নানারকমের ঢোল তবলার উত্সবের বাজনা, প্রচুর অল্প বয়সী রুশী ও ভারতীয় ছেলেমেয়েদের নেচে চলা এক মিছিল আজ সকালে মস্কোর কেন্দ্রে বহু পথচারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে. মেয়েরা পরেছিল খুবই উজ্জ্বল সব শাড়ী ও ছেলেরা পরেছিল দুগ্ধ সফেদ ধুতি, আর তারা ভারতের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ভারতীয় নৃত্যই করছিল, তারা এমনকি নিজেদের দলে বহু রুশ লোককেও টেনে নিচ্ছিল. আর তারা এমনকি খেয়াল করেও দেখে নি যে, তাদের এই কাণ্ডে সদা ব্যস্ত মস্কো শহরের গাড়ী ঘোড়াও থেমে গিয়েছে. চলতে চলতেই অনেক খানি বেড়ে যাওয়া উত্সবের এই মিছিল শেষ অবধি কুজনেতস্কি মস্ত এলাকায় মস্কোর কেন্দ্রীয় শিল্পী ভবনের বিশাল প্রেক্ষাগৃহে জমায়েত হয়েছিল, যার দেওয়ালে দেওয়ালে আজ জায়গা করে নিয়েছে পুরনো ও নয়া দিল্লী, বিহার, মহারাষ্ট্র, কর্নাটক ও ভারতের অন্য সব রাজ্যের বহু দেখার মতো জায়গার ছবি, যেন জায়গাটাই হয়ে রয়েছে এক মিনিয়েচার ভারতবর্ষ. আর মঞ্চ থেকে বয়ে আসছিল সঙ্গীত, যা মিশিয়ে দিয়েছে ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত ও বর্তমানের তালকে একই সুরে.

‘আমরা “ভেদালাইফ” নামের এই উত্সব ভারতের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে এই বারেই প্রথম করছি না’ – ব্যাখ্যা করে বলেছেন এই উত্সবের আয়োজক মস্কোর এক যুবক ব্যবসায়ী গিওর্গি আইস্তভ, তিনি আরও যোগ করেছেন:

“একবার ভারতে গিয়েই আমি সেই দেশকে ভালবেসে ফেলেছি, সেখানের লোকদেরও. তারপরে ইচ্ছা হয়েছিল আরও গভীরে চেনার, তার ইতিহাস জানার, সংস্কৃতিকে উপলব্ধি করার, শিল্পকে চেনার. এখন এর জন্য সম্ভাবনাও রয়েছে অনেক. আমার অনেক বন্ধু হয়েছে, যাঁরা ভারতকে ভালবাসেন, সহকর্মীও রয়েছেন ব্যবসায়ী মহলে, যাঁরা ভারতের সঙ্গে কাজ করেন, সেই দেশের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরী করছেন. আমরা ঠিক করেছিলাম একটা নিরামিষ খাবারের দোকান জগন্নাথ নাম দিয়ে খোলার, আর সেটা একেবারেই ভারতীয় করার. এই দোকান একেবারেই কেন্দ্রীয় শিল্পী ভবনের কাছে, আর আমরা সেখানে বহু সঙ্গীত সন্ধ্যার আয়োজন করে থাকি, যেখানে ভারত ও রুশ দেশের শিল্পীরা অংশ নিয়ে থাকেন”.

এখানে স্বীকার করার দরকার যে বিগত বছর গুলিতে মস্কো শহরে যে কুড়িটি মতো ভারতীয় কাফে ও রেস্তোরাঁ খোলা হয়েছে – তার মধ্যে জগন্নাথ একটা সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বিখ্যাত কাফে. কারণ, প্রথমতঃ – এটা একেবারে শহরের কেন্দ্রে, আর দ্বিতীয়তঃ – এখানের রান্না খুব ভাল(!) এটা এমনকি এখানে আসা ভারতীয় লোকরাও স্বীকার করেন(!) অবশ্যই এখানে প্রধান বাবুর্চী ভারতীয় ও সেই এখানের রুশী লোকদের রান্না শেখায়. আর ভারতের উত্সবের দিনে গিওর্গি আইস্তভ ও তাঁর সহকর্মীরা কলকাতা থেকে গোপাল নিত্য নামের এক নাম করা রাঁধুনিকে নিয়ে এসেছেন. এই গোপাল বাবু অবশ্য রাশিয়াতে প্রথমবার আসেন নি.

আপনারা শুনলে অবাক হবেন কিনা জানি না যে, গোপাল বাবু নিয়মিত ফিভার এফ এম স্টেশনে রাশিয়ার অনুষ্ঠান কলকাতা ও দিল্লী শহরে শুনে থাকেন. এই উত্সবের দিনে গোপাল নিত্য ও তার সহকর্মীরা মিলে উত্সবের অতিথিদের জন্য বানিয়েছেন ১০০০ জনের মতো লোকের জন্য গোলাপ জমুন নামের মিস্টি, আপেলের পুর দেওয়া মিস্টি সিঙাড়া ও এই সব আরও নানা রকমের মিস্টি বানানোর জন্য ব্যবহার করেছেন ১০০ লিটার দুধ. তিনি বলেছেন:

“আমি রাশিয়াতে আসতে খুবই ভালবাসি, আমাদের দুই দেশের লোকদের মধ্যে একটা অদৃশ্য সহমর্মীতার বন্ধন রয়েছে. আমার এখানকার সহকর্মীদের কাজ শেখাতে ভাল লাগে, আর আমার ভাল লাগে যে, রুশ লোকদের কাছে আমাদের রান্না ভাল লাগতে শুরু করেছে. এটা খুবই ভাল যে, এখানে ভারতের উত্সব পালন করা হয়ে থাকে – ভারতের ছেষট্টিতম স্বাধীনতা দিবসে এত রুশ লোক এসেছেন দেখে খুবই ভাল লাগছে”.

গোপাল নিত্য ও তাঁর সহকর্মীরা কাজ করতে গিয়ে বেদম হয়ে পড়েছেন, কারণ এখানে আসা সমস্ত লোককেই খেতে দিতে হবে – আর লোকসংখ্যা খালি বেড়েই চলেছে, তাদের জন্য দিতে হচ্ছে নিরামিষ পানীয়. সকলকেই এই উত্সবের দিনে খাওয়ানো হচ্ছে বিনামূল্য জগন্নাথ কাফের তরফ থেকে. আর তাও এই উত্সবের মেন্যুতে সবচেয়ে বেশী করে লোকো কি চাইছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেছেন যে, ‘আজ সকলেই চাইছে বেশী করে কিশমিশ দেওয়া পায়েস – আমরা সমস্ত লোককেই এটা দিচ্ছি’.

উত্সবের দিন গুলিতে শুধু মস্কোতেই নয়, সেন্ট পিটার্সবার্গ, কাজান, তভের ও অন্যান্য রুশ শহরেও উত্সব পালন করা হচ্ছে. ১৫ই আগষ্ট রাজধানীতে সঙ্গীতানুষ্ঠান করতে এসেছেন “কর্নাট্রিক্স” নামের ভারতীয় সিনথেসাইজড মিউজিকের দল, খোলা হচ্ছে শিল্পী কাশীনাথ দাসের ছবির প্রদর্শনী আর কয়েকদিন বাদে হতে চলেছে ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের অনুষ্ঠান.