পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী নিয়ে স্ক্যান্ডাল চলছে আর শুক্রবারে সন্ধ্যা বেলায় স্থির হওয়া পাকিস্তানের লোকসভার জরুরী বৈঠকে এই নিয়ে ভোট দানের পরে তা শেষ হবে বলে তো মনে হচ্ছে না. অন্তর্বর্তী কালীণ লোকসভা নির্বাচন ও রাজনীতির মঞ্চ থেকে শেষ বারের মতো বর্তমানের মন্ত্রীসভা ও তার সঙ্গে রাষ্ট্রপতি আসিফ আলি জারদারির বিদায় এখন অনেকটাই বাস্তব বলে মনে হচ্ছে.

এই বৃহস্পতিবারে সকালেও মনে হয়েছিল যে, এই স্ক্যান্ডালে একটা হাঁপ নেওয়ার মতো সময় এসেছে – তা সে সাময়িক হলেও সেটা হয় অন্তর্বর্তী কালীণ, নয়তো সময় মতো লোকসভা নির্বাচন পর্যন্ত স্থিতিশীল হবে. কিন্তু তার পরেই যখন পাকিস্তানের সুপ্রীম কোর্ট রায় দিয়েছিল যে, ইউসুফ রেজা গিলানি প্রধানমন্ত্রীর পদে থাকতে পারবেন না, কারণ এপ্রিল মাসে আদালত অবমাননার দায়ে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে, তখনই ক্ষমতাসীন জোট খুবই দ্রুত খালি হয়ে যাওয়া পদের জন্য নিজেদের তরফ থেকে প্রার্থী দিয়েছিল বর্তমানের টেক্সটাইল শিল্প মন্ত্রী মাখদুম শাহাবুদ্দিন কে. কিন্তু তিনি যখনই তাঁর প্রার্থী পদে নাম রেজিস্টার করতে গিয়েছিলেন, তার পরেই রাওয়ালপিন্ডি কোর্ট থেকে তাঁর নামে বেল অযোগ্য গ্রেপ্তারী পরোয়ানা জারী করা হয়, কারণ তাঁর নামে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে ২০১০- ১১ সালে দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রী থাকাকালীণ বিদেশ থেকে এফিড্রিন আমদানী করার উপযুক্ত ছাড়পত্র প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রেজা গিলানির ছেলে আলি মুসা গিলানির পেটোয়া দুটি কোম্পানীকে দেওয়ার জন্য. একই সঙ্গে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা এবারে জারী করা হয়েছে আলি মুসা গিলানির নামেও. এই প্রসঙ্গে রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এখানে বলা কঠিন হবে আইনের নজর থেকে মাখদুম শাহাবুদ্দিনের নামে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা দেওয়া কতখানি ঠিক হয়েছে, আর তার কতটা স্পষ্টই রাজনৈতিক ভাবে উদ্দেশ্য প্রণোদিত, কিন্তু সেই ব্যস্ততা, যার মধ্যে দিয়ে আদালত এই পরোয়ানা জারী করেছে, তা থেকে বলা যেতে পারে যে, এটা রাজনৈতিক স্বার্থ সাধনের জন্যই পরিস্থিতি তৈরী করার উদ্দেশ্য করা হয়েছে. যাই হোক না কেন, ক্ষমতাসীন পাকিস্তান পিপলস্ পার্টি ও তাদের জোটের দল গুলি বাধ্য হয়েছিল বাড়তি প্রার্থী প্রস্তাব করতে. তিনি হলেন ২০১১ সালে মন্ত্রীসভা থেকে বাদ পড়া জল সম্পদ ও জ্বালানী মন্ত্রী রাজা পারভেজ আশরাফ”.

আশরাফ ছাড়াও নিজেদের প্রার্থী পদে রেজিস্টার করেছেন তথ্য মন্ত্রী কামার জামরান কাইরা, বিরোধী পক্ষের প্রতিনিধি মুসলিম লীগের মেহতাব আব্বাসী, ঐস্লামিক জামিয়াত উলেমা-এ-ইসলাম দলের নেতা মৌলানা ফজল-উর-রহমান. কিন্তু লোকসভায় সদস্য সংখ্যার দিক থেকে গরিষ্ঠতার বিচারে ক্ষমতাসীন জোট থাকায় বিরোধী পক্ষের এই ক্ষেত্রে জয় প্রথম থেকেই অবাস্তব বলে মনে হয়েছে.

প্যারাডক্স মনে হলেও বাস্তব হল: নতুন প্রার্তী প্রস্তাব করার অব্যবহিত পরেই পাকিস্তান ও বিশ্বের সংবাদ মাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়ে গিয়েছিল মন্ত্রী থাকা কালীণ দুর্নীতি সংক্রান্ত অপরাধ নিয়ে জল্পনা কল্পনা. আর এর অর্থ হল, এই স্ক্যান্ডাল চলবে এমন সমস্ত রকমের সুযোগ রয়েছে – আর তা হবে নতুন প্রার্থীর সম্বন্ধেও. বরিস ভলখোনস্কি এই বিষয়ে বলেছেন:

“বর্তমানের পাকিস্তানের জন্য দায়িত্ব শীল পদে থাকা লোকদের দুর্নীতি খুবই সাধারন ব্যাপার. আর ক্ষমতাসীন দলে যে একজনও অকলঙ্ক নেতা বের করা সম্ভব হচ্ছে না, তাও খুবই দেখানোর মতো. কিন্তু প্রশ্ন ওঠে: যদি সমস্ত প্রাক্তন, বর্তমান নেতা ও তাঁদের আত্মীয় বর্গের সম্বন্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অনেক দিন ধরেই ছিল, তবে হঠাত্ এখনই কেন এই অভিযোগ গুলিকে নিয়ে বিচারক বর্গ সক্রিয় হয়ে উঠলেন, বিশেষ করে যখন এই ব্যক্তিরা সবে মাত্র প্রকাশ্য রাজনীতির “সামনের সারিতে” এসে দাঁড়িয়েছেন? এর জন্য ব্যাখ্যা হতে পারে মাত্র দুটি: হয় দুর্নীতি এত গভীরে ক্ষমতার অলিন্দে ঢুকে গিয়েছে যে, যারা নেপথ্যে রয়েছেন,, তাঁদের দুর্নীতি নিয়ে অভিযোগ আনলে, সেটা হবে ভোমরার চাকে ঢুকে ভ্রমরের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা অথবা প্রাথমিক ভাবে এই সমস্ত আইন সঙ্গত বলে কাজ কর্ম দেখানোর চেষ্টা হলেও তা আসলে প্রশাসন ও বিচার বিভাগের মধ্যে পাকিস্তানে বহু দিন ধরে চলে আসা লড়াইয়ের প্রকাশ মাত্র”.

যদি দ্বিতীয় ধারণা ঠিক হয়, তবে বর্তমানের সঙ্কট শেষ হবে না রাজা পারভেজ আশরাফ প্রধানমন্ত্রী পদে স্বীকৃতী পাওয়ার পরেও অথবা যে কেউ অন্য ব্যক্তি এই পদে সাময়িক ভাবে নিযুক্ত হওয়ার পরেও, তাই বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“আসলে প্রশাসনের বিরুদ্ধে সমস্ত লড়াইয়ের মূল লক্ষ্য হচ্ছে রাষ্ট্রপতি আসিফ আলি জারদারি, কোনও প্রধানমন্ত্রী বা আলাদা মন্ত্রী নন, আর সব দেখে শুনে মনে হয়েছে যে, এই লড়াইয়ের লক্ষ্য শীঘ্রই সাধিত হবে: অন্তত, যদি মাস দুয়েক আগেও অন্তর্বর্তী কালীণ নির্বাচনের প্রসঙ্গ ছিল পরিস্থিতির সম্ভাব্য পরিবর্তন নিয়ে ধারণা করার বিষয়ে একটা সম্ভাব্য কল্পিত পরিস্থিতি মাত্র, তবে এখন এমনকি নির্দিষ্ট করে সেই নির্বাচনের সময় কালের কথাও বলা হচ্ছে – এই বছরের হেমন্ত কাল”.

আর মনে তো হয় না যে, বর্তমানের প্রশাসনের নেতারা নিজেদের অবস্থান এত বড় সব স্ক্যান্ডালের পরেও টিকিয়ে রাখতে পারবেন, সেই রকমই মনে করেছেন এই রুশ বিশেষজ্ঞ.