মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চেষ্টা করছে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র নীতিতে সেই দেশের প্রজাতিগত বিরোধকে কাজে লাগিয়ে প্রভাব বিস্তার করতে আর এই কারণে বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মদত দিচ্ছে. গত রবিবারে পাকিস্তানের দক্ষিণ পশ্চিমে এই রাজ্যে বেলুচিস্তান রিপাব্লিকান পার্টির ডাকে এক রাজ্য জোড়া হরতাল হয়েছে ও তা করা হয়েছে বেলুচিস্তানের ছয় বছর আগে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে মৃত আকবর বুগতি নামের এক স্থানীয় নেতার স্মৃতির উদ্দেশ্যে.

বেলুচিস্তান দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য এক সিরিয়াস ধরনের মাথাব্যথার কারণ যেমন ছিল, তেমনই রয়ে গিয়েছে. সেই ১৯৪৭ সালেই কিছু বেলুচিস্তানের নেতা পাকিস্তানকে নিজেদের দেশ বলে মানতে চান নি ও তাঁরা স্বাধীন বেলুচিস্তান সৃষ্টির আহ্বান করেছিলেন – যার মধ্যে তাঁরা যেমন পাকিস্তানের বেলুচিস্তান, তেমনই ইরান ও আফগানিস্তানের ভিতরে থাকা বেলুচ প্রজাতি অধ্যুষিত এলাকা গুলিকেও দেখতে চেয়েছিলেন. পরবর্তী প্রায় ষাট বছর ছয় মাস ধরেই এই স্বাধীনতা আন্দোলন চলেছে, তা কখনও স্তিমিত হয়েছে, কখনও নতুন বহ্নি শিখা নিয়ে জ্বলে উঠেছে, আর প্রায়ই খোলাখুলি ভাবে সন্ত্রাসবাদী আকার নিয়েছিল.

এই সমস্যার মূল হল যে, বেলুচিস্তান – পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় এলাকা জুড়ে প্রদেশ, যেখানে অনুসন্ধান করে পাওয়া ও ধারণা করা প্রচুর প্রয়োজনীয় খনিজ সম্পদ রয়েছে. কিন্তু বহু ঐতিহাসিক ভাবে চলে আসা কারণের জন্যই এই রাজ্য আজও রয়েছে অর্থনৈতিক দিক থেকে একটি সবচেয়ে কম উন্নত রাজ্য হয়ে. এই প্রসঙ্গ উত্থাপন করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“বিগত সময়ে বেলুচিস্তান প্রদেশে পরিস্থিতি নতুন করে জটিল হয়েছে. দেশের কেন্দ্রীয় সরকার এই প্রদেশের বিষয়ে এক বিশাল পরিকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে: এটা প্রাথমিক ভাবে গাদার বন্দর ও এক গুচ্ছ রাস্তাঘাট ও পাইপ লাইন বসানোর প্রকল্প, যা চিনের দক্ষিণ পশ্চিমের এলাকার সঙ্গে বেলুচিস্তানকে জুড়ে দেবে. গাদার বন্দর তৈরী হওয়ার বিষয়ে চিনের আগ্রহ প্রচুর, যারা এই বন্দর নির্মাণের কাজে প্রযুক্তি ও অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করে চলেছে. এটা পাকিস্তান ও চিনের স্ট্র্যাটেজিক সহযোগিতা পরিকল্পনার অংশ ও তা কখনোই ওয়াশিংটনের ভাল লাগে নি. আর এই বিষয়ে সাফল্যকে প্রতিরোধ করতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে পাকিস্তানের প্রতি তাদের রাজনীতির ক্ষেত্রে “বেলুচিস্তানের তাস” ফেলে দেখতে শুরু করেছে”.

বিশেষ করে এই বিষয়ে সফল হয়েছে মার্কিন কংগ্রেসের সদস্য ডানা রোহরাবাখের, তিনি আবার নিজের পাকিস্তান বিরোধী ঘোষণার জন্যই পরিচিত. গত বছরের শেষে তিনি এক প্রবন্ধ প্রকাশ করেন, যেখানে সরাসরি ভাবেই বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা স্বীকার করে নেওয়ার কথা বলেছেন. এই বছরের ফেব্রুয়ারী মাসে তাঁর উদ্যোগেই মার্কিন সেনেটে প্রতিনিধি পরিষদের আন্তর্জাতিক বিষয় সংক্রান্ত সভায় বেলুচিস্তানের প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা হয়েছিল. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরও এই প্রসঙ্গে নিজেরাও যোগ দিয়েছে. এই বছরের জানুয়ারী মাসে পররাষ্ট্র দপ্তরের সরকারি মুখপাত্র ভিক্টোরিয়া ন্যুল্যান্ড এক ঘোষণা সমেত বিবৃতি দিয়েছিলেন, যেখানে খুবই কড়া সমালোচনা করা হয়েছিল মানবাধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে পাকিস্তান সরকারের বেলুচিস্তানে কাজকর্মের, এই কথাই উল্লেখ করে বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এখানে প্যারাডক্স হল যে, এই ধরনের ঘোষণা দিয়ে বক্তব্য প্রকাশ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাস্তবে সেই সমস্ত শক্তির প্রতিরক্ষা করতেই আগ্রহী হয়েছে, যাদের তারাই কিছুদিন আগে পর্যন্ত কোন কারণ ছাড়া সন্ত্রাসবাদী বলে আখ্যা দিয়েছিল. “বেলুচিস্তানের তাস” ফেলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চেষ্টা করছে শুধু এই এলাকাতে চিনের প্রভাবই কমানোর নয়, বরং মার্কিন প্রশাসনের সামনে থাকা এখন দুটি খুবই জরুরী সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা হয়েছে: ইরানের সঙ্গে কি করা দরকার, আর আফগানিস্তান থেকে ন্যাটো জোটের সেনা প্রত্যাহার করার পরে কি হতে চলেছে, তাদের পক্ষে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হল এই এলাকায় নিজেদের প্রভাব বিস্তারের জন্য এই সব “ব্যথার উত্সর” কাছে নিজেদের সরাসরি উপস্থিতি বজায় রাখা”.

মনে তো হয় না যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র নীতিতে প্রাথমিক কাজের মধ্যে পাকিস্তানকে খন্ডিত করা ও বেলুচিস্তানের মতো বাফার রাষ্ট্রের সৃষ্টি করা রয়েছে, কিন্তু এই ধরনের ঘটনা পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে ব্যবহার করে ওয়াশিংটন একই সঙ্গে পাকিস্তান, ইরান ও আফগানিস্তানের মতো তিনটি দেশের উপরে চাপ সৃষ্টি করার মতো একটা লম্বা হাতল পেয়েছে.