পেন্টাগনের পক্ষ থেকে প্রকাশিত বিশ্বের “এক নম্বর সন্ত্রাসবাদী” ওসামা বেন লাদেনের হত্যার যে ঘটনা পরম্পরা ছিল, তা সম্ভবতঃ তথ্যে গরমিল আছে বলে স্বীকৃত হতে চলেছে. বহু বিশেষজ্ঞই, এই ঘটনা পরম্পরার মধ্যে বহু গোঁজামিলের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে, মনে করেছেন যে, তা প্রথম থেকে শেষ অবধিই ভেবে বার করা. আমেরিকাতে প্রাক্ নির্বাচনী সময়ে এক বই প্রকাশিত হয়েছে, যেটি পেন্টাগনের প্রকাশিত পরম্পরাকে রক্ষার উদ্দেশ্যেই সব মিলিয়ে করা হয়েছে – কিছু নির্দিষ্ট ভাবে ঠিক নয় এমন বিষয় স্বীকার করে নিয়ে.

কোলাহল সৃষ্টিকারী এই বইয়ের লেখক – ২০১১ সালের মে মাসে পাকিস্তানের অ্যাবত্তাবাদে হামলার এক সরাসরি অংশীদার. “সহজ দিন নয়”, নামের এই বই প্রকাশিত হওয়ার কথা ছিল আমেরিকার বইয়ের দোকানে সন্ত্রাসবাদী হামলার বর্ষপূর্তি দিবসে ১১ই সেপ্টেম্বর. কিন্তু সংবাদ মাধ্যমের খুবই প্রবল প্রতিক্রিয়ায় বইটি ঠিক করা হয়েছে এক সপ্তাহ আগেই প্রকাশ করার.

বইয়ের প্রচ্ছদে লেখকের নাম জানানো হয়েছে মার্ক ওয়েন. কিন্তু টেলিভিশন চ্যানেল ফক্স নিউজ এই ব্যক্তির গোপন পরিচয় প্রকাশ্যে এনেছে: বলা হয়েছে যে, নৌবাহিনীর বিশেষ পদাতিক সেনা বাহিনী “সামুদ্রিক বাঘ” নামে যে বাহিনী রয়েছে, তারই ৩৬ বছর বয়সী এক প্রাক্তন সেনা ম্যাট বিসোন্নেট এই বইয়ের লেখক. আর অন্যান্য সংবাদ সংস্থা এই বীরের ফোটো উদ্ধার করে এনেছে. সুতরাং তার ফোটো ইতিমধ্যেই শহীদ শেখ ওসামার হত্যাকারী হিসাবে এখন “আল- কায়দার” সাইটে জায়গা মতো লাগানো হয়েছে. এটাও খুব একটা খারাপ বিজ্ঞাপন বা প্রচার নয়.

আসল ইতিহাস লেখক এই ভাবে বর্ণনা করেছেন. যখন “বাঘদের” দল বেন লাদেনের বসত বাড়ীর ভিতরে ঢুকে পড়েছিল ও সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠছিল, তখন একজন যোদ্ধা দেখেছিল, কি করে সন্ত্রাসবাদীদের নেতা এক অন্ধকার শোওয়ার ঘর থেকে উঁকি মেরেছিল. তার পরেই সে ভিতরে ঢুকে লুকিয়ে পড়েছিল, আর তার ঠিক পরেই ঘরে গুলির শব্দ শোনা গিয়েছিল. যখন যোদ্ধাদের দলের লোকরা সেই শোওয়ার ঘরে জোর করে ঢোকে, তখন বেন লাদেন শেষ নিশ্বাস ফেলছিল. তার দেহের উপরে মহিলারা আছড়ে পড়ে কাঁদছিল, শায়িত পুরুষের মাথা ছিল গুলির আঘাত লাগা অবস্থায়. সে নিজেই নিজেকে গুলি করেছে, নাকি অন্য কেউ তাকে গুলি করেছিল, তা লেখক জানেন না. কিন্তু তাও যে কোন কিছুই হতে পারে ভেবে “ওয়েন” – বিসোন্নেট ও আরও একজন বিশেষ বাহিনীর যোদ্ধা মৃত প্রায় ব্যক্তির দেহকে গুলি চালিয়ে ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল. তারপরে শোওয়ার ঘরে তল্লাসী করা হয়েছিল ও পাওয়া গিয়েছিল দুটি আগ্নেয়াস্ত্র – একটি কালাশনিকভ স্বয়ংক্রিয় মেশিনগান একে – ৪৭ ও মাকারভ পিস্তল, দুটিতেই গুলি ভরার ম্যাগাজিন ছিল খালি. মনে করিয়ে দিই যে, সরকারি ভাষ্যে, বেন লাদেন ছিল সশস্ত্র ও সে ধরা দিতে চায় নি. লেখক একই সঙ্গে পেন্টাগনের তরফ থেকে দেওয়া ঘোষণা অস্বীকার করেছেন, তা অনুযায়ী বলা হয়েছিল যে, পরাজিত শত্রুর প্রতি সসম্মানে আচরণ করা হয়েছিল. “ওয়েন” লিখেছেন যে, মৃতদেহ এর পরে যখন হেলিকপ্টারে চড়ানো হয়েছিল, তখন তার উপরে বসেছিল এই অপারেশনের এক অংশীদার. কিন্তু এটাই যে বেন লাদেন ছিল, সেই বিষয়ে লেখক কোনও সন্দেহ প্রকাশ করেন নি.

এখানে খেয়াল করা দরকার যে, বিশ্বের “এক নম্বর সন্ত্রাসবাদীকে” নিধনের ঘটনা – বারাক ওবামার প্রাক্ নির্বাচনী ভাণ্ডারের খুবই অল্প সঞ্চিত সম্পদের একটি. যদি অবশ্য না ধরা হয় লিবিয়ার নেতা মুহম্মর গাদ্দাফির উপরে বিজয়কে, যেটা সাধারন বোধের দৃষ্টিকোণ থেকে সঞ্চয় বলে মনে করা খুবই কষ্টকর. আর এটাও ঠিক যে, ওসামা বেন লাদেনের লুকিয়ে থাকার জায়গা দখল করার অপারেশন নীতি নিয়মের দিক থেকে খুবই অবাক হওয়ার মতো বিষয়, এই কথা উল্লেখ করে সামরিক রাজনীতিবিদদের জোটের বিশেষজ্ঞ ওলেগ গ্লাজুনভ বলেছেন:

“আরও এক বছর আগে, আমেরিকার বিশেষ বাহিনীর অপারেশনের পরে, ইরানের গুপ্তচর সংস্থা সংবাদের সততা স্বীকার না করে ঘোষণা করেছিল. তারা বলেছিল যে, ওসামা বেন লাদেন হয় অনেকদিন আগেই নিহত হয়েছে, অথবা মারা গিয়েছে – আর এই সবই হল স্রেফ মিথ্যা রটনা. ওবামার প্রয়োজন হল নির্বাচনে যাওয়া. সব মিলিয়ে দেখলে, এই রাষ্ট্রপতিত্বের সময়ে আমেরিকার সাফল্য খুব একটা কিছুই নেই – না অর্থনৈতিক দিকে, না অন্য কোনও ভাবে. তাই ওবামা নিজেকে সেই ভাবে জায়গা করে দিয়েছেন যে, তিনি এমন একজন নেতা যার সময়ে কুখ্যাত সন্ত্রাসবাদী বেন লাদেনকে মারা হয়েছে”.

মনে করিয়ে দেবো যে, এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে সরকারি মতামত, একেবারে শুরু থেকেই সমালোচনার মুখে পড়েছিল. তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর বিশেষ অপারেশন কম্যান্ডের প্রধান এই অপারেশনে অংশ নেওয়া লোকদের সাবধান করে দিয়েছিলেন যে, যে কেউ এই গোপন অপারেশনের তথ্য ফাঁস করে দেবে, তাকেই জেলে যেতে হবে. তা স্বত্ত্বেও এই বই বেরিয়েছে, আর লেখক, সব দেখে শুনে মনে হয়েছে, খুব একটা লুকিয়ে নেই. সংবাদ মাধ্যম খুবই সক্রিয়ভাবে এই বিশেষ বাহিনীর বীরের বই নিয়ে আলোচনা করছে, যে নাকি ওবামাকে লড়াইয়ে নামতে আহ্বান করার মতো সাহস দেখিয়েছে, ওসামা বেন লাদেনের হত্যার সত্যিকারের ছবি জনসমক্ষে প্রকাশ করে. আসলে বইটি আমেরিকার সরকার প্রকাশিত আল- কায়দা নেতা হত্যার ঘটনা পরম্পরাকেই রক্ষা করেছে. সেখানে এক প্রত্যক্ষদর্শীর নাম করে এই সরকারি ঘটনা পরম্পরার আলাদা করা কিছু অল্প অর্থবহ তথ্যের অমিলকেই স্বীকার করা হচ্ছে – আর এটাই বইকে বেশী করে বিশ্বাস যোগ্য করে দিয়েছে. এই প্রসঙ্গে বিসোন্নেট তার বইতে লিখেছে যে, সে রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা সম্বন্ধে সন্তুষ্ট নয়. অবশ্যই, এই রকমের লোককে, তিনি যখন ওবামার স্বপক্ষে সাক্ষী দেবেন, তার চেয়ে পাঠকরা, বিরোধী হলেই বেশী করে বিশ্বাস করবেন.