প্রিয় শ্রোতারা, শুরু করছি আমাদের সাপ্তাহিক অনুষ্ঠাণ – 'রাশিয়ার আদ্যপান্ত' .

এই অনুষ্ঠানটি সংকলন করেছেন নিনা রুকাভিশনিকোভা, আর গ্রন্থনায় ল্যুদমিলা পাতাকি ও কৌশিক দাস .

এই অনুষ্ঠাণে আমরা রাশিয়া সম্পর্কে আপনাদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়ে থাকি .

সেইজন্যেই আমরা ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও মরিশাসের শ্রোতাদের অনুরোধ করছি যত বেশি সম্ভব প্রশ্ন পাঠাতে . আমাদের অনুষ্ঠানের শরিক হোন .

আর আমরা চেষ্টা করবো আপনাদের সব প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর দিতে .

আজ আমরা ভারতের ছত্তিশগড় রাজ্যের সোনপুরী থেকে চুনীলাল কেভার্তার অনুরোধ মতো উনবিংশ শতাব্দীর সুবিদিত রুশী পর্যটক ইভান ক্রুজেনষ্টেরনের সম্পর্কে জানাবো .

আর সেইসাথেই উত্তর দেব উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের ইসলামপুর থেকে সামসুদ্দিন সাকির পাঠানো প্রশ্নের – রাশিয়ার ভূখন্ডে ডাইনোসররা বাস করতো কিনা .

 

অতএব এখন প্রখ্যাত রুশী সামুদ্রিক অভিযাত্রী, বিজ্ঞানী, রুশী ওশিওনোলজির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, সেন্ট - পিটার্সবার্গের বিজ্ঞান অ্যাকাডেমির সম্মানীয় সদস্য অ্যাডমিরাল ইভান ক্রুজেনষ্টেরনের বৃত্তান্তে আসি . ইভান ক্রুজেনষ্টেইন জন্মগ্রহণ করেছিলেন গরীব অভিজাত পরিবারে ১৭৭০ সালে . ১৪ বছর বয়সে তিনি সামুদ্রিক পলিটেকনিকে ভর্তি হন . যেহেতু তুরস্কের সাথে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তাই তাকে মেয়াদের আগেই ডিগ্রি পেতে হয় . তারপর শুরু হয়েছিল সুইডেনের সাথে যুদ্ধ . তখন রাশিয়ায় নেভি - অফিসারদের রীতিমতো ঘাটতি ছিল . কিশোর ইভান ক্রুজেনষ্টেরন রুশ - সুইডিশ সব লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করেছিলেন ও সামুদ্রিক যুদ্ধে তিনি কয়েকবার অদ্বিতীয় দক্ষতা প্রদর্শন করেছিলেন .

সাহসী, স্বতঃস্ফূর্ত, বলিষ্ঠ অফিসারকে ব্যতিক্রমী হিসাবে নজরে রাখা হয়েছিল . যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে সামুদ্রিক পলিটেকনিকের একদল স্নাতকদের সাথে তাকেও উচ্চশিক্ষা লাভ করার জন্য ইংল্যান্ড পাঠানো হয় . ইংরেজ জাহাজে চড়ে ক্রুজেনষ্টেরন আমেরিকা, আফ্রিকা, বারমুডা, ভারত ও চীন সফর করেছিলেন .

কি করে তিনি ভারতে গেছিলেন ? ইংরেজরা পছন্দ করতো না তাদের প্রধান কলোনিতে রুশীদের যাতায়াত .

১৭৯৬ সালে ইভান ঝুঁকি নিয়েছিল ভারতগামী ইংরেজ জাহাজ ‘ ওয়াজিস ’ জাহাজে সওয়ার হতে . ব্যাপারটা হচ্ছে এই, যে ঝড়ে জাহাজটার বডি রীতিমতো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, তার বডিতে বিশাল পাথর গেঁথে গিয়েছিল . ঐ পাথর বের করা যেত শুধু কোলকাতা বন্দরে . জাহাজের খোল জলে ভর্তি হয়ে যাচ্ছিল . বোধহয় সেইকারণেই ইংরেজরা রুশী অফিসারকে সাথে নিয়েছিল ভারত যাওয়ার জন্য . তবে পথ অতিক্রম করেছিলেন তারা নিরাপদে . ইভান ক্রুজেনষ্টেরন মাসদুয়েক কোলকাতায় ছিলেন, তারপরে রওনা দিয়েছিলেন চীনে .

ভারতে ও চীনে তিনি সামুদ্রিক বাণিজ্য, যা ইংরেজরা ঐ সব দেশে করতো, তা মনোযোগ সহকারে অনুধাবন করেছিলেন . জাহাজে পণ্যদ্রব্য পরিবহনে মুনাফা ছিল পরিস্কার বোধগম্য . রাশিয়া কিন্তু চীনে পণ্যদ্রব্য রপ্তানী করতো স্থলপথে . রাশিয়ায় ফিরে এসে ইভান সরকারের ঠিকানায় চিঠি লিখেছিলেন রুশ নেভিকে জোরদার করা ও সামুদ্রিক বাণিজ্য বাড়ানোর জন্য . কিন্তু সরকার কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি . তবে প্রাসাদ অভ্যুত্থানের পরে যখন ক্ষমতায় এলেন আলেক্সান্দর - ১, তখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হল নৌপথে পৃথিবী পরিক্রমা করার ‘নাজেঝদা’ ও ‘নেভা’ নামক দুটি জাহাজে . ঐ অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন ইভান ক্রুজেনষ্টেরন . তখন তার বয়স ৩৩ বছরও পার হয়নি .

‘নাজেঝদা’ ও ‘নেভা’ জাহাজ তখনকার রাজধানী সেন্ট - পিটার্সবার্গের অনতিদূরে ক্রোনশ্টাড বন্দর থেকে যাত্রা করেছিল ১৮০৩ সালের ২৬শে জুলাই . জাহাজদুটি আটলান্টিক মহাসাগর অতিক্রম করে লাতিন আমেরিকার শেষ পর্যন্ত পৌঁছে, প্রশান্ত মহাসাগরে ঢুকেছিল . কামচাতকা ও জাপানে তারা ছিল, তারপরে পুরো ভারত মহাসাগর অতিক্রম করেছিল, ভারতীয় কোনো বন্দরে না গিয়েই . তারপরে আফ্রিকার দক্ষিণ ঘুরে আবার ক্রোনশ্টাড বন্দরে ফিরেছিল . গোটা অভিযান প্রায় ৩ বছর ধরে চলেছিল .

প্রথম রুশী পৃথিবী পরিক্রমা অভিযান সারা বিশ্বের মনোযোগ আকর্ষন করেছিল, কারণ বহু বৈজ্ঞানিক কাজ করা হয়েছিল . রুশী নাবিকরা ইংরেজদের মানচিত্র, যা সেসময় সবচেয়ে সঠিক বলে গণ্য করা হতো, তা শুধরেছিল . ক্রুজেনষ্টেরন ও তার সহকর্মী ক্যাপটের লিসানস্কি বহু নতুন দ্বীপ আবিস্কার করেছিলেন এবং ইংরেজদের মানচিত্রে যে সব দ্বীপের চিত্র ছিল, যাদের বাস্তবে অস্তিত্ব নেই, তাদের ছেঁটে দিয়েছিলেন . ওরা দুজনে মিলে তিনখন্ডের বই লিখেছিলেন পৃথিবী পরিক্রমার বিষয়ে .

১৮১২ সালে যখন নেপোলিয়ন রাশিয়া আক্রমণ করেছিল, ইভান ক্রুজেষ্টরন তখন গণ প্রতিরোধ বাহিনীর জন্য এক - তৃতীয়াংশ তার সম্পদ দান করেছিলেন .

যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে তিনি বহু সামুদ্রিক অভিযান সংগঠনের ক্ষেত্রে বিপুল অবদান রেখেছেন . যেমন, বেলিনস্টাউজেনা ও লাজারেভায় অভিযান, যার ফলশ্রুতিতে নতুন মহাদেশ আবিস্কৃত হয়েছিল – আন্টার্কটিকা .

ইভান ক্রুজেনষ্টারনের মৃত্যু হয় ১৮৪৬ সালে . তার পুত্র ও নাতিও ছিল পর্যটক .

তাঁর নামে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ১৩টি ভৌগলিক কেন্দ্রের নামকরন করা হয়েছে .

এটাই শেষ নয়, বরফ ভাঙা জাহাজ ক্রুজেনষ্টেরন প্রত্যেকবছর শীতকালে সেন্ট - পিটার্সবার্গের কাছে ফিন উপসাগরে বরফ কাটে . তবে ক্রুজেনষ্টেইনের নামে সবচেয়ে বিখ্যাত জাহাজ হচ্ছে পালতোলা . এটা রুশী নেভির শিক্ষামুলক মাছধরা জাহাজ . ২০০৯ সালে ভারতের কোচি থেকে ঐ পালতোলা জাহাজটি সামুদ্রিক অভিযানে গিয়েছিল . সুতরাং ভারতীয়রা ঐ জাহাজটিকে দেখেছে .

জানা গেছে, যে ২০১৪ সালে সোচিতে শ্বেত অলিম্পিক চলাকালে ঐ জাহাজটি সেখানে যাবে . ইভান ক্রুজেনষ্টারনের নাম আমাদের শ্রোতারা বহুবার শুনবে .

সামসুদ্দিন সাকিকে রাশিয়ার বিষয়ে আমাদের আগ্রহদ্দীপক প্রশ্ন পাঠানোর ব্যাপারে চাম্পিয়ন বলে গণ্য করা যেতে পারে . সে এমনকি প্রশ্ন করেছে রাশিয়ায় ডাইনোসররা বাস করতো কিনা . এবার আমরা তার উত্তর দেব .

রাশিয়ার পত্র পত্রিকায় মাঝেমাঝেই ডাইনোসরের কঙ্কাল খুঁজে পাওয়ার খবর পাওয়া যায় . বছর দুয়েক আগে বৈকাল হৃদ উপকূলবর্তী সাইবেরিয়া থেকে খবর এসেছিল, যে দুটো ছোটো মাপের ডাইনোসরের কঙ্কাল আবিস্কৃত হয়েছে, যাদের তিনটে করে আঙুল ছিল ও গায়ে পালক ছিল . তারা ১৫ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে বাস করতো .

আর ১০ বছর আগে প্রায় সব রুশী সংবাদ মাধ্যম আমুর রাজ্যে সোরগোল তোলা ডাইনোসর সম্পর্কে জানিয়েছিল . তার দৈর্ঘ্য ১০ মিটার এবং কঙ্কাল পুরো অক্ষত রয়েছে .

পশুতত্ত্ববিদ, জিওলজিস্ট ইউরি বলতস্কির দৌলতেই ঐ ডাইনোসরকে আবিস্কার করা গেছিল . এই উপলক্ষ্যে ‘ বিংশ শতাব্দীর রহস্য ’ পত্রিকায় বড় প্রবন্ধ প্রকাশ করা হয়েছিল . ইউরি স্কুলে পড়বার সময়েই ডাইনোসরদের নিয়ে চর্চা শুরু করেন . শৈশবের আগ্রহ পরে তাকে পশুতত্ত্ববিদে পরিণত করেছিল . তিনি বিশ্বাস করতেন, যে কোনো একদিন ডাইনোসরের কঙ্কাল খুঁজে পাবেন . এবং তার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছে .

তার জন্ম, বেড়ে ওঠা ও উচ্চশিক্ষা প্রাপ্তি ভোলগা নদীর তীরবর্তী ইরাস্লাভল শহরে . আর কাজ করতে ও পি . এইচ . ডি . করতে তিনি যান দূরপ্রাচ্যের অন্তর্গত আমুর রাজ্যে . একদিন তার বন্ধু জিওলজিস্ট ২টি প্রাচীন হাড় নিয়ে আসে ও জানায় কোথায় ওগুলো খুঁজে পেয়েছে . বিশেষজ্ঞ ইউরি বলতস্কি তত্ক্ষণাত বুঝতে পেরেছিলেন, যে ওগুলো ডাইনোসরদের হাড় .

ঐ এলাকায় সন্ধান অভিযান সংগঠণ করা হলো, দীর্ঘদিন ধরে ডাইনোসরের হাড় খোঁজা হল . সেই অবিস্মরণীয় দিনে অভিযাত্রীরা যখন চা পান করছিল, তখন অভিযাত্রী ইভান উত্তেজিতভাবে ছুটে এসে বলে – আমি ডাইনোসরের আঙুল খুঁজে পেয়েছি . ওটা অবশ্য আঙুল ছিল না, আর ল্যাজের কাছের মেরুদন্ডের টুকরো . তারপরে শুরু হল দীর্ঘদিনের কাজ . ঐ প্রাগৈতিহাসিক জন্তুটির দেহ মাটির ভেতরে সাড়ে ছয় কোটি বছরেরও বেশি দিন ছিল, সুতরাং সেটা শুকিয়ে গিয়ে ধুলোয় পর্যবসিত হয়েছিল . প্রয়োজন ছিল প্রত্যেকটি হাড় বিশেষ তরল আঠা দিয়ে মজবুত করা, য়াতে ইতিহাসের জন্য তাকে রক্ষা করা যায় .

পর পর ৩ বছর গ্রীস্মকালে খননকার্য চালানো হয়েছিল . রুশী বিজ্ঞানীদের সাথে যুক্ত হল বেলজিয়ামের বিশেষজ্ঞরা . একটা সময়ে বিজ্ঞানীরা রীতিমতো নার্ভাস হয়ে গেছিলেন . দেখা গেল, যে ডাইনোসরটির দেহ দুটি শহরের মধ্যে সংযোগকারী সড়কের নীচে আড়াআড়ি পড়ে আছে, যেখানে তখন পীচ ঢালা হচ্ছিল . বিজ্ঞানীরা বহুকষ্টে শ্রমিকদের পীচঢালা কয়েক মিটার দূরে সরিয়ে নিতে রাজি করাতে সমর্থ হয়েছিলেন .

অবশেষে খুঁজে পাওয়া গেল জন্তুটির করোটি . এটা সৌভাগ্য, কারণ সাধারনতঃ বিজ্ঞানীরা আবিস্কার করে ডাইনসরের কঙ্কালের টুকরো . কুন্দুর রেলষ্টেশনের কাছে ঐ এলাকা পৃথিবীর ১০টি বৃহত্তম ডাইনোসরদের কবরখানার একটি . বিজ্ঞানীরা এখনো বহুকাল ধরে সেখানে খননকার্য চালাবেন .

'রাশিয়ার আদ্যপান্ত' অনুষ্ঠাণটি এখানেই শেষ করছি . আমরা রাশিয়া প্রসঙ্গে আপনাদের নতুন নতুন প্রশ্ন ও চিঠির অপেক্ষায় থাকবো . ইন্টারনেটে আমাদের ঠিকানা – Letters a RUVR. ru