ভারতের মত বিশ্বের আর কোনও দেশের সঙ্গেই রাশিয়ার এত বহুল প্রসারিত পারমানবিক শক্তি বিষয়ে সহযোগিতা নেই, - এই রকমই মন্তব্য করেছেন ভারতে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার কাদাকিন. - ভারতের স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে “রেডিও রাশিয়াকে” দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে রাষ্ট্রদূত বর্তমানের ভারত- রাশিয়া সম্পর্ক নিয়ে বলেছেন ও তিনি এর ভবিষ্যত সম্বন্ধেও পূর্বাভাস দিয়েছেন. কিন্তু সবার আগে - এই উত্সব নিয়ে বলেছেন:

“ভারতের স্বাধীনতার ৬৫ বছর শুধু ভারতের নাগরিকদের জন্যই নয়, বরং তাদের রাশিয়ার বন্ধুদের জন্যও এক বড় ঘটনা, রাশিয়ার সেরা বুদ্ধিজীবীরা ভারতীয় জনগনের বীরত্বের সঙ্গে স্বাধীনতার লড়াইকে সমর্থন করেছিল. সোভিয়েত দেশ ভারতরে স্বাধীনতা ঘোষণার অনেক আগেই ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিল. এই কিছুদিন আগেই আমরা কূটনৈতিক সম্পর্কের ৬৫ বছর পালন করেছি. এই বছর আরও অন্যান্য জয়ন্তী বছর হিসাবেও এক সমৃদ্ধ বছর. ৭০ বছর আগে কুলু উপত্যকায় জওহরলাল নেহরু, ইন্দিরা গান্ধী ও নিকোলাই রোয়েরিখের পরিবারের লোকরা একত্রিত হয়েছিলেন. সারা বিশ্ব জুড়ে তখন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের দামামা বাজছিল, কিন্তু এই সব দারুণ মানুষরা আলোচনা করেছিলেন ভারত ও সোভিয়েত দেশের মধ্যে মৈত্রী সমিতি সৃষ্টি নিয়ে. এই বছরে মস্কো থেকে হিন্দুস্থানী ভাষায় প্রচারের ৭০ বছর পালিত হচ্ছে. আমরা তারই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সামরিক প্রযুক্তি বিষয়ে সহযোগিতা শুরুর পঞ্চাশ বছর পালন করছি. দুই দেশের স্ট্র্যাটেজিক সহকর্মী হওয়ার বিষয়ে এই সহযোগিতার গুরুত্ব অনেক. সুতরাং আমাদের অনেক কারণ রয়েছে আমাদের বন্ধুদের উত্সবে আনন্দ করার”.

ভারতের উন্নতিশীল অর্থনীতি প্রথম সারিতে এগিয়ে এনেছে বিদ্যুত ও শক্তি সরবরাহের প্রশ্নকে. এই দিকে রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতা ভারতের জন্য বিশেষ আগ্রহের কারণ হয়েছে. কয়েকদিন আগের দেশ জোড়া বিদ্যুত ব্যবস্থা বিপর্যয়ের পরে আরও একবার প্রমাণিত হয়েছে যা আমরা আগে থেকেই জানতাম, এই কথা উল্লেখ করে আলেকজান্ডার কাদাকিন আরও বলেছেন:

“বিদ্যুত শক্তি বিষয়ে দেশের চাহিদা পূরণের একমাত্র সঠিক পথ – পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্র তৈরী করা, অনেক দিন হয়েছে কুদানকুলামের প্রথম পারমানবিক রিয়্যাক্টর তৈরী হয়ে রয়েছে, দ্বিতীয় রিয়্যাক্টরও বাস্তবে তৈরী. কুদানকুলাম তিন ও চার নম্বর রিয়্যাক্টর নিয়েও চুক্তির কাগজ পত্র সব তৈরী হয়ে আছে. ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্র তৈরী করা নিয়ে পথ নির্দেশও তৈরী হয়ে আছে”.

সবচেয়ে বেশী সম্ভাবনাময় সহযোগিতার দিক রাশিয়া রাষ্ট্রদূত মনে করেন ভারতের পক্ষ থেকে রাশিয়ার দিক নির্দেশ করার উপগ্রহ ব্যবস্থায় অংশ গ্রহণ করা. গ্লোনাসস ব্যবস্থা অন্যান্য আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার চেয়ে বেশী সুযোগ দিতে পারে, বলে উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বলেছেন:

“এই ব্যবস্থা জিপিএস ব্যবস্থার সাহায্যেও কাজ করতে পারে. ভারতীয় বিজ্ঞানীদের কাছে গ্লোনাসস ব্যবস্থা এই জন্য আগ্রহের যে, তা নিরাপদ শহর ব্যবস্থার প্রকল্পে কাজে লাগতে পারে, যা শহরের পরিবহন ব্যবস্থা, জল ও বিদ্যুত সরবরাহ ব্যবস্থা, আগুন নেভানোর ব্যবস্থা, দেশের সড়ক ও জলপথে মাল পরিবহনের ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ ও কৃষি কাজে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়ার ব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে করার কাজে লাগতে পারে”.

তা স্বত্ত্বেও, এই কয়েক দিন আগেও যা একেবারেই নিষ্কলঙ্ক ও চকচকে ছবির মতো ছিল, সেই ভারত রাশিয়া সম্পর্কে কি কোন কালো রঙ দেখতে পাওয়া যাচ্ছে? রাশিয়ার এক বড় ও বহু ব্যবসায়ে নিরত কোম্পানী “আএফকে সিস্টেমা” ভারতের “শ্যাম টেলিসার্ভিসেস” কোম্পানীর সঙ্গে একসাথে যে মোবাইল পরিষেবা ব্যবস্থা “এমটিএস” নামে চালু করেছে, তার লাইসেন্স প্রত্যাহার নিয়ে কথা চলছে, তাই তারা এখানে ব্যবসা করতে গিয়ে অসুবিধার মুখে পড়েছে. রাষ্ট্রদূত এর উত্তরে বলেছেন যে, সমস্যা রয়েছে ও যোগ করেছেন:

“ভারতীয় অর্থনীতিতে “আএফকে সিস্টেমা” সংস্থার সব মিলিয়ে লগ্নি করা হয়েছে তিনশ দশ কোটি ডলারের সমান, তার মধ্যে একশ কোটি ডলার রুশ সরকারের লগ্নি, তার মানে হল আমাদের দেশের মানুষদের কর থেকে পাওয়া অর্থ, যা আমরা ছেড়ে দিতে পারি না, হাওয়ায় উড়ে যেতে দিতে পারি না. রাশিয়াতে ব্যবসার জন্য স্ট্র্যাটেজিক সহকর্মী দেশ হিসাবে আমরা ভারতের জন্য খনিজ তেল গ্যাস বিষয়ে, ওষধি নির্মাণে, সার উত্পাদনে অনেক বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছি, তাই আমরাও আমাদের বিনিয়োগের বিষয়ে ভারতে একই ধরনের সুবিধা আশা করতেই পারি. স্ট্র্যাটেজিক সহযোগিতা – এটা একটা রাস্তা, যেখানে দু দিকেই প্রবাহ চলে”.

আলেকজান্ডার কাদাকিন বিশ্বাস করেন যে, দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার পথে যে সব অমসৃণ বিষয় উঠে এসেছে, তা নিয়ন্ত্রিত হয়ে যাবে. রুশ প্রজাতন্ত্র ও ভারতবর্ষের মধ্যে সমস্ত সময়ের কূটনৈতিক সম্পর্কের ইতিহাসে এমন একটা সময়ও ছিল না, যখন আমাদের সামনে কোনও সমাধান অযোগ্য পরিস্থিতি তৈরী হয়েছিল. রোয়েরিখ পরিবারের লোকরা যেমন বলতেন যে, বাধা অতিক্রম করেই আমরা বেড়ে উঠি, অর্থাত্ আমাদের সহযোগিতাকে নতুন সব দিগন্তের সামনে তুলে ধরি, তাই আলেকজান্ডার কাদাকিন শেষে যোগ করেছেন:

“ভারতীয় জনগনকে তাদের স্বাধীনতার পঁয়ষট্টি বছর নিয়ে সম্বর্ধনা জানিয়ে বলা যেতে পারে যে, প্রায় প্রত্যেক রুশ নাগরিকই রাশিয়া ও ভারতের প্রায় ১৫ কোটি লোকের মৈত্রী সমিতির সদস্য, - তাতে নিজেদের অবদানও রেখেছে রেডিও স্টেশন “রেডিও রাশিয়া”, যা ভারতীয়রা শুনতে চেয়েছেন, যারা এখানে নিজেদের ইন্টারনেট উপস্থিতিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে, ভারতীয় এক এফ এম স্টেশনে প্রতিদিন শুনতে পাওয়া যাচ্ছে সাফল্যের সঙ্গে রাশিয়ার কথা. ভারতীয়রা “রেডিও রাশিয়ার” অনুষ্ঠান শুনতে চান. তাদের ইন্টারনেট গ্রাহক, রেডিও যারা শোনেন, তারা প্রতি বছরে এই স্টেশন আয়োজিত দিল্লীর রুশ বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি কেন্দ্রের সম্মেলনে যোগ দিয়ে থাকেন. এই বছরের শেষেও পরিকল্পনা রয়েছে সপ্তম সম্মেলন করার. রাষ্ট্রদূত বিশ্বাস করেন যে, রেডিও আমাদের দুই দেশের মানুষের যোগাযোগের একটা গুরুত্বপূর্ণ চ্যানেল হয়েই থাকবে.”

ভারতীয়দের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে অভিনন্দন জানিয়ে আমরা তাঁদের জন্য কামনা করব সমৃদ্ধির, শান্তির, আর অন্য সব কিছুরই, যা নিজেদের সবচেয়ে কাছের বন্ধুদের জন্য কামনা করা সম্ভব – এই কথাই বিশেষ করে উল্লেখ করেছেন রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার কাদাকিন.