গত রবিবারে পাকিস্তানে আফগানিস্তানে ন্যাটো জোটের সামরিক বাহিনীর প্রধান আমেরিকার জেনারেল জন অ্যালেন এসেছেন. এটা জেনারেল অ্যালেনের গত এক সপ্তাহের কম সময়ের মধ্যে পাকিস্তানে দ্বিতীয় সফর – এর আগের সফর হয়েছিল ২৭শে জুন.

গত বারের মতই, আলোচনার ফলাফল নিয়ে সরকারি ভাবে দেওয়া খবর ছিল খুবই হিসাব করে ও সরাসরি ভাবে প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে করা. বলা হয়েছে গঠনমূলক ভাবে সহযোগিতা বৃদ্ধি করা নিয়ে ইচ্ছা প্রকাশ করা হয়েছে, কিন্তু প্রধান প্রশ্ন: কবে থেকে আন্তর্জাতিক জোটের সামরিক বাহিনীর রসদ পাঠানোর জন্য দক্ষিণের পথ খুলে দেওয়া হবে, তার উত্তর দেওয়া হয় নি. তা স্বত্ত্বেও এক গুচ্ছ বঙ্কিম লক্ষণ দেখে মনে হয়েছে যে, এই আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“সব দেখে শুনে মনে হয়েছে, একটা সমঝোতা এর মধ্যেই কাছে এগিয়ে এসেছে. অন্তত, লিওন প্যানেত্তা নিজের শেষ দিকে করা বক্তৃতায় পাকিস্তানের প্রতি তাঁর সুর নরম করেছেন. যদি আগে তিনি বলে থাকবেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ধৈর্য হারাচ্ছে, তবে এখন তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, দুই দেশের সামনেই রয়েছে একই রকমের আশঙ্কা ও একই সঙ্গে কাজ করা দরকার. আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত শেরি রহমান, যিনি সাময়িক ভাবে ইসলামাবাদে ফিরে এসেছেন, তিনি নিজের প্রশাসনকে বলেছেন যে, মারকিন দেশের প্রশাসনের উচ্চ পদস্থ সরকারি কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়েছে এক রকমের উপায় বের করতে, যাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে গত বছরের নভেম্বর মাসের ঘটনার জন্য অল্প করে ক্ষমা প্রার্থনা করা সম্ভব হয়”.

মনে করিয়ে দেবো যে, দক্ষিণের রসদ যোগানের পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল ন্যাটো জোটের তরফ থেকে বোমা আঘাতে পাকিস্তানের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর ২৪ জন জওয়ানের মৃত্যু হওয়ার পরে. তার পরে পাকিস্তানের তরফ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামনে দুটি শর্ত রাখা হয়েছিল: এই ঘটনার জন্য ক্ষমা চাইতে হবে ও পাকিস্তানের উপরে সম্পূর্ণ ভাবে ড্রোন হামলা করা বন্ধ করতে হবে. তারই সঙ্গে পাকিস্তান সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, তাদের এলাকা দিয়ে মাল ট্রানজিটের জন্য ২০ – ২৫ গুণ দাম বাড়িয়ে প্রতিটি মালবাহী ট্রাকের জন্য পাঁচ হাজার ডলার করে নেওয়া হবে. এর একটি শর্তও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মানতে চায় নি.

গত কয়েক দিন ধরে খবর পাওয়া যাচ্ছে যে, পাকিস্তানের পথ দিয়ে রসদ পাঠানোর পথ বন্ধ হওয়াতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতি হচ্ছে আগে যতটা বলা হয়েছিল, তার চেয়ে অনেক বেশী. জুন মাসের মাঝামাঝি মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী লিওন প্যানেত্তা দেশের সেনেটকে জানিয়ে ছিলেন যে, আফগানিস্তানের উত্তরের প্রতিবেশী দেশ গুলির মধ্যে দিয়ে মাল পাঠানোর জন্য মাসে প্রায় ১০ কোটি ডলার বেশী খরচ হচ্ছে. কিন্তু পেন্টাগনের নতুন দলিল বলেছে অনেক বেশী অর্থের কথা: সেই গুলি অনুযায়ী এই পথ বন্ধ করে দেওয়া জন্য ক্ষতির পরিমান ইতিমধ্যেই হয়েছে ২১০ কোটি ডলার.

নিজেদের পক্ষ থেকে পাকিস্তানও কিছু কম ক্ষতিগ্রস্ত হয় নি এই মাল পাঠানো তাদের দেশের মধ্যে দিয়ে বন্ধ হওয়ার জন্য, - আর আফগানিস্তান থেকে ন্যাটো জোটের সেনা বাহিনী ২০১৪ সালের শেষের আগে বের হয়ে যাওয়ার সময়ে আরও বেশী করেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে. পাকিস্তানের ট্রাক চালকরা ইতিমধ্যেই তাদের পক্ষ থেকে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন, সীমান্তবর্তী এলাকার ব্যবসা দাররা, যারা এই মার্কিন অনুপ্রবেশের সময়ে নিজেরা প্রভূত পরিমানে ন্যাটো জোটের ট্রানজিটের জন্য লাভ করে ফেলেছেন, তারাও নিজেদের অসন্তোষ বহু স্থানীয় প্রশাসকের একই কারণে উদ্ভূত অসন্তোষের সঙ্গে একত্রে প্রকাশ করেছে.

আমেরিকা – পাকিস্তান আলোচনায় সুর নরম করার ওপরের কারণ হতে পারে সম্ভবতঃ পাকিস্তানে প্রধানমন্ত্রী বদল হওয়া ও প্রশাসনে বদল হওয়া, এই কথা মনে করে বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এটা দুই পক্ষকেই আবার সাদা পাতা থেকে আলোচনা শুরু করতে সাহায্য করেছে. আর এর মধ্যেই মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব হিলারি ক্লিন্টন নব নির্বাচিত পাক প্রধানমন্ত্রী রাজা পারভেজ আশরাফ কে ফোন করে তাঁর আশা প্রকাশ করেছেন যে, সম্পর্ক ভাল হবে.

এটা সত্যি যে, যখন বাজী ধরা থাকে অনেক অর্থের, তখন দুই পক্ষই সম্পর্ক খারাপ হওয়া থেকে অনেক ক্ষতি গ্রস্ত হয়, তাই এই কানাগলি থেকে বের হওয়ার একমাত্র পথ – দুই দেশের থেকেই স্বার্থ বিচার. কিন্তু নিজেদের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের সামাজিক মতামতের বিষয় নিয়ে কি করা যেতে পারে, যা প্রতিবেশী আফগানিস্তানে আমেরিকার অপারেশনের বছর গুলিতে একেবারে খোলাখুলি ভাবেই আমেরিকা বিরোধী মনোভাবের উত্পত্তি করেছে”?

কিছু দিন আগের এক সামাজিক মূল্যায়ন, যা আমেরিকার “পিউ” গবেষণা কেন্দ্র থেকে করা হয়েছে, তাতে দেখা গিয়েছে যে, শতকরা ৮০ ভাগ পাকিস্তানের মানুষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব নিয়ে আছেন. তার মধ্যে শতকরা ৭৪ ভাগ মনে করেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শত্রু, আর শতকরা ৬০ শতাংশ – রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামাকে বিশ্বাস করেন না. এক তৃতীয়াংশের বেশী পাকিস্তানী (শতকরা ৩৫ ভাগ) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ভাল হওয়ার দরকার আছে বলে মনে করেন না.

এটাও সত্যি যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বহু বছর ধরে সেই জায়গার সংবাদ মাধ্যমের প্রচেষ্টার ফলে পাকিস্তানের সম্বন্ধে যে ধারণা তাদের দেশে তৈরী করতে পেরেছে, তা হল এক “রাষ্ট্র পরিচিতি নষ্ট” করার মুখে কোন রকমে ভারসাম্য রক্ষা করতে চেষ্টা করা দেশ বলে, যাদের সঙ্গে কথা বলা দরকার শুধু শক্তির অবস্থান থেকেই.

সুতরাং ওয়াশিংটনের পক্ষে এই নেতিবাচক মানসিকতা দুই দেশের সমাজের মধ্যে থেকেই সমূলে উত্খাত করা (যেমন, আমেরিকায় পাকিস্তানের প্রতি, তেমনই পাকিস্তানে আমেরিকার প্রতি) শুধু পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন শক্তির প্রতিনিধি দের সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে ও সেখানের ব্যবসাদারদের দিকে কিছু সুযোগ ছুঁড়ে দিয়ে মনে তো হয় না যে, করা সম্ভব হবে. এই সমস্যা অনেক গভীরে. আর শুধু পরপর সফর দিয়ে, টেলিফোন করে ও প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়ে মনে তো হয় না যে, তার সমাধান হতে পারবে.