বহু মাস ধরেই নিয়মিত ভাবে বিদেশ থেকে আগ্রাসনের হুমকি স্বত্ত্বেও, প্রায় ১২০টি দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতিতে ঐস্লামিক প্রজাতন্ত্র ইরানে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন নামক বাস্তব ঘটনাটি এমনিতেই সংজ্ঞাবহ. দেখা গেল যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী বলে জানা দেশ গুলির নেতারা এমনকি রাষ্ট্রসঙ্ঘের মহাসচিব বান কী মুন ততটা আমেরিকার চাপের মুখে নতি স্বীকার করতে রাজী হননি, যত খানি ওয়াশিংটনে এই ধরনের আশা করা হয়েছিল.

বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশী দেশের নেতাদের তেহরানে আসার অর্থ হল যে, ইরানকে একঘরে করে দেওয়ার রাজনীতি, যা পশ্চিমের তরফ থেকে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, তাতে এক বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে.

ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম বিশেষ করে মনোযোগ দিয়েছে ইরানে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ডঃ মনমোহন সিংহের বিভিন্ন দিককে কেন্দ্র করেই. তাঁর সফর সত্যই বিষয় বস্তুর দিক থেকে একেবারে সম্পৃক্ত ছিল ও তার পরিণাম শুধু বহু দিন ধরেই ভারত এবং ইরানের সম্পর্কের ক্ষেত্রেই নয়, বরং বিশ্বের অন্যান্য এলাকার দেশ গুলির সঙ্গেও পরিলক্ষিত হবে, এই কথাই উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এখানে আগ্রহের বিষয় হল যে, পর্যবেক্ষকদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গীর উপরে নির্ভর করেই মনমোহন সিংহের সফরের অর্থ খুবই বেশী করে আলাদা হয়েছে বলে লক্ষ্য করতে পারা যাচ্ছে. যেমন, উদাহরণ হিসাবে “ওয়াল স্ট্রীট জার্নাল” তাঁর এই শীর্ষ সম্মেলনে বলা বাক্য: “বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসাবে, ভারত বিভিন্ন দেশের জনগনের গণতান্ত্রিক ও বহুমত ভিত্তিক শৃঙ্খলার প্রতি আগ্রহকেই সমর্থন করে থাকে”, এটাকে বলেছে ইরানের “অগণতান্ত্রিক” প্রশাসনের প্রতি লুকান সমালোচনা বলে. কিন্তু একই রকম ভাবে সেই “বহুমত ভিত্তিক” কথাটি পৃথিবী ব্যাপী বিশ্ব গঠনের প্রতিও উল্লেখ করা যেতে পারে. আর তখন এই বাক্য একেবারেই অন্য অর্থবহ হয়ে যায়: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমের রাষ্ট্র গুলির তরফ থেকে বিশ্বে এক নিজস্ব হেগেমনি তৈরীর ইচ্ছার সমালোচনা বলে”.

মনমোহন সিংহের ঘোষণার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল সেই বিষয়েও, যে, ভারতবর্ষ ইরানের সঙ্গে খনিজ তেল ও গ্যাসের ক্ষেত্রে সহযোগিতা বজায় রাখতে চায়, আর তাঁর পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আসিফ আলি জারদারির সঙ্গে সাক্ষাত্কারেও ইরান – পাকিস্তান- ভারত অবধি পাইপ লাইন বসানোর প্রকল্প নিয়ে খনিজ তেল ও গ্যাস ক্ষেত্রে উন্নতির কথা হয়েছে.

আরও একটি ব্যাপার রয়েছে, যার প্রতি পর্যবেক্ষকরা কম মনোযোগ দিয়েছেন, তাই বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এখানে কথা হচ্ছে যে, তেহরানের শীর্ষ সম্মেলন জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের জন্য একটা নতুন শক্তি দিয়েছে ও “তৃতীয় পথের” জন্য এখন একটা নতুন সম্ভাবনা খুলে দিয়েছে, যা হয়েছে বিশ্বের দুটি শীর্ষ স্থানীয় রাষ্ট্র, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চিনের মধ্যে বিশ্বজোড়া পারস্পরিক বিরোধের বাতাবরণেই. আর ১৯৯০ এর দশকের শুরুতে, যখন সোভিয়েত দেশ ও সমাজতান্ত্রিক শিবিরের পতন হয়েছিল, তখন অনেকেই পশ্চিমে বলেছিলেন, যে, জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন তার সমস্ত রকমের অর্থই হারিয়েছে. কিন্তু খুবই দ্রুত, বিশ্বে একটি মেরু হারিয়ে গেলে, তার জায়গায় চিনের রূপে অন্য এক মেরুর আবির্ভাব হয়েছে. আর আজ যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তেমনই চিন, খুবই সক্রিয়ভাবে তাদের রাজনৈতিক প্রভাবের কক্ষপথে যত বেশী সম্ভব দেশকে টেনে আনতে চাইছে, যাতে বিষয়কে এই ভাবে দেখানো যায় যে, কোন অন্য পথই আর নেই”.

দেখা গেল যে, তা রয়েছে. আর এই ধরনের পরিস্থিতিতে ভারতের একটা বাস্তব সুযোগ এসেছে বহু দেশের সাথে একসাথে, যাদের পক্ষে বিশ্বের যে কোন একটিও পারস্পরিক ভাবে বিরোধী মনোভাবাপন্ন শক্তির প্রভাব মানা সম্ভব নয়, তাদের নিজেদের পথে চলার, সেই “তৃতীয়” পথ, যা একেবারেই স্বাধীন ভাবে উন্নতির পথ এবং জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের সত্যিকারের নীতির সঙ্গেই সম্পূর্ণভাবে একমত হয়ে চলার.

মনে করা হয়েছে যে, তেহরানের শীর্ষ সম্মেলনের ঐতিহাসিক সংজ্ঞা – বর্তমানের সমস্যার সমস্ত রকমের গুরুত্ব দেওয়া স্বত্ত্বেও – রয়েছে, ঠিক সেই সম্ভাবনাকেই প্রকাশ করার জন্য, যা এই “তৃতীয় পথ”.