জোট নিরপেক্ষ রাষ্ট্র গুলির শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য আগষ্ট মাসের শেষে ভারতের প্রধান মন্ত্রী ডঃ মনমোহন সিংহ ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন ইরান যাওয়ার. এই বিষয়ে গত সপ্তাহের শেষে খবর দিয়েছে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল সংবাদপত্র. এমনিতে এই ঘটনা কিছু বিশেষ আগ্রহের সৃষ্টি করতে পারতো না – কারণ ভারত ন্যায়সঙ্গতঃ কারণেই এই আন্দোলনের এক নেতৃস্থানীয় দেশ, যদি না সম্মেলনের স্থান নিয়ে কোনও কথা থাকতো. ইরান, বর্তমানে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার কবলে রয়েছে, আর ক্রমাগত চেষ্টা করে চলেছে এই এলাকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী দেশ গুলির সঙ্গে ও খোদ আমেরিকার সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘর্ষ এড়ানোর জন্য.

গত সপ্তাহ গুলিতে স্পষ্ট করেই দেখতে পাওয়া গিয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে এশিয়াতে ইরান বিরোধী এক যৌথ ফ্রন্ট গড়ে তোলার চেষ্টা বিফল হয়েছে. এশিয়ার দেশ গুলিই – বিশেষতঃ ভারত, চিন, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান ইরানের খনিজ তেলের প্রধান ক্রেতা. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে পড়ে এই সমস্ত দেশই কিছু ছাড় দিতে বাধ্য হয়েছে. আর গরমের মাঝামাঝি থেকে ইউরোপীয় সঙ্ঘের নিষেধাজ্ঞা বহাল হওয়ার পরে ইরানের খনিজ তেলের ট্যাঙ্কার গুলির উপরে ইউরোপীয় বীমা কোম্পানী গুলির বীমা করা অসম্ভব হয়ে যাওয়ার জন্যই মনে হয়েছিল যে, হয়তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি প্রয়োগ কোনও একটা সাফল্য বুঝি পেতে চলেছে. কিন্তু ইরানের খনিজ তেল থেকে হঠাত্ করেই ব্যবহার নিষিদ্ধ করে দেওয়া, আমদানী কারক দেশ গুলির জন্য স্বার্থ উপযুক্ত একেবারেই নয়. অন্য দিকে এর জন্য বদলি কিছু পাওয়া, যেমন, সৌদি আরব থেকে বাড়তি খনিজ তেল পাওয়াও খুব একটা সহজ কাজ নয়. সুতরাং ভারতের জন্য ইরানের খনিজ তেলই এখনও প্রধান সরবরাহ করা তেল রয়ে গিয়েছে, যে কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এশিয়ার দেশ গুলি ইউরোপের পক্ষ থেকে ট্যাঙ্কার গুলির বীমা করা নিয়ে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে: ইরান নিজেরাই নিজেদের ট্যাঙ্কার বীমা করা নিয়ে তৈরী থাকার প্রমাণ দিয়েছে. সুতরাং এখন বহু বিশেষজ্ঞের মতেই যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের পশ্চিমের জোটের লোকরা কোন রকমের নতুন ফাঁদ পাতে, তাহলেও ইরানের খনিজ তেল এশিয়ার দেশ গুলিতে রপ্তানী করা কমে যাবে না, আর হয়তো সম্ভবতঃ আগের সমস্ত পরিমানের সূচক অবধিই বেড়ে যাবে”.

তার ওপরে আবার সম্মিলিত ভারতীয় শিল্প- বাণিজ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বর্তমানের এক হাজার তিনশো সত্তর কোটি থেকে ২০১৫ সালে ভারত ও ইরানের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমান বাড়তে পারে দেড় হাজার কোটি ডলারের সমান অর্থমূল্যের.

বিগত বছর গুলিতে বিশেষ করে “পারমানবিক লেনদেন” বিষয়ে জর্জ বুশ জুনিয়রের সময়ে ভারত ও আমেরিকার মধ্যে চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পরে অনেকে পর্যবেক্ষকই বলেছিলেন ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এশিয়াতে স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থ একই ধরনের হওয়া নিয়ে. কিন্তু এটা যদি বলা সম্ভবও হয়, তবে তা শুধু একটা দিকেই: দুই দেশই চিনকে আটকে রাখার বিষয়ে আগ্রহী. ইরান সম্পর্কে দেখা গেল যে, ভারতের রাজনীতি কিছুতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির মূল ধারায় সামিল হচ্ছে না, তাই বরিস ভলখোনস্কি উল্লেখ করে বলেছেন:

“ভারতের সেই প্রচেষ্টা, যা ইরানের সঙ্গে পারস্পরিক ভাবে লাভজনক সহযোগিতার দিকে করা হচ্ছে, তার অনেক গুলি বাস্তব কারণ রয়েছে. এটা যেমন ঐতিহাসিক ভাবে নৈকট্য, যৌথ অর্থনৈতিক ভাবে তেমনই লাভও. দুই দেশের পক্ষেই এখন সবচেয়ে লাভজনক ও গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে আফগানিস্তানের সমস্যা সমাধান নিয়ে যৌথ নীতির বিষয়ে সহযোগিতা. যেমন ভারত, তেমনই ইরান ঐতিহ্য মেনেই পাকিস্তানের পক্ষ থেকে সমর্থিত তালিবদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধী পক্ষ, আর তাই এখানে দুই দেশেরই সামরিক বাহিনী বাধ্য হবে ২০১৪ সালে আফগানিস্তান থেকে পশ্চিমের জোটের সেনা বাহিনী অপসারণের পরে সহযোগিতা করতে”.

এই দিকে খুবই সক্রিয় ভাবে বাস্তব সহযোগিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে. যেহেতু ভারত আফগানিস্তানে সরাসরি পৌঁছনোর রাস্তা পাচ্ছে না, আর পাকিস্তান হয়ে পরিবহনের পথ খুব স্বাভাবিক কারণেই ভারতের জন্য বাস্তবে বন্ধ, তাই এখানে ইরানের ভূমিকা বহুলাংশেই বৃদ্ধি পাচ্ছে. ইরান ভারতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ সেই পরিবহন করিডরের জন্য, যা ভারতকে ইরানের বন্দর চাখবেহার হয়ে আফগানিস্তান, মধ্য এশিয়ার অন্যান্য দেশ হয়ে – পরে রাশিয়া ও অন্যান্য উত্তর ইউরোপের দেশ গুলি পর্যন্ত রাস্তা তৈরী করে দেবে.

0সুতরাং একেবারেই স্পষ্ট করে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে যে – ভারতের স্বার্থের কারণেই – পরবর্তী কালেও ইরানের সঙ্গে শান্তি ও স্থিতিশীলতার পরিবেশে বহু মাত্রিক সহযোগিতা বাড়ানো ঠিক কাজ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার উপগ্রহ গুলির হয়ে এই স্থিতিশীলতা নষ্ট করে দেওয়াতে কোনও লাভ নেই.