আগষ্ট মাস এসেছে, এটা সেই মাস যখন উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া জাপানের সাম্রাজ্যবাদের হাত থেকে স্বাধীন হওয়া পালন করে থাকে. ঐতিহ্য মেনেই, এই মাসে যেমন উত্তরে, তেমনই দক্ষিণে রাজনীতিবিদ, সংবাদ মাধ্যম জাপানের উপনিবেশবাদীদের অপরাধ গুলিকে স্মরণ করেন, আর তারই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে ঐক্যের প্রশ্ন উত্থাপন করেন. আসলে এই বিষয়টি কোরিয়ার তথ্য মাধ্যমে সব সময়েই ছিল, কিন্তু আগষ্ট মাসে এই বিষয়ে আলাদা করে মনে না করা হলে, তা একেবারেই ঠিক হয় না.

এই রাজনৈতিক মৌসুমে ঐক্যের বিষয় প্রথম উত্থাপন করেছেন উত্তর কোরিয়ার নতুন নেতা কিম চেন ঈন, যিনি ৩রা আগষ্ট বলেছেন: “বহির্শক্তির দ্বারা জোর করে দেশ ভাগ আমাদের দেশকে অসংখ্য কষ্টের মধ্যে ফেলেছে, আর জাতীয় ঐক্য সাধন এক মহান জাতীয় প্রশ্ন, যার সমাধানে এক ঘন্টার জন্যও দেরী হতে দেওয়া যেতে পারে না”.

কোন বিশেষ সন্দেহ নেই যে, এই দিন দশেকের মধ্যেই এই রকমেরই কিছু একটা ঘোষণা করবেন দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রপতি. গত বছরের আগষ্ট মাসে যেমন রাষ্ট্রপতি লী মেন বাক বলেছিলেন যে, “ঐক্য সাধন – এটা আমাদের দুই দেশেরই নাগরিকদের এক উষ্ম স্বপ্ন”. তার উপরে, তিনি আবার এক বিশেষ আর্থিক তহবিল গড়ার প্রস্তাব করেছিলেন, যার থেকে অর্থ ব্যয়ের কথা ছিল দুই দেশের মধ্যে ঐক্য সাধনেরই জন্য.

তাই কথায় সকলেই বলেন “হ্যাঁ” – কিন্তু কাজে কোন রকমের ঐক্যই নেই, আর সত্যি করে বলতে হলে, সে রকম কোন লক্ষণও দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না. কারণ হল যে, ঐক্য বদ্ধ হওয়ার শপথ বহু দিন আগে থেকেই যেমন উত্তর কোরিয়াতে, তেমনই দক্ষিণ কোরিয়াতেও একটা কথার কায়দা হয়ে দাঁড়িয়েছে, এক ধরনের চলে আসা নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের মতই. বোধহয়, এই গুলিকে তুলনা করা যেতে পারে, গত শতকের সোভিয়েত ব্যুরোক্র্যাটদের কথার সঙ্গে, যারা সকলকে নিয়মিত ভাবেই আশ্বাস দিয়ে থাকতেন যে, তাদের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হল, সারা বিশ্বে কমিউনিজম তৈরী করা. বোঝাই যাচ্ছে যে, কমিউনিজম তৈরী করার জন্য এই ধরনের ইউটোপিয়া মার্কা ধারণা সোভিয়েত দেশের রাজনীতির উপরে বিন্দু মাত্র প্রভাব ফেলতে পারে নি.

সেই রকম ব্যাপারটা হয়ে রয়েছে কোরিয়াতেও. দুই কোরিয়াতেই জাতীয়তাবাদ হয়ে রয়েছে যে কোন রকমের তাত্ত্বিক ব্যবস্থার অঙ্গ, আর ঐক্যের ধারণা এই জাতীয়তাবাদের ক্ষেত্রে এক বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে. বাস্তবে দুই দেশেই ঐক্যের প্রতি আগ্রহ অনেকটাই কমে গিয়েছে. প্রধান সমস্যা হল – এটা দুই কোরিয়ার মধ্যে অর্থনৈতিক উন্নতি ও আয়ের বিশাল বৈষম্য. খুবই ইতিবাচক মূল্যায়ণ অনুযায়ী দক্ষিণের চেয়ে উত্তরে গড় ব্যক্তিগত আয়ের পরিমান ১৫ ভাগ কম.

এই বৈষম্য উত্তরের জন্য দুটি অর্থ বহন করে. প্রথমতঃ, কোরিয়া এক হলে উত্তর কোরিয়ার উচ্চ পদস্থ লোকেরা, তাদের অর্থনৈতিক ভিত্তি থেকে চ্যুত হয়ে দক্ষিণের উচ্চ পদস্থ লোকেদের সঙ্গে আর এক সারিতে বসতে পারবে না. দ্বিতীয়তঃ, ঐক্যে ফলে উত্তর ও দক্ষিণের মধ্যে অবধারিত ভাবে যোগাযোগের বৃদ্ধি হলে উত্তরের সাধারন মানুষ দক্ষিণের লোকদের উন্নতির কথা জানতে পারবেন, আর খুব সম্ভবতঃ, সিদ্ধান্ত নেবেন যে, দারিদ্র্যের জন্য দায় উত্তর কোরিয়া উচ্চ পদস্থ লোকদেরই ও সেই রাজনীতি, যা তারা কয়েক দশক ধরেই চালিয়ে যাচ্ছে.

অন্য দিকে, এক বৃহত্ অর্থনৈতিক ব্যবধানের অর্থ হল যে, দক্ষিণও ঐক্যের ধারণা থেকে কোন রকমের উত্সাহের কারণ দেখছে না. জার্মানীর ঐক্যের অভিজ্ঞতা যেমন, দেখিয়ে দিয়েছে যে, ঐক্যের মূল্য খুবই দামী হবে – আর দক্ষিণে এর জন্য দাম দিতে খুব কম লোকেই চাইবে. দক্ষিণেও ঐক্যের ধারণার প্রতি সন্দেহের চোখে দেখে থাকেন দেশের বিশেষ সুবিধা প্রাপ্ত শ্রেনীর লোকরা, আর এমনকি তথাকথিত সাধারন মানুষও. বিশেষ করে সন্দেহ প্রকাশ করে - যুব সমাজ. এই বাস্তব সকলেরই জন্যই খুব চোখে পড়ার মতো, যারা এখন দক্ষিণ কোরিয়াতে থাকেন, আর তা জনমত গ্রহণের ফলাফলেও দেখতে পাওয়া যায়. ২০১০ সালে সিওলের রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা ঐক্যের সমস্যা নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার লোকদের মধ্যে এক গবেষণা করেছিলেন. ২০ বছরের কম দের মধ্যে “ঐক্য প্রয়োজন” এই বিষয়ে একমত হয়েছিলেন অর্ধের কিছু কম, শতকরা ৪৮, ৮ শতাংশ লোক. যাদের বয়স পঞ্চাশের বেশী তাঁদের মধ্যে এই ধারণাকে সমর্থন করেছিলেন দুয়ের তৃতীয়াংশ (৬৭, ৩ শতাংশ). এটা এমনিতেই বোঝা যেতে পারে: দক্ষিণ কোরিয়ার যুব সমাজের জন্য উত্তর কোরিয়া এক অজানা, - আগ্রহ জাগায় না এমন আর খুবই গরীব দেশ, যাদের জনসাধারন শুধু একই ধরনের ভাষায় কথা বলে থাকেন.

তবে এর মানে এই নয় যে, কোরিয়ার ঐক্য হওয়া সম্ভব নয়. কিন্তু দেখাই যাচ্ছে যে, সিওলের ও পিয়ংইয়ং এর নেতাদের কথায় ঐক্য নিয়ে যা বলা হয়ে থাকে, তা খুব একটা সিরিয়াস ব্যাপার বলে নেওয়ার দরকার নেই.