মার্কিনী ‘টাইম’ পত্রিকার এশীয় ভাষ্যের প্রচ্ছদ ভারতীয় রাজনৈতিক চক্রে রীতিমতো সোরগোল তুলে দিয়েছে. সেখানে মনমোহন সিংয়ের ফোটো, আর নীচে লেখা আন্ডার এ্যাচিভার(যিনি লক্ষসাধন করতে ব্যর্থ হয়েছেন).

এডিটোরিয়্যাল প্রবন্ধ, ভারত যে অর্থনৈতিক সমস্যার মধ্যে আছে, তার উপর মুলতঃ জোর দিয়েছে. লেখকদের মতে, বর্তমান ভারতীয় সরকার বাণিজ্যের স্বার্থ দেখে না. সামাজিক রাজনীতি, যেখানে রাষ্ট্রীয় অনুদানের পরিমান বাড়ানো হয়েছে, তা দেশের কঠিন পরিস্থিতিকে কঠিনতর করে তুলছে. আর পত্রিকাটির মতে মনমোহন সিং মাথাগুঁজে বসে আছেন ও কোনো সংস্কারসাধন করতে চান না, যা তার আমলেই শুরু হয়েছিল. ঐ প্রবন্ধ লেখকদের মতে, এই কারণেই ভারতবাসী সরকার ও তার প্রধানমন্ত্রীর ওপর আস্থা হারিয়েছে.

আমাদের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কির মতে ‘টাইম’ পত্রিকায় প্রকাশিত এই তাজা প্রবন্ধ ভারতে পরিস্থিতি সঠিকভাবে প্রতিফলিত করেছে. তবে, সত্যিই কি প্রধানমন্ত্রীর কর্মকান্ডের বিচার করা ঠিক গত ১ বছরের আমলে, আর সরকারই বা কতখানি দায়ী বর্তমানের কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতির জন্য.

বরিস ভলখোনস্কি বলছেন – যদি ৯০-এর দশক স্মরণ করা হয়, তাহলে তখনও ভারত কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল. ডঃ মনমোহন সিংই অর্থমন্ত্রীর পদে তখন জাতীয় অর্থনৈতিক সংস্কারের ‘পিতা’র ভূমিকা নিয়েছিলেন. ২০০৮-২০০৯ সালেও প্রধানমন্ত্রীর পদে তিনি অন্য অনেক দেশের তুলনায় বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সঙ্কট অতিক্রম করতে সমর্থ হয়েছিলেন নিজের দেশের জন্য.

এখানে মনে করিয়ে দিতে চাই, যে সঙ্কটের উদ্ভব ভারতে হয়নি, হয়েছিল ‘টাইমে’র মাতৃভুমি আমেরিকায়. তার ফলে এখনো পর্যন্ত পশ্চিমী দুনিয়া ভুগছে, বিশেষতঃ ইউরোপ. আর ভারতে অর্থনৈতিক উন্নয়নের হার কমে গেলেও, এখনো আমেরিকা, ইউরোপের থেকে অনেক ওপরে.

অবশ্যই মার্কিনী পত্রিকার বিশ্লেষকরা ভারতের প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে যে কোনো মতামত ব্যক্ত করতে পারে, সমালোচনাও করতে পারে. কিন্তু এইরকম প্ররোচনামুলক প্রবন্ধ ও এরকম প্রচ্ছদ ছাপানোর আসল কারণটা রাজনৈতিক.

এটা খুব ভালো করে বুঝেছে, বিরোধাদল বি.জে.পি. তারা তাদের অন্যতম প্রধান নেতা, গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর স্বপক্ষে প্রচারের জন্য ঐ প্রবন্ধটাকে ব্যবহার করছে. তাকে আগামী লোকসভা নির্বাচনে বি.জে.পির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী পদে মুখ্য প্রার্থী হিসাবে ধরা হচ্ছে. সঙ্কট সত্ত্বেও গুজরাটের অর্থনীতি চমত্কার ফলাফল দেখাচ্ছে, যা জাতীয় অর্থনীতি সম্পর্কে বলা যায় না.

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ওঠে – কেন ঠিক এখন মার্কিনী পত্রিকাটি সোরগোল করলো? আমরা জানি, যে ‘টাইম’ পত্রিকার এডিটোরিয়্যাল বোর্ড দেশের সরকারের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল, এমন নয়, যেমন করে তথাকথিত স্বাধীন ‘সংবাদ মাধ্যম’গুলি প্রচার করে.

বোঝা যাচ্ছে, যে আমেরিকা ভারতের আভ্যন্তরীন রাজনীতির মঞ্চে খেলার চেষ্টা করছে. মনে হচ্ছে, যে ডঃ সিং ও কংগ্রেস পার্টিকে ওয়াশিংটন তাদের আগ্রহের তালিকা থেকে মুছে দিয়েছে. তার মানে বর্তমান বিরোধীদলের সাথে সংযোগ স্থাপণ করা অপরিহার্য. আর প্রধানমন্ত্রীকে খোঁচা দেওয়ার এর চেয়ে মোক্ষম উপায় আর কি হতে পারে?

ভারতের প্রথম সারির সংবাদপত্রগুলি – যেমন, হিন্দু, টাইমস অফ ইন্ডিয়া, বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও হিন্দুস্তান টাইমসের মুখ্য প্রকাশকেরা টাইম পত্রিকায় প্রকাশিত উপোরক্ত প্রবন্ধের বিষয়ে সম্মিলিতভাবে ঘোষণা করেছেন. “পশ্চিমী দেশের পত্রপত্রিকা আমাদের রাষ্ট্রনেতা বা আমাদের মহান জাতি সম্পর্কে কি বলছে, তাতে আমরা আজকাল আর পাত্তা দিই না. আমাদের জাতীয় সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধি হিসাবে আত্মবিশ্বাস অটুট রাখা দরকার. আর আমাদের নাগরিকদের প্রয়োজন সেই যুগ পার হতে, যখন বিদেশ থেকে করা সব মন্তব্যে দেশের ভেতরের মতামতের থেকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো”.