পাকিস্তানের সামরিক বিচারালয় পাঁচ জন উচ্চ পদস্থ সামরিক অফিসারের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করেছে. ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলি খানের পাঁচ বছরের হাজত বাসের শাস্তি হয়েছে – পাকিস্তানের সেনা বাহিনীর চারজন মেজর, যাঁরা তাঁর অধীনস্থ, তাঁদের দেওয়া হয়েছে দেড় থেকে তিন বছর মেয়াদের হাজত বাসের শাস্তি. পাকিস্তানের সামরিক মন্ত্রণালয়ের সরকারি ঘোষণাতে বলা হয়েছে যে, বিচারাধীন লোকেরা সাজা পেয়েছেন অন্যান্য অভিযোগের সঙ্গে নিষিদ্ধ সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগের জন্যও. এই সংস্থা কোনটা, তা বলা হয় নি, কিন্তু কারও জন্যই গোপন নয় যে, এখানে হিজব- উত্ – তেহরির দলের কথাই বলা হচ্ছে – যেটা একটা চরম পন্থী ঐস্লামিক দল, লন্ডনে তাদের ঘাঁটি ও তারা পাকিস্তানে নিষিদ্ধ.

হিজব – উত্ – তেহরির নিজেরা কোন সন্ত্রাসবাদী দল নয় ও তারা কোন রকমের হিংসার রাজনীতি প্রচার করে না. কিন্তু অন্যান্য সংস্থার জঙ্গীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে, যারা পাকিস্তানের বর্তমান সরকারের জোর করে পতন ঘটিয়ে দেশে খলিফা আইন বজায় করতে চায় আর নিজেদের লক্ষ্য সাধনের জন্য চেষ্টাও করে যাচ্ছে.

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলি খান ও তাঁর অধীনস্থ লোকদের নিয়ে মামলা গত বছর থেকেই হচ্ছে. তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল মার্কিন বিশেষ বাহিনীর হাতে ওসামা বেন লাদেনের মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই. প্রথম থেকে করা অভিযোগের মধ্যে আইন সঙ্গত সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ষঢ়যন্ত্রের অভিযোগও ছিল. পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর সরকারি ঘোষণা বিচার করে ও শাস্তি তুলনা মূলক ভাবে কম হওয়াতে মনে হয়েছে যে, এই অভিযোগ ধোপে টেকে নি. কিন্তু একেবারেই সত্য বলে জানা গিয়েছে যে, ব্রিগেডিয়ার আলি খান হলেন বর্তমানের পাকিস্তান বাহিনীর সবচেয়ে উচ্চ পদস্থ অফিসার, যাঁর বিরুদ্ধে চরমপন্থীদের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ আনা হয়েছে, যিনি দেশের সরকারের নামে কড়া সমালোচনা করেছেন যে তারা বড্ড বেশী আমেরিকা পন্থী রাজনীতি করছেন.

পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী নিয়ে এই মামলা খুবই জরুরী এক সমস্যার কথা তুলে ধরেছে, যা আগামী দশ – পনেরো বছরের মধ্যেই খুবই তীক্ষ্ণ হয়ে দাঁড়াতে পারে, এই কথা মনে করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“সামরিক বাহিনী পাকিস্তানের রাজনীতিতে খুবই বিশেষ জায়গা দখল করে রেখেছে – খুব ভাল করেই জানা রয়েছে যে, সামরিক বাহিনীর লোকরা এই দেশের উত্পত্তির পর থেকে অর্ধেকের বেশী সময় ধরে দেশ চালিয়েছে. আজ অসামরিক সরকারের দুর্বলতার পরিপ্রেক্ষিতে, তারা আপাত দৃষ্টিতে রাজনীতির বাইরে থাকলেও, যে কোন রকমের চরম পন্থী শক্তির পথে সবচেয়ে ভরসা যোগ্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যারা চাইছে সংবিধান বহির্ভূত ভাবে দেশের ক্ষমতায় এসে দেশকে খুবই অনিয়ন্ত্রিত বেশ কয়েকটি ভাগে টুকরো করে দিতে চাইছে. এখন দেখতে পাওয়া যাচ্ছে যে, উচ্চ পদস্থ অফিসারদের মধ্যেও লোক রয়েছে, যারা চরমপন্থী ঐস্লামিকদের প্রতি নিজেদের সহানুভুতির কথা গোপন করছেন না. আর এই খানেই একটা ধরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যার কথা সমাজ বিজ্ঞানীরা কয়েক বছর আগেই উল্লেখ করেছিলেন – আর তা হল, পাকিস্তানের অফিসারদের মধ্যে ঐস্লামিক মানসিকতার প্রভাব বৃদ্ধি. এই ধরনের মানসিকতা আপাততঃ মেজর থেকে কর্নেল পর্যন্ত পদের অফিসারদের মধ্যেই বেশী দেখতে পাওয়া যাচ্ছে. কিন্তু আরও কয়েক বছর পরেই বর্তমানের কর্নেলরা জেনারেল হবেন আর তারাই দেশের সামরিক বাহিনীর ক্ষমতায় গুরুত্বপূর্ণ সব আসন নেবেন”.

এই ধরনের মানসিকতার জন্য বাড়তে দেওয়ার মতো পরিবেশ হয়েছে অনেক ক্ষেত্রেই দেশের জটিল ও বিশেষ করে পাকিস্তানের সরকার ও সামরিক বাহিনীর অংশতঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি একেবারেই সঠিক করে বলার উপযুক্ত নয় এই ধরনের অবস্থান. এক দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানের তালিবদের বিরুদ্ধে নিজেদের যুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে সহযোগী হিসাবে সাহায্য ছাড়া চলতে পারে না. আবার অন্য দিকে – কোন রকমের সম্মান না দেখিয়ে নিয়মিত ভাবে পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ করে তাদের দেশে শুধু জঙ্গী নয় নিরীহ জনতার উপরেও ড্রোন আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে. পাকিস্তানের সরকার বোধহয়, কোন এক রকমের অবস্থান এই কারণেই নিতে পারছে না, আর, কথা বার্তায় মার্কিনের সমালোচনা করলেও আর্থিক সাহায্য পাওয়ার আশায় হাত বাড়িয়েই রয়েছে.

এই ধরনের দু মুখী রাজনীতি পাকিস্তানের অনেকেরই গা জ্বালার কারণ হয়েছে. আর তাই আশা করা যেতেই পারে যে, ব্রিগেডিয়ার আলি খান ও তাঁর চার অধীনস্থ মেজরের উপরে মামলা দিয়েই এর শেষ হবে না. এই কথা সত্যি যে, পাকিস্তানের জেনারেলরা, যারা এখন ঐস্লামিকদের সহমর্মীতা দেখাচ্ছেন – তারা এর পরে অভিযোগ করবেন না বিচারক দেরই বিচার করবেন – তা আপাততঃ কেউই বলতে পারছে না.