২৯শে আগষ্ট থেকে শ্রীলঙ্কায় পাঁচ দিনের সরকারি সফরে আসছেন চিনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী লিয়াং গুয়াঙ্গলিয়ে. এই সফরের আগে জানা গিয়েছে যে, চিন তৈরী রয়েছে শ্রীলঙ্কা দেশকে সেখানে উত্তর ও উত্তর পূর্ব এলাকায় সামরিক কেন্দ্র তৈরীর জন্য ১০ কোটি ডলার সমান অর্থমূল্যের সাহায্য দিতে. এই সব এলাকাই পঁচিশ বছরের বেশী সময় ধরে গৃহযুদ্ধের ফলে নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিল.

এই দ্বীপ রাষ্ট্রের উপরে গণ প্রজাতন্ত্রী চিনের মনোযোগ ভারতে লক্ষ্য না করে থাকা হয় নি. কারণ ভারত – চিন – শ্রীলঙ্কা এই তিন দেশের ত্রিভুজ সম্পর্ক বিগত সময়ে ভারতের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই এক তীক্ষ্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে.

এই সপ্তাহের শুরুতে একই সঙ্গে দুটি নেতৃস্থানীয় তামিল দল – তা যেমন কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন জোটের ভিতরে থাকা দ্রাভিড় মুন্নেত্রা কাঝগম, তেমনই বিরোধী অথচ তামিলনাডু রাজ্যে বর্তমানে শাসক দল অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাভিড় মুন্নেত্রা কাঝগম দল খুবই তীক্ষ্ণ সমালোচনা করেছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে. তারা ঘোষণা করেছে যে, নিজেদের এলাকায় সামরিক ঘাঁটিতে ও সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গুলিতে লঙ্কার সামরিক বাহিনীর লোকদের প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা থেকে বিরত হবে না.

“শ্রীলঙ্কা – আমাদের মিত্র দেশ, আর প্রস্তুতি চলছে”, - ঘোষণা করেছেন ভারতের প্রতিরক্ষা বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী পাল্লাম রাজু.

তামিল রাজনীতিবিদদের আরও বেশী করে ক্ষোভের কারণ হয়েছে এই “মিত্র দেশ” বলে উল্লেখ করায়. তাঁরা মনে করেন যে, শ্রীলঙ্কার সরকার তামিল সংখ্যালঘু দের অধিকার গণ হারে খণ্ডন করছে ও এর জন্য উত্তর দিতে বাধ্য.

এই ধরনের পরিস্থিতির কয়েকটি দিক রয়েছে. প্রথম – ভারতের আভ্যন্তরীণ. দুই তামিল দলই নিজেদের রাজ্যে খুবই প্রভাবশালী, আর একই সঙ্গে ভারতের অন্যান্য রাজ্যে থাকা তামিলদের মধ্যেও. তাই আপাততঃ ঠিক হয়ে থাকা ২০১৪ সালের সর্ব ভারতীয় লোকসভা নির্বাচনের ফলে ক্ষমতায় আসার জন্য জোট গড়তে তাদের সমর্থন খুবই সংজ্ঞাবহ হয়ে দাঁড়াবে. আর তামিল রাজনীতিবিদদের বিরক্ত করা – কেন্দ্রের স্বার্থের পক্ষে উপযুক্ত বিষয় নয়.

কিন্তু আবার অন্য দিকও রয়েছে, আর সেই গুলি, মনে হয়, বেশীই গুরুত্বপূর্ণ, এই রকম মনে করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“বিষয়ের মূল কথা হল যে, শ্রীলঙ্কা, ভারতের বাস্তবিক ভাবে সমস্ত প্রতিবেশী দেশের মতই, বর্তমানে এক মঞ্চে পরিণত হয়ে গিয়েছে, যেখানে খুবই তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক লড়াই চলছে ভারত ও চিনের মধ্যে প্রভাব বিস্তার নিয়ে. চিন ভারত মহাসাগরীয় এলাকায় নিজেদের “মুক্তামালা” স্ট্র্যাটেজি কার্যকরী করতে চাইছে, যার অর্থ হল ভারতকে সমস্ত সামুদ্রিক দিক থেকেই এক গুচ্ছ বন্দরের শৃঙ্খল দিয়ে ঘিরে ফেলা, যেখানে লক্ষ্য রাখার স্টেশন থাকবে, আর ভবিষ্যতে – এমনকি সামরিক সামুদ্রিক ঘাঁটি অবধি. প্রসঙ্গতঃ, এই কয়েক দিনের মধ্যেই জানা গিয়েছে যে, চিন পাকিস্তানের স্ট্র্যাটেজিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর গাদার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নিয়েছে, যা মনে করা হয়েছে এই “মুক্তামালা” নামের বন্দর শৃঙ্খলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ”.

শ্রীলঙ্কায় উত্তর ও উত্তর পূর্বের এই সব নির্মীয়মান বন্দর ছাড়াও, চিনের সহায়তায় দেশের দক্ষিণে খামবানতোতা এলাকায় তৈরী হচ্ছে এক গভীর সমুদ্রের বন্দর. তা তৈরী হলে শুধু ভবিষ্যতে চিনের সামরিক ও অসামরিক সমুদ্র পোতের পক্ষে এখানে জ্বালানী ভরাই সম্ভব হবে না, বরং তা হবে সমগ্র ভারত মহাসাগর এলাকা ও ভারতের দক্ষিণের এলাকার উপরে নজরদারি করার ব্যবস্থার জন্য এক অতি উত্তম ও গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ.

এখানে উল্লেখ করার মতো হল যে, শ্রীলঙ্কার সামরিক কেন্দ্র গুলি যে চিনের দখলে গিয়েছে, তার পরোক্ষ কারণ হয়েছে ভারতের ভিতরেই রাজনৈতিক লড়াই. ভারতের প্রখ্যাত কূটনীতিবিদ ও পররাষ্ট্র নীতিতে বিশেষজ্ঞ এম. কে. ভদ্রকুমার যেমন নিজের মন্তব্য দিতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে, “এআইডিএমকে ও ডিএমকে দলই জাফনায় চিনের উপস্থিতির জন্য পরোক্ষ ভাবে দায়ী. যদি তারা আগে দিল্লীকে ব্ল্যাকমেল না করত, তবে কলম্বো চাইত জাফনার মতো সামরিক কেন্দ্র ও অন্যান্য ক্ষেত্রে ভারতীয় সহায়তাই নিতে”.

সুতরাং, দেখাই যাচ্ছে যে, আজ ভারতীয় রাজনীতিবিদদের, তা তারা যেখানেই থাকুন না কেন, সেটা কেন্দ্রে বা তামিলনাডু রাজ্যেই হোক, খুবই দায়িত্বশীল ভাবে “পক্ষে” ও “বিপক্ষে” হিসাব করে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে সম্পর্ক সম্বন্ধে অবস্থান নিতে হবে এবং খুবই স্পষ্ট ভাবে প্রাথমিক কর্মসূচী স্থির করতে হবে: কোনটা বেশী গুরুত্বপূর্ণ – জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন অথবা স্থানীয় জাতীয়তাবাদ?