ইজিপ্ট পররাষ্ট্র নীতিতে প্রাথমিক বিষয় গুলিকে সংশোধন করছে. রাষ্ট্রপতি মুহাম্মেদ মুর্সি তাঁর প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর করতে চলেছেন এক ঐস্লামিক রাষ্ট্র নয় এমন দেশে – চিনে (২৮ – ৩০ আগষ্ট). এটা হতে চলেছে পূর্ববর্তী ইজিপ্টের নেতৃত্বের ঐতিহ্যের বদলে, যা অনেকটাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ও পশ্চিমের দেশ গুলির সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধির দিকেই অনেকখানি লক্ষ্য করে থাকত.

মুহাম্মেদ মুর্সির সফরকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া হয়েছে. এই ভাবেই বেজিং ও কায়রো প্রথমেই ইজিপ্টে “২৫শে জানুয়ারীর” বিপ্লবের পরে দুই দেশের সম্পর্কের চরিত্রের স্ট্র্যাটেজিক দিকটি নিয়ে বিশেষ করে উল্লেখ করেছে. আর দুই পক্ষেরই এর জন্য নিজেদের কারণ রয়েছে.

“আরব বসন্ত” খুবই শক্তিশালী ভাবে চিনের অবস্থান টিউনিশিয়া, লিবিয়া ও ইয়েমেনে টলিয়ে দিয়েছে. প্রশ্নের সামনে রয়েছে – এই সব দেশে পরবর্তী কালে বিনিয়োগের ভবিষ্যত, বহু চিনের কোম্পানীর বাণিজ্যিক স্বার্থের ক্ষতি সাধিত হয়েছে. এই পরিস্থিতিতে ইজিপ্ট থেকে যাচ্ছে আরব বসন্তের এলাকায় সেই বিন্দু, যেখান থেকে চিন চেষ্টা করছে এই এলাকায় নিজেদের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশী করে মজবুত করতে. প্রথমতঃ, এই দেশের অর্থনীতিতে নতুন করে বিনিয়োগ দিয়ে. এই সফরের শেষে যে সমস্ত দলিল স্বাক্ষরিত হতে চলেছে, তার মূল্য তিনশ থেকে পাঁচশো কোটি ডলার অর্থমূল্যের সমান. এটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইজিপ্টকে আশ্বাস দেওয়া সামরিক সহায়তার থেকে অনেকটাই বেশী, উল্লেখ করে নিকটপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর ইভগেনি সাতানোভস্কি বলেছেন:

“চিনের বিনিয়োগ – এটা খুবই বাস্তব বিষয়. চিন আফ্রিকার উন্নয়নে প্রভূত পরিমানে অর্থ বিনিয়োগ করেছে. কেনই বা তারা ইজিপ্টেও এই কাজ করবে না. তার ওপরে এই দেশ বর্তমানে এত বেশী রকমের আর্থিক সঙ্কটের মধ্যে রয়েছে যে, তারা বাধ্য হয়েছে দ্রুত বাইরের দেশ থেকে সাহায্যের খোঁজ করতে. এই সুযোগ চিন তো মনে হয় না যে, ছেড়ে দেবে”.

বিশেষজ্ঞরা এই সম্ভাবনাও বাদ দেন নি যে, উচ্চ পর্যায়ে আলোচনার সময়ে চিন হয়তো নিজেদের সামরিক প্রযুক্তি ক্ষেত্রেও সহযোগিতার ইচ্ছা প্রকাশ করতে পারে. তারই মধ্যে এটা আবার সম্পূর্ণ ভাবেই আমেরিকার কুক্ষিগত এলাকা. রাষ্ট্রপতি মুহাম্মেদ মুর্সি মনে তো হয় না যে, এই প্রশ্নে চিনের দিকে যাবেন, কারণ তাঁর বর্তমানে নিজের দেশের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে বিরোধে যাওয়ার কোন প্রয়োজন নেই, যারা আমেরিকার সামরিক সহায়তার সঙ্গে খুবই ঘনিষ্ঠ ভাবে জড়িত.

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র খুবই আহত হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন এলাকায় নিজেদের যে কোন সহকর্মী দেশের চিনের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য কোন রকমের সহযোগিতার প্রশ্নে প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে থাকে. এটা সমান ভাবেই ইজিপ্টের রাষ্ট্রপতির চিন সফরের ক্ষেত্রেও ঘটেছে. কারণ নতুন বিনিয়োগ ও পরিকাঠামোতে ঋণের অর্থ হল ইজিপ্টে বেশী করে চিনের কোম্পানী গুলির উপস্থিতি বৃদ্ধি. ওয়াশিংটন ভয় না পেয়ে পারে না যে, ইজিপ্ট এর পরে আফ্রিকাতে চিনের উপস্থিতি বাড়ার জন্য নতুন ভিত্তি মূলক ঘাঁটি হয়ে যাবে. আর এটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন মাথাব্যথার কারণ, তাদের চিনকে আটকে রাখার স্ট্র্যাটেজিক পরিকল্পনার উপরে আঘাত, তার মধ্যে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও.

বেজিংয়ের পরে ইজিপ্টের রাষ্ট্রপতি ইরান যাবেন. পক্ষদ্বয়ের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই. তা ছিন্ন হয়েছিল সেই ১৯৭৯ সালে, যখন ইজিপ্ট ইরানে ঐস্লামিক বিপ্লবের পরে ক্ষমতাচ্যুত শেষ ইরানের শাহ মুহাম্মেদ রেজা পেহেলভিকে নিজেদের দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়েছিল. বেজিং থেকে তেহরান যাওয়া অনেক খানি প্রতীকী বিষয়, এই রকম মনে করে ইভগেনি সাতানোভস্কি বলেছেন:

“যথেষ্ট আগ্রহ সৃষ্টিকারী এক আকার সৃষ্টি হচ্ছে. তার ওপরে চিনের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের মতোই ইজিপ্টের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কও উন্নত হচ্ছে দ্রুত গতিতেই. চিনের বহু দিন আগে থেকেই, আর ইজিপ্টের – কিছুদিন আগে থেকে, কিন্তু তা যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী ভাবে. সম্ভবতঃ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব মূলক ভূমিকা ছাড়া নতুন বিশ্ব নিয়ম সৃষ্টি করার চেষ্টা সফল হতে চলেছে. তাতে নিজেদের জায়গা চিনের, ইরানের, ইজিপ্টের ও অন্যান্য দেশেরও থাকবে, যারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাধান্যের চেষ্টাকে আরও বেশী করেই সন্দেহের চোখে দেখে থাকে. আর নতুন করে তৈরী হতে যাওয়া ইজিপ্ট ও চিনের যোগাযোগ এই ক্ষেত্রে এক বিশেষ ভূমিকাই পালন করবে”.

আরব বিশ্বের দেশ গুলি “বিপ্লবের” ফলে বিশ্ব মঞ্চে নিজেদের নতুন করে উপস্থাপনা করতে চলেছে. ইজিপ্টের রাষ্ট্রপতির চিন ও ইরান সফর এই লক্ষণেরই প্রতিবিম্ব হয়েছে.