ন্যাটো জোট খুবই “গভীর মনোযোগ দিয়ে নিজেদের দক্ষিণ- পূর্ব সীমান্তে পরিস্থিতি দেখবে”. এই বিষয়ে ঘোষণা করেছেন আঙ্কারার উদ্যোগে আয়োজিত সিরিয়া নিয়ে ন্যাটো জোটের জরুরী বৈঠকের পরে সাংবাদিক সম্মেলনে সাধারন সম্পাদক আন্দ্রেস ফগ রাসমুস্সেন. এই উদ্যোগের কারণ হয়েছিল সিরিয়ার পক্ষ থেকে তুরস্কের বিমান বাহিনীর একটি যুদ্ধ বিমানকে ধ্বংস করার ঘটনা.

তুরস্কের নেতৃত্ব প্রমাণ করতে চেয়ে বলেছে যে, এই বিমানটি আন্তর্জাতিক আকাশ সীমায় ধ্বংস করা হয়েছে. তাই এটাই কারণ হয়েছে ন্যাটো জোটের সভার কাছে এই প্রসঙ্গ উত্থাপন করার. তারই মধ্যে সিরিয়ার সামরিক বাহিনীর কারণ অনুযায়ী এই যুদ্ধ বিমানটি ধ্বংস করা হয়েছে সিরিয়ার জল সীমাতেই. এখানে লক্ষ্যণীয় হল যে, তুরস্কের সরকার শেষ অবধি এই সম্ভাবনা বাদ দেয় নি যে, বিমানটি তাও সিরিয়ার আকাশে ঢুকে থাকতেই পারে. রাষ্ট্রপতি আবদুল্লা গুল ঘোষণা করেছেন যে, “এটা যুদ্ধ বিমানের জন্য খুবই স্বাভাবিক ও বাস্তব ব্যাপার – মাঝে মধ্যে সীমা পার হয়ে ঢুকে পড়া ও বেরিয়ে যাওয়া, বিশেষ করে যদি এই ধরনের বিমানের সমুদ্রের উপরে গতি বেগের কথা চিন্তা করে দেখা হয়”.

সামরিক বিশেষজ্ঞরা অবশ্য অন্য রকমের মত পোষণ করেন. যদি কোন না কোন দেশের বিমান বাহিনীর যুদ্ধ বিমান কোন দেশের আকাশ সীমা লঙ্ঘণ করে, তবে এই ধরনের কাজের ধারা একেবারেই “স্বাভাবিকের” থেকে অনেক দূরে.

তার ওপরে, এই ঘটনার কিছু খুঁটিনাটি বলে দেয় যে, তুরস্কের ফ্যান্টম খুব সম্ভবতঃ মোটেও সিরিয়ার আকাশ সীমা “একটু আধটু” লঙ্ঘণ করে নি. এই কথা উল্লেখ করে ভূ- রাজনৈতিক সমস্যা একাডেমীর উপ সভাপতি কনস্তানতিন সিভকভ বলেছেন:

“এখানে বাদ দেওয়া যেতে পারে না যে, তুরস্কের বিমান রকেট লঞ্চিং ব্যবস্থা “পান্তসির” দিয়ে ধ্বংস করা হয়েছে. এই ধরনের ব্যবস্থার স্বয়ংক্রিয় কাজের ব্যবস্থা রয়েছে. রকেটের ধ্বংস করার ক্ষমতা থাকে ১২ কিলোমিটার অবধি. কামানের – প্রায় ২ কিলোমিটার. স্বয়ংক্রিয় ভাবে কাজ করার সময়ে কি ব্যবহার করে ধ্বংস করা হবে, তা যন্ত্র নিজে থেকেই স্থির করে: যদি লক্ষ্য থাকে দূরে, তবে রকেট ব্যবহার করা হয়, আর যদি কামানের গোলার দূরত্বে পৌঁছায় তবে কামানের গোলাই ব্যবহার হয়. তুরস্কের ফ্যান্টমের ক্ষেত্রে কথা হয়েছিল যে, এটিকে ধ্বংস করা হয়েছে কামানের আগুন দিয়েই. “পান্তসির” এই ক্ষেত্রে কাজ করেছে, নাকি করে নি, তা গুরুত্বপূর্ণ নয়, যে কোন ক্ষেত্রেই ছোট ক্যালিবারের বিমান বিরোধী কামানের গোলার দূরত্ব ২, ৫ কিলোমিটারের বেশী হয় না আর উচ্চতার ক্ষেত্রে আঘাতের ক্ষমতা থাকে খুব বেশী হলে দেড় কিলোমিটারের মধ্যেই. এই ক্ষেত্রে বোঝা দরকার যে, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও তার মধ্যে “পান্তসির” জলের এত কাছে থাকে না যে, তাদের চাকায় ঢেউ এসে লাগে. সাধারণতঃ জলের ধার থেকে এক কিলোমিটার দূরেই এই গুলি রাখা হয়. এই সবই বলে দেয় যে, তুরস্কের বিমান সিরিয়ার জল সীমা পেরিয়ে খুবই ভেতরে চলে এসেছিল. তার ওপরে, এই জায়গায় সেটা এসেছিল একাধিকবার, যা বিমানের উড়ানের ছকে দেখানো হয়েছে.

আসলে এই ধরনের ইতিহাস নতুন কিছু নয়. সেই সোভিয়েত দেশের সময় থেকেই আমেরিকার গুপ্তচর বিমান প্রায়ই সোভিয়েত দেশের আকাশ সীমা লঙ্ঘণ করত. শুধু সেই ১৯৭০ সাল অবধিই ধ্বংস করে দেওয়া আমেরিকার গুপ্তচর বিমানের সংখ্যা ছিল ২৮৩”.

কিন্তু সিরিয়ার সীমান্তের ভিতরে তুরস্কের বিমান কি করছিল? এই প্রশ্নের উত্তর প্রাথমিক ভাবে বিমানের মডেল থেকেই পাওয়া যায়, যা সিরিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনী ধ্বংস করেছে. আর এফ – ৪ ই – এটা গুপ্তচর বিমান. আর খুবই সম্ভবতঃ যে, সেটি সিরিয়ার আকাশ সীমা আচমকাই লঙ্ঘণ করে নি. এই প্রসঙ্গে লেবাননের সামরিক বিশ্লেষক আমিন হ্টেইট বলেছেন:

“বর্তমানের ঘটনাকে কোন ভাবেই এর আগের ঘটনা পরম্পরার সঙ্গে আলাদা করে দেখা যেতে পারে না. মনে করিয়ে দিতে চাই যে, গত সপ্তাহে সিরিয়ার এক যুদ্ধ বিমানের পাইলট একটা “মিগ- ২১” বিমান নিয়ে জর্ডনে পালিয়ে গিয়েছে. কাজেই তুরস্ক, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল তার কাছ থেকে সমস্ত তথ্যই পেয়েছিল, যা তাদের দরকার, তার মধ্যে সিরিয়ার বিমান বাহিনী যে ধরনের সাঙ্কেতিক কোড ব্যবহার করে, সেই গুলিও. এটা পাওয়ার পরে অংশতঃ, অন্য দেশের বিমান বাহিনী বিনা বাধায় সিরিয়াতে ঢুকে পড়তে পারে সেই “নিজের – পরের” নামের পরিচয়ের ব্যবস্থা পার হয়ে”.

বিশেষজ্ঞ উল্লেখ করেছেন যে, যাদের মাথায় ঢুকেছিল সিরিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কতটা শক্ত তা পরীক্ষা করে দেখার, তাদের হয়ত, এবারে “মাথা ঠাণ্ডা” হবে. দামাস্কাসের বিরুদ্ধে সামরিক অপারেশনের মতলবও হয়তো কমবে. সিরিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা খুবই কর্মক্ষম.

যদি এই বিষয়ের রাজনৈতিক দিকটি নিয়ে বলা হয়, তবে সিরিয়ার সামরিক বাহিনীর লোকদের আগ্রাসী বলে দেখানোর জন্য এই উদাহরণে চলবে না. ন্যাটো জোটের সভা যারা আজ আঙ্কারার উদ্যোগে জড়ো হয়েছে তারা রাজী শুধু দামাস্কাসকে সমালোচনা করতে. কিন্তু জোটের সাধারন সম্পাদক যেমন ঘোষণা করেছেন যে, ওয়াশিংটন চুক্তির পঞ্চম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সামগ্রিক ভাবে প্রতিরক্ষার নীতি এই সভায় আলোচনা করা হয় নি. অর্থাত্ এই বিমানের ঘটনা সিরিয়াতে আক্রমণের বিষয়ে শুরু করার কারণ হবে না. আর তাও কি যেন একটা আগে থেকেই পূর্বাভাস দিচ্ছে যে, এই আচমকা ঘটা সব ঘটনা দিয়ে সিরিয়ার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কতটা শক্তিশালী তা পরীক্ষা করার ব্যাপার – বোধহয় এবারে শেষবার নয়.