কয়েকদিন আগে কাজাখস্থানের এক বৃহত্তম শহর আলমা- আতায় (প্রাক্তন রাজধানী) এক বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের আলোচনার আয়োজন করেছিল বুদ্ধিজীবীদের ক্লাব “আলাতাউ”, তারা আলোচনার ফলাফল নিয়ে এক রিপোর্ট “মধ্য এশিয়া – ২০২০: ভিতরের থেকে দেখা” নামে প্রকাশ করেছেন, সেখানে বলা হয়েছে মধ্য এশিয়াতে ঐস্লামিক রাষ্ট্র খলিফার শাসনতন্ত্র দিয়ে প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা. এই প্রসঙ্গে রিপোর্টের লেখকরা সকলেই একমত যে, “ঐস্লামিক খলিফা শাসনের” সম্ভাবনা বাড়তেই থাকবে, যার জন্য “গণ অভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে এই এলাকার দেশ গুলিতে ঐস্লামিক দল গুলির নেতৃত্ব ক্ষমতায় আসা দিয়ে পরিবর্তনের শুরু হবে”.

এই ধরনের পরিবর্তনের ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা কতটা বেশী? এই ধরনের প্রশ্ন নিয়ে আমরা প্রাচ্য বিশারদ স্তানিস্লাভ তারাসভের দ্বারস্থ হয়েছিলাম. তিনি এই প্রসঙ্গে বলেছেন:

“বিগত সময়ে “ঐস্লামিক খলিফা শাসনতন্ত্র” কথাটা রাজনীতিবিদদের মধ্য খুবই যুগোপযোগী হয়েছে, যদিও এই কথার অর্থ নানা রকমের করা হয়ে থাকে. যেমন, কিছু দিন আগেই ওসামা বেন লাদেনের নাতি তাঁর এক আত্মীয়কে লেখা চিঠিতে লিখেছে, আবার তা আমেরিকার সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিতও হয়েছে, যেখানে সে সারা বিশ্ব জুড়ে “নতুন খলিফা শাসনতন্ত্র” আন্দোলন সৃষ্টির কথা বলেছে, সেটা শুধু কোন একটা রাষ্ট্র সৃষ্টির কথাই নয়. এই প্রসঙ্গে সে এই “আন্দোলনে যোগ দিতে শুধু মুসলমানদের আহ্বান করে নি, এমনকি অবিশ্বাস দেরও করেছে”. বহু বিশেষজ্ঞের মতে এই আন্দোলন বিষয়ের ধারণার ভিত্তি “চরমপন্থী সুন্নী মুসলমানদের সঙ্গে ওয়াহাবি ধারণার যোগেই হয়েছে, যা সৃষ্টি করেছে সালাফিত মতবাদের – এক নানা ধর্ম মতের মাঝে থাকা মতবাদ – যা তৈরী করা হয়েছে “পরিস্কার ইসলাম” ধর্মের একক তৈরীর জন্য””.

প্রাচ্য বিশারদরা হঠাত্ করেই এই ধরনের সূক্ষ্ম বিষয়ের দিকে মনোযোগ দেন নি, যা নতুন খলিফা তন্ত্র কথাটির সঙ্গে জড়িত, কারণ এর উপরেই নির্ভর করছে শুধু এই আন্দোলনের রাজনৈতিক মূল্যায়নই নয়, বরং তার ভবিষ্যত সম্ভাবনা ও পরবর্তী কালে এর গ্রহণ যোগ্যতা. তার উপরে বহু পশ্চিমের বিশেষজ্ঞ নতুন খলিফা তন্ত্রের উদ্ভবের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন প্রাথমিক ভাবে মধ্য এশিয়াকে নয়, বরং “আরব্য বসন্তের” ফলে বৃহত্ নিকট প্রাচ্য এলাকায় যা হয়েছে, তাকে. তাঁরা মনে করেন যে, বিশ্বের এই অঞ্চলে নতুন শক্তি কেন্দ্র তৈরী হচ্ছে – যা একই সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, রাশিয়া ও চিনের মতই শক্তিশালী হতে চলেছে.

যদি মধ্য এশিয়াতে ফিরে দেখা হয়, তবে বহু বিশ্লেষকই মনে করেন যে, সেই সমস্ত এলাকায় ঐস্লামিক চরম পন্থী দল, যেমন হিজব উত্- তহরির দলকে অর্থ সাহায্য দেওয়া হচ্ছে সেই সৌদি আরব থেকেই, যা এই এলাকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সহকারী দেশ হতে তাদের অসুবিধা সৃষ্টি করছে না. কিন্তু, এখানে যেটা খেয়াল করার মতো, তা হল এই এলাকায় একই সঙ্গে আমেরিকা বিরোধী চিত্র পটও খুলে ধরা হচ্ছে.

ইরানের রাজনীতিবিদ আজ্জামা তামিমি মনে করেন যে, টিউনিশিয়া ও ইজিপ্টের পরে “স্বৈর তান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে জর্ডনে, ইয়েমেনে, আলজিরিয়াতে, সৌদি আরবেও”. ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী আলি আকবর সালেখি তাঁর দেশের মজলিসে (পার্লামেন্টে) বক্তৃতা দিতে গিয়ে সাবধান করে দিয়েছেন যে, “এখন থেকে তেহরানের একটি সবচেয়ে প্রাথমিক কাজ হবে এশিয়ার দেশ গুলির সঙ্গে যোগাযোগ মজবুত করা ও বিশ্ব সমাজের মঞ্চে এশিয়ার দেশ গুলির এক শক্তিশালী জোটকে উপস্থিত করা”. কারণ, বিশেষজ্ঞরা যেমন মনে করেছেন যে, এই ধরনের সামাজিক পরিবর্তনের ফলে সম্ভাবনা রয়েছে সেই রকমের ঘটনা পরম্পরা হওয়ার, যাতে “কয়েক টন বিস্ফোরক ফেটে যাওয়ার মতোই চরম পন্থী ঐস্লামিক দল গুলি তাদের রাজনৈতিক পরিকাঠামো সহ নিজেদের মধ্যেই লড়াই করতে শুরু করবে ও পশ্চিমের উপর থেকে নিজেদের চাপ কমিয়ে ফেলবে”.

এটা হবে প্রথম অধ্যায়ে. দ্বিতীয় অধ্যায়ে – বিভিন্ন রকমের চরমপন্থী ঐস্লামিক সংগঠন গুলি নিজেদের মধ্যেই সংঘর্ষে লিপ্ত হবে, ইসলাম ধর্ম নিন্দিত হবে ও তাকে ভিতর থেকেই ধ্বংস করা হবে. প্রসঙ্গতঃ, এই বিষয়ে সাবধান করে দিয়েছেন তুরস্কের রাষ্ট্রপতি আবদুল্লা গ্যুল তাঁর কিছুদিন আগের মক্কা শহরে ঐস্লামিক দেশ গুলির সম্মেলনে দেওয়া বক্তৃতায়.

আপাততঃ, তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে বলা যে, কতটা দ্রুত ও কি ধরনে এই প্রক্রিয়া চলতে পারে. একটাই যে বিষয়ে আলমা- আতায় প্রকাশিত রিপোর্টের লেখকদের সঙ্গে একমত হওয়া সম্ভব, সেটা হল রাজনৈতিক ভাবে মধ্য এশিয়াতে এখন ইসলাম তার প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, ধীরে হলেও তারা নিজেদের ধর্ম নিরপেক্ষ সমাজের বদলে সামাজিক বিষয়ে উন্নতির ক্ষেত্রে পথের দিশারী হিসাবে দেখাতে চাইছে. আর এটা এখনই বাস্তব হয়ে উঠেছে, যার সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে চলতে হচ্ছে.