সিরিয়া প্রসঙ্গে মস্কো ও বেইজিং জাতিসংঘে পশ্চিমী দেশগুলি প্রস্তাবিত ঘোষণাপত্রের বিরূদ্ধে ভেটো দেওয়ার পরে রীতিমতো ঝগড়া হয়েছে. ঐ ঘোষণাপত্র প্রনয়ণ করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানী, গ্রেট বৃটেন ও পর্তুগাল. তাদের প্রস্তাব নামঞ্জুর করা হয়েছে, কারণ সেখানে বলপ্রয়োগের প্রস্তাব ছিল.

রাশিয়া ও চীন গত ৯ মাসে এই নিয়ে ৩ বার সিরিয়া প্রসঙ্গে তাদের ভেটোর অধিকার প্রয়োগ করলো. জাতিসংঘের ইতিহাসে এটা অভূতপূর্ব ঘটনা. আরও অসাধারন ঘটনা হচ্ছে এই, যে মস্কো ও বেইজিং পাশ্চাত্যের ক্রমবর্ধমান চাপ থেকে সিরিয়াকে রক্ষা করতে সমর্থ হচ্ছে, যাতে তারা সিরিয়ার নাগরিকদের হয়ে তাদের ভাগ্য নির্দ্ধারণ করতে না পারে.

ভোটাভুটি হওয়ার ঠিক আগে রাশিয়ার বিদেশমন্ত্রী সের্গেই লাভরোভ মন্তব্য করেছিলেন, যে রাশিয়াকে সব দোষে অভিযুক্ত করা হবে. বাস্তবে তাই ঘটেছে. পশ্চিমী দেশগুলির প্রতিনিধিরা ক্রুদ্ধ মন্তব্য করেছে, যে রাশিয়া ও চীন নাকি সিরিয়ার অধিবাসীদের সাহায্য করতে চায় না. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এমনকি জাতিসংঘকে অগ্রাহ্য করেও বাশার আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করার হুমকি দিয়েছে.

এরকম হুমকিতে মস্কোর প্রতিক্রিয়া তীক্ষ্ণ. পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আলেক্সান্দর লুকাশেভিচের মতে, এরকম হুমকি কোনোমতেই মেনে নেওয়া যায় না ও সিরিয়ার ব্যাপারে সব দোষ রাশিয়ার ওপরে চাপিয়ে দেওয়াও অন্যায্য. তিনি আরও বলেছেন, যে আন্তর্জাতিক প্রশ্নে জাতিসংঘের ভূমিকা অগ্রাহ্য করার প্রয়াস অত্যন্ত সাংঘাতিক. তিনি বিশ্ব জনসমাজের কাছে এই আহ্বাণ জানিয়েছেন, যে ভবিষ্যতে বিভিন্ন বচসায় কে হস্তক্ষেপ করবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার.

চীন অন্যদিকে পশ্চিমী দুনিয়াকে ভারসাম্যহীন ও বিবেচনাহীন ঘোষণাপত্র জাতিসংঘে পাশ করানোর প্রচেষ্টার অভিযোগে দুষেছে. চীনের সরকারী সংবাদসংস্থা ‘সিনহুয়া’ লিখেছে, যে জাতিসংঘে তাদের প্রয়াস বিফল হওয়ার পরে এখন পশ্চিমী কূটনীতিজ্ঞরা চীন ও রাশিয়াকে দোষারোপ করছে, যখন তাদের নিজেদেরকেই দোষারোপ করা উচিত. প্রবন্ধে বলা হয়েছে – লন্ডন ও ওয়াশিংটনে রাজনীতিবিদদের শুধু একমাত্র স্বার্থ ছিলঃ দামাস্কাসের হাত মুচড়ে দেওয়া. তারা সিরিয়ায় বিদ্রোহীদের হিংসাত্মক কার্যকলাপ অবাধে মেনে নিচ্ছে, এমনকি তাদের প্রশ্রয় দিচ্ছে.

সিরিয়া আবার জাতিসংঘকে দ্বিবিভক্ত করে দিয়েছে, ও কেচ্ছার প্রেক্ষাপটে ভয়ানক চিত্রনাট্য রূপায়িত হওয়ার ভয় আছে. পাশ্চাত্য ও সিরিয়ার প্রতিবেশী দেশদের দৃঢ়বিশ্বাস, যে বাশার আসাদের শাসনব্যবস্থার আয়ু ক্ষণস্থায়ী ও তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা জরুরী. বিশেষজ্ঞদের মতে এখন সিরিয়ায় লড়ছে সৌদী আরব ও ইরান. ইরান চেষ্টা করছে আসাদকে সাহায্য করতে, সৌদীরা তাকে হঠাতে. এই প্রসঙ্গে রাজনীতিতত্ত্ববিদ সের্গেই দেমিদেঙ্কো পাশ্চাত্যকে সতর্ক করে দিচ্ছেন.

“সিরিয়ার শাসন ব্যবস্থাকে যেন তেন প্রকারেণ উচ্ছেদ করা ঠিক নয়. সেক্ষেত্রে পৃথিবীতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি কি হবে, তার পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয়. এখন সিরিয়াকে টলানোর চেষ্টা চলছে, যার মুল উদ্যোক্তা সৌদী আরব এবং কাতার, যারা কোনোমতেই নিকট প্রাচ্যে একমাত্র ধর্মনিরপেক্ষ দেশের অস্তিত্ব মেনে নিতে পারছে না”.

যদি বলপ্রয়োগ করে আসাদের শাসনব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়, তাহলে ক্ষমতায় আসবে উগ্রপন্থী ইসলামীরা. আর তারা টার্গেট করবে ইস্রায়েলকে, কারণ এরকম কোনো ইসলামী নেই, যে ইস্রায়েল রাষ্ট্রের অস্তিত্ব মেনে নিতে পারে. উপরন্তু বিশৃঙ্খলার মধ্যে সিরিয়ায় বিশাল পরিমানের রাসায়নিক অস্ত্রশস্ত্র জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদীরা জবরদখল করতে পারে. মস্কোর ইন্টারন্যাশন্যাল রিলেশনশীপ ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ ভেনিয়ামিন পপোভ বলছেন এই প্রসঙ্গে –

“হিংসার তীব্রতার পরিণতি হতে পারে ভয়ঙ্কর. কারণ যদি রাসায়নিক অস্ত্রশস্ত্র জঙ্গীদের হাতে যায়, তাহলে ‘আল-কায়িদা’ সেসব কব্জা করবে. আমার মনে হয়, যে তারা সবার আগে আমেরিকা অথবা ইস্রায়েলের বিরূদ্ধে তা প্রয়োগ করবে. এই আগুন যত শীঘ্র সম্ভব নেভানো দরকার”.

0অন্যদিকে নিকট প্রাচ্যে উত্তেজনা ক্রমশঃ বেড়েই চলেছে. আগুনে ঘি ঢেলেছে বুলগেরিয়ায় ইস্রায়েলী পর্যটকদের উপর সশস্ত্র হামলা. দামাস্কাসে জঙ্গীরা বাশার আসাদের ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষামন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও গোয়েন্দা বিভাগের প্রধানকে হত্যা করার পরেই ঐ ঘটনা ঘটে. এই দুই ঘটনা নিকট প্রাচ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনার তাপমাত্রা কতখানি বাড়ছে, তার প্রমাণ দিচ্ছে.