প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়ে ভারত সরকারের রাজনীতি প্রাথমিক ভাবে বৃহত্ ব্যবসায়ের স্বার্থের কথা মাথায় রেখেই তৈরী হয়. জুলাই মাসে দেশের যেখানে বাঘ বাস করে সেই জাতীয় সংরক্ষিত অরণ্য গুলিতে ট্যুরিস্টদের যাতায়াত বন্ধ করা নিয়ে নিষেধাজ্ঞা, দেশে বিরাট বিতর্কের উদ্রেক করেছে. তাই ২২শে আগষ্ট দেশের সুপ্রীম কোর্ট স্থির করেছে এই প্রশ্ন নিয়ে আবার বিচার করে দেখার.

ভারত সরকারের সিদ্ধান্তের যারা বিরোধী তাদের সংখ্যা কম নয় ও তাদের মধ্যে প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থাও রয়েছে. কিছু বিখ্যাত পরিবেশ সংরক্ষক এর মধ্যেই ঘোষণা করেছেন যে, জাতীয় সংরক্ষিত অরণ্য ও উদ্যান গুলিতে যত বেশী পর্যটক হবে, তত বেশী করেই বাঘের ভাল হবে. তাদের কথার প্রমাণ হিসাবে বলা হচ্ছে: ট্যুরিস্টরা থাকলে এই সব জায়গায় চোরা শিকারিদের উত্পাত কম হয়, য়ারা ভারতের বাঘের সংখ্যা কমার জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ.

আজ ভারতে বিশ্বের সমস্ত বাঘের প্রায় অর্ধেক বাস করে, - শেষ করা মূল্যায়ন অনুযায়ী এটা ১৭০০ টি বাঘের সামান্য বেশী. ১০০ বছর আগে ভারতে বাঘের সংখ্যার হিসাব ছিল ৪৫ হাজার. চোরা শিকার বাঘের সংখ্যা কম হওয়ার একটি প্রধান কারণ হলেও অন্যতম নয়. অনেক বেশী বরং গুরুত্বপূর্ণ হল যে, দেশে খুবই দ্রুত শিল্প ও কৃষির প্রসার হওয়াতে বহুল পরিমানে বন কেটে ফেলা হচ্ছে, আর তার ফলেই, খুবই দ্রুত কমে আসছে, বাঘের স্বাভাবিক থাকার জায়গা, আর তার সঙ্গে অন্যান্য জন্তু জানোয়ারদের থাকার জায়গাও, এই কথাই উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“জাতীয় উদ্যান ও সংরক্ষিত অরণ্য বাঘের স্বাভাবিক থাকার জায়গা সংরক্ষণের জন্যই করা. যেমন, আফ্রিকাতে এই বিষয়ে খুবই বেশী রকমের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় সম্ভব হয়েছে যে, কি করে বন্য প্রকৃতি মানুষের সঙ্গে সাফল্যের সঙ্গেই টিকে থাকতে পারে. কিন্তু বাস্তবে দেখা গিয়েছে যে, খুবই নিয়মিত ভাবে জাতীয় অরণ্য গুলি স্থানীয় প্রশাসনের জন্য প্রকৃতির ভারসাম্য সংরক্ষণের জায়গা না হয়ে লাভ আদায়ের জায়গা হয়েছে. তার ওপরে দুর্নীতি বাড়ার সঙ্গেই, স্থানীয় প্রশাসন আর তাদের কোন কু কাণ্ড করতে বাকী রাখছে না, আর যা করছে, তা সরাসরি ভাবেই সংরক্ষিত জায়গা গুলির জন্য যে নীতি নির্ধারিত রয়েছে, তার বিরোধী. প্রশাসনের সামনে দিয়েই বেআইনি ভাবে বন কাটা হচ্ছে, আর চোরা শিকারিরা নিজেদের আইনের উর্দ্ধে ভাবতে পারছে”.

এই বছরের সেই এপ্রিল মাসেই সুপ্রীম কোর্ট ভারতের তেরটি রাজ্যের কাছ থেকে সেখানের ৪০টি সংরক্ষিত উদ্যান ও অরণ্য নিয়ে তাদের ধারণা ও ট্যুরিস্ট যাতায়াত নিয়ে মত চেয়ে পাঠিয়েছিল. আর তারই সঙ্গে উল্লেখ করতে বলেছিল সেই বাফার জোন নির্দিষ্ট করতে, যেখানে ট্যুরিস্টরা যেতে পারবেন, আর সেই এলাকা প্রধান এলাকা থেকে আলাদা করে দিতে বলেছিল, যাতে প্রধান এলাকায় শুধু বিশেষজ্ঞরাই যেতে পারেন. কিন্তু তিনটি রাজ্যই শুধু নিজেদের ধারণার কথা লিখিত দিয়েছিল. ফল হয়েছিল যে, সাময়িক ভাবে দেশের চল্লিশটিরও বেশী সংরক্ষিত অরণ্য ও উদ্যানে পর্যটক যাওয়া সুপ্রীম কোর্ট নিষেধ করেছিল.

বোধহয় নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া নিয়ে এই পুরো ব্যাপারটাই, যা আজ ভারত ও পশ্চিমের সংবাদ মাধ্যমে খবর হয়ে উঠে এসেছে, তা আসলে বাঘের স্বার্থ দেখার জন্যে করা হয় নি, বরং করা হয়েছে বৃহত্ পর্যটন ব্যবসায়ের স্বার্থেই, যারা এই নিষেধাজ্ঞার ফলে মূল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে. সত্যি করে বলতে হলে পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য লড়াই অনেকদিনই হল বড় ব্যবসার অংশই হয়ে গিয়েছে.

বাঘের সমস্যা – এটা শুধু অনেক বড় এক গুচ্ছ সমস্যার অংশ, যা আজ ভারতের সামনে উপস্থিত: দেশে দুর্নীতি, কাজ কর্মের বিষয়ে সরকারের বিভিন্ন স্তরে যোগাযোগের অভাব, বিশাল সব প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ও নির্দিষ্ট এলাকার স্থানীয় মানুষের প্রত্যহের প্রয়োজনের মধ্যে অমিল ইত্যাদি.

এই বিষয়ে মন্তব্য করে একজন ব্লগ লেখক যেমন লিখেছেন: “যদি দেশের কাছে মঙ্গল গ্রহে কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠানোর মত অর্থ থাকে, তবে ব্যাঘ্র সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ যোগাড় করা সম্ভব নয় কেন”?