতি তৈরী করে দেওয়ার ব্যবস্থা”.

তেহরানে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের শীর্ষ সম্মেলনে একই সঙ্গে কোনও সিরিয়া বিষয়ক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে নি. ইজিপ্টের রাষ্ট্রপতি মুহাম্মেদ মুর্সির উদ্যোগে সিরিয়া সংক্রান্ত আঞ্চলিক যোগাযোগের গোষ্ঠী তৈরীর প্রচেষ্টা, যাতে ইরান সহ সৌদি আরব ও তুরস্ককে এক জায়গায় আনার উদ্যোগও নষ্ট হয়েছে স্ক্যান্ডাল সহই. এর- রিয়াদ এমনকি তেহরানে নিজেদের প্রতিনিধি দলকে পাঠাতে চায় নি, আর মুহাম্মেদ মুর্সির তরফ থেকে বাশার আসাদকে সরাসরি পদত্যাগ করতে বলার আহ্বান ইরানকেও তাঁর থেকে সরে যেতে বাধ্য করেছে. তেহরান নিজেদের পক্ষ থেকে এক গোষ্ঠী তৈরীর প্রস্তাব করেছিল ইজিপ্ট, ইরান ও ...ভেনেজুয়েলা দেশকে নিয়ে. এই উদ্যোগের থেকে কোন বড় রকমের প্রভাব দেখতে পাওয়া সম্ভব নয়. ইরান কখনোই দামাস্কাসকে সমর্থন করা বন্ধ করবে না. আর সিরিয়ার বিরোধী পক্ষও যে কোন রকমের আলোচনাতে ইরানের অংশগ্রহণের বিষয়ে একেবারেই বিরূপ.

এই কথা সত্য যে, শেষ মুহূর্তে সিরিয়া ইরাকের পক্ষ থেকে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন সংস্থার “যোগাযোগ গোষ্ঠী” তৈরীর প্রস্তাব গ্রহণ করেছে. ইরাক নিজেদের উপরে মধ্যস্থতা করার প্রচেষ্টার ভার নেবে, যাতে এই বিরোধের প্রতিপক্ষদের মধ্যে শান্তিস্থাপন করা সম্ভব হয় ও তারা একত্রিত ভাবে যাতে দেশের মন্ত্রীসভা গঠন করতে পারে, যেখানে সরকারের প্রতিনিধিরা ও বিরোধী পক্ষের প্রতিনিধিরা প্রবেশ করতে পারবেন. এই একই কাজের জন্য রাশিয়ার উদ্যোগে জুন মাসে জেনেভাতে তৈরী হয়েছিল “কাজের গোষ্ঠী”. কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, গ্রেট ব্রিটেন ও তাদের পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের সহকর্মী রাজতন্ত্রের দেশ গুলি নিজেদের জন্য সিরিয়ার বিরোধী পক্ষকে এক তরফা সহায়তা করার কৌশল বেছে নিয়েছে, যাতে বাশার আসাদকে যত দ্রুত সম্ভব পদচ্যুত করা যায়.

বিশেষজ্ঞরা আরও বেশী করেই সিরিয়ার সঙ্কটকে আফগানিস্তানের গত শতকের ৮০র দশকের যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করছেন. সিরিয়া বিরোধীদের শিবিরে বহু ঐস্লামিক চরমপন্থী রয়েছে, যারা পশ্চিম ও পারস্য উপসাগরীয় দেশ গুলির কাছ থেকে খুবই বিশাল পরিমানে অর্থ ও অস্ত্র সাহায্য পাচ্ছে, ঠিক একই রকম ভাবে, যেমন মোজাহেররা আফগানিস্তানে তিন দশক আগে পেয়েছিল. এই সবই সিরিয়ার সঙ্কটকে এক নিষ্ঠুর যুদ্ধে পরিণত করেছে. স্ট্র্যাটেজিক মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ ইনস্টিটিউটের এক বিশেষজ্ঞ ও প্রাচ্য বিশারদ সের্গেই দেমিদেঙ্কো তাঁর পূর্বাভাসে খুবই হতাশা নিয়ে বলেছেন:

“উত্তেজনা খালি বেড়েই চলেছে. নিহতদের সংখ্যাও আরও খালি বেশীই হচ্ছে. দুই পক্ষই সেই ধরনের উপায় ব্যবহার করছে, যা ওদের কাছে বর্তমানে রয়েছে. অংশতঃ, বিরোধী পক্ষ চালিয়ে যাচ্ছে তথ্য যুদ্ধ, “আল- জাজিরা” ও “আল- আরাবিয়া” টেলিভিশন সংস্থাদের ব্যবহার করে. বাশার আসাদের পররাষ্ট্র বিষয়ক বিরোধীরা তাঁকে এত সহজে শান্তিতে থাকতে দেবে না. বিদেশ থেকে সিরিয়াতে অর্থ যাচ্ছে, যোদ্ধারা যাচ্ছে, অস্ত্র দেওয়া হচ্ছে. তাই অপেক্ষা করতে হবে নতুন করে রক্তপাতের, নতুন ও সম্ভবতঃ আরও বেশী করেই দামাস্কাস আক্রমণের চেষ্টার”.

এই প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক সমাজ বর্তমানে নতুন আশায় বুক বেঁধেছে রাষ্ট্রসঙ্ঘ ও আরব লীগের পক্ষ থেকে সিরিয়া সমস্যা সংক্রান্ত নতুন প্রতিনিধি লাখদার ব্রাহিমির মিশনের উপরে. তিনি এই প্রতিনিধিত্বের কার্যভার নিয়েছেন কোফি আন্নানের কাছ থেকে, যিনি সিরিয়ার সঙ্কট সমাধানে নিজের সাহায্য করার অক্ষমতা স্বীকার করে নিয়ে নিজেই পদত্যাগ করেছেন.

প্রসঙ্গতঃ, আমরা এখন উল্লেখ করব পরবর্তী পর্যায়কে. এখনই জানা রয়েছে যে, সিরিয়ার সমস্যা রাশিয়া ও চিনের দেশ নেতা ভ্লাদিমির পুতিন ও হু জিন টাও এর মধ্যে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা সংস্থার শীর্ষ সম্মেলনের নেপথ্যে আলাদা করে আলোচিত হতে চলেছে ভ্লাদিভস্তক শহরে আগামী সপ্তাহে. সেখানে রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রধান সের্গেই লাভরভ ও হিলারি ক্লিন্টনের মধ্যেও এই প্রসঙ্গেই আলাদা করে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে. আশা করা হচ্ছে যে, এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা সংস্থার শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীরাও সিরিয়া সমস্যা নিয়ে নিজেদের অবস্থান আলাদা একটি বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে প্রকাশ করবেন.