শুরু করছি আমাদের সাপ্তাহিক অনুষ্ঠান – ‘রাশিয়ার আদ্যপান্ত’

এই অনুষ্ঠানে আমরা আপনাদের পাঠানো প্রশ্নের ভিত্তিতে রাশিয়া সম্পর্কে আপনাদের জানাই.

সেইজন্যই ভারতে, বাংলাদেশে, পাকিস্তানে ও মরিশাসে আমাদের শ্রোতাদের কাছে অনুরোধ যত বেশি সম্ভব প্রশ্ন পাঠান. লিখুন কোন সব বিষয় আপনাদের কাছে আগ্রহোদ্দীপক! আমাদের এই অনুষ্ঠানের শরিক হোন!

আজ আমরা উত্তর দেব ছত্তিশগড় রাজ্যের সোনপুরী থেকে চুনীলাল কেওয়ার্তের পাঠানো প্রশ্নেরঃ আলাস্কা আগে রাশিয়ার অন্তর্গত ছিল. কবে ও কেমন করে ঐ অঞ্চল আমেরিকার দখলে চলে গেল?

রাশিয়ার কোথায় সবচেয়ে সুন্দর মিউজিয়াম? – এই প্রশ্নটা আমাদের পাঠিয়েছেন দিল্লী থেকে দীপক কুমার.

অতএব, শুরু করছি চুনীলাল কেওয়াতের প্রশ্নের উত্তর দিতে – কবে ও কিভাবে রাশিয়ার আগেকার এলাকা, আলাস্কা আমেরিকার দখলে চলে গেল?

গোভজদোভ ও ফিওদরভের নেতৃত্বে রুশী অভিযাত্রী দল ১৭৩২ সালে আলাস্কা আবিস্কার করেছিল. প্রথমে রাষ্ট্র নয়, ব্যক্তিগত মালিকানা সেখানে কাজ শুরু করে, আর ১৭৯৯ সাল রুশী-মার্কিনী কোম্পানী সেই কাজ নিজের হাতে তুলে নেয়.

রাশিয়া আলাস্কা বিক্রয় করে দেয় ১৮৬৭ সালে. কারণ ছিল কয়েকটি.

প্রথমতঃ, উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি আলাস্কা ছিল প্রায় জনশূন্য. রুশী-মার্কিনী কোম্পানীর হিসাব অনুযায়ী, আলাস্কার বিশাল এলাকা জুড়ে সেই সময় ছিল আড়াই হাজার রুশী ও মোটামুটি ৬০ হাজার এস্কিমো ও রেড ইন্ডিয়ানদের বাস. ঐ দূরবর্তী এলাকার প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় হতো প্রচুর, আয় ছিল অনেক কম. তাই কোম্পানী দেনাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল.

দ্বিতীয়তঃ, ১৮৫৩-১৮৫৬ সালে ক্রিমিয়ার যুদ্ধে তুরস্ক, বৃটেন ও ফ্রান্সের আঁতাত বাহিনীর কাছে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে তখন রাশিয়া ছিল হীনবল. ঐ যুদ্ধের পরে পদাতিক ও নৌবাহিনী পুনরুদ্ধার করার জন্য রাশিয়ার প্রয়োজন ছিল অর্থের.

১৮৬৭ সালে রাশিয়া ৭২ লক্ষ্য ডলারের বিনিময়ে আমেরিকাকে আলাস্কা বিক্রয় করে দেয়. একেবারেই জলের দামে. সেই বছরেই নিউ-ইয়র্কের কেন্দ্রস্থলে একটা তিনতলা ভবন তার চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হয়েছিল.

আর বিক্রয় করে দেবার ৩০ বছর পরেই সেখানকার ভূগর্ভে খুঁজে পাওয়া গেল সোনা, তারপর খনিজ তেল, গ্যাস, প্ল্যাটিনাম ও কয়লা! কে তখন ভাবতে পেরেছিল!

আলাস্কায় এখনো প্রখম রুশী অভিবাসীদের বংশধরেরা বসবাস করে. তাদের জন্য সম্প্রতি রাশিয়ার ১ নম্বর কেন্দ্রীয় দূরদর্শন চ্যানেল রুশ ভাষায় সম্প্রচার করতে শুরু করেছে.

এবার উত্তর দিচ্ছি দিল্লী থেকে পাঠানো দীপক কুমারের প্রশ্নের – রাশিয়ায় সবচেয়ে সুন্দর মিউজিয়াম কোনটি?

আমরা এইমাত্র আলাস্কা বিক্রি করে আকাট মূর্খামি করার গল্প করেছি. কিন্তু রুশী জারদের একটা কর্মকান্ডের অশেষ প্রশংসা করতেই হয় – তারা বিশ্বজুড়ে সেন্ট-পিটার্সবার্গের হার্মিটেজ মিউজিয়ামের জন্য দামী দামী শিল্পদ্রব্য ক্রয় করতেন. এই মিউজিয়াম দুস্প্রাপ্য সংগ্রহের দিক থেকে প্যারিসের ল্যুভর, নিউ-ইয়র্কের মেট্রোপলিটেন ও লন্ডনের বৃটিশ মিউজিয়ামের থেকে কমতি যায় না.

বর্তমানে হার্মিটেজে ৩০ লক্ষেরও বেশি দ্রষ্টব্য বস্তু সাজানো আছে. তারমধ্যে আছে চিত্রকলা, ভাস্কর্য, মুদ্রা, পদক, অস্ত্রশস্ত্র, বিগত শতাব্দীগুলিতে লিপিবদ্ধ পুঁথিপত্র. যদি প্রত্যেকটি দ্রষ্টব্য বস্তু ১ মিনিট ধরেও অবলোকন করা হয়, তাহলেও ৮ বছর সময় লাগবে মিউজিয়ামে প্রদর্শিত সব কিছু দেখে শেষ করতে.

শিল্প দ্রব্য সংগ্রহ করতে শুরু করেছিলেন জারিনা দ্বিতীয় একাতেরিনা. ১৭৬৪ সালে প্রথম তিনি পশ্চিম ইউরোপে ২২৫টি ছবির ক্যানভাস কেনেন ও তার রাজদূতেদের আদেশ দেন ইউরোপের সমস্ত নীলাম থেকে নামীদামী শিল্পদ্রব্য কেনার. তার মৃত্যুর সময় হার্মিটেজে প্রায় ৪ হাজার চিত্রকলার ক্যানভাস, মহান স্থপতিদের স্থাপত্যকর্ম ও অন্যান্য দুস্প্রাপ্য বস্তু ছিল. তার পুত্ররা ও পৌত্ররা তার এই অভিমুখে অনবদ্য কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন. উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি হার্মিটেজ জনসাধারনের দেখার জন্য খুলে দেওয়া হয়.

এখানে বলা দরকার যে হার্মিটেজে অনবদ্য ধনশালী পশ্চিম ইউরোপ বিভাগ ছাড়াও আছে প্রাচ্য বিভাগ, যেখানে ভারত, চীন, ইরান প্রভৃতি দেশের শিল্পকলা প্রদর্শিত আছে.

ঐ শিল্পদ্রব্যগুলির বড় একাংশ কিনেছিলেন জার দ্বিতীয় নিকোলাই, যিনি রাজপুত্র থাকা অবস্থায় ভারত ভ্রমনকালে ঐ সব দ্রব্য সংগ্রহ করেছিলেন ১৮৯০-১৮৯১ সালে.

ইদানীংকালে ভারতীয় শিল্পদ্রব্যের সম্ভার আরও সমৃদ্ধ হয়েছে ভারতের সরকার ও সেন্ট-পিটার্সবার্গে ভারতীয় কনসাল বিভাগ প্রদত্ত উপহারসামগ্রীর দৌলতে. বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ভারতীয় উপমহাদেশের শিল্পসামগ্রী মিউজিয়ামে প্রদর্শিত হয়, যাদের উত্পত্তি দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে উনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত.

দীপক কুমার প্রশ্ন করেছিল, যে রাশিয়ায় সবচেয়ে সুন্দর মিউজিয়াম কোনটি. আর আমরা বস্তুগতভাবে জানালাম যে রাশিয়ায় সবচেয়ে ধনী মিউজিয়াম কোনটি.

হার্মিটেজের সংগ্রহশালা ৫ তলা জুড়ে. তাদের মধ্যে একটা তলা শীত প্রাসাদ, যেখানে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত জারের পরিবার বাস করতো. শীত প্রাসাদ বাইরে থেকেও তার চাকচিক্য ও বৈচিত্রে মুগ্ধ করে দর্শকদের. মর্মর দিয়ে নির্মিত বিশাল চওড়া সিঁড়ি উঠে গেছে সেইসব হলঘরে, যেখানে সব স্তম্ভ ও ভাস্কর্য সেমি-প্রেশাস পাথর দিয়ে নির্মিত, আর মেঝে ও সব আসবাবপত্র অতি দামী কাঠ দিয়ে নির্মিত. চারিপাশে ছড়ানো অজস্র আধাসোনার কাজ ও ক্রীস্টাল. সারা দেওয়ালের উচ্চতা জুড়ে আয়না, যা উল্টোদিকের জানলা দিয়ে অনুপম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য প্রতিফলিত করে.

আর এবার শুনুন একটি গান.

‘রাশিয়ার আদ্যপান্ত’ নামক অনুষ্ঠানটি এখানেই শেষ করছি. রাশিয়া সম্পর্কে আপনাদের নতুন চিঠিপত্র ও প্রশ্নাবলীর অপেক্ষায় থাকবো আমরা. আমাদের ঠিকানাঃ ভারত ও পাকিস্তানে সম্প্রচার বিভাগ, রেডিও রাশিয়া, ২৫ নম্বর প্যাতনিত্স্কায়া স্ট্রীট, মস্কো, রাশিয়া-১১৫৩২৬. ইন্টারনেটে আমাদের ঠিকানাঃ Letters a RUVR.RU.