২২শে জুন ১৯৪১ ফ্যাসিস্ট জার্মানীর সেনা বাহিনী সোভিয়েত দেশের ভিতরে অনুপ্রবেশ করেছিল. তাদের লক্ষ্য ছিল হিটলারের ভাষায় রাশিয়ার জীবনী শক্তিকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেওয়া, সমস্ত এলাকা দখল করে নেওয়া ও দেশের জনগনকে দাসত্বে বাধ্য করা. কিন্তু ফ্যুরের হিটলারের আকাঙ্খা, যার সেনাবাহিনী তার আগের দুই বছর ধরে সারা ইউরোপের বুকে হাল্কা পায়ে হেঁটে বেড়িয়েছে, পূরণ হয় নি. তার পরিকল্পনা অনুযায়ী বিদ্যুত্ গতির যুদ্ধে এত বেশী কঠোর ও বীরত্বপূর্ণ বাধা দানের কথা ছিল না. সোভিয়েত দেশ আক্রমণই ছিল তৃতীয় রেইখের সম্পূর্ণ পতনের প্রথম ধাপ.

হিটলারের সামরিক বাহিনী সামরিক শক্তিতে ঐতিহাসিক ভাবে অভুতপূর্ব ছিল. ৫৫ লক্ষ যোদ্ধা, ৪ হাজারেরও বেশী ট্যাঙ্ক, ৫ হাজার বিমান ও প্রায় ৫০ হাজার সাঁজোয়া গাড়ী ও কামান. প্রবল গোলা বর্ষণ ও বোমা বর্ষণের ফলে লাল ফৌজের ক্ষতি হয়েছিল অপূরণীয়. যুদ্ধের প্রথম দিন গুলিতেই বেশীর ভাগ যুদ্ধের রসদ, জ্বালানী ও সামরিক প্রযুক্তি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল. ১২০০ সোভিয়েত বিমান মাটি ছেড়ে আকাশে ওঠার আগেই নষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল. প্ল্যান “বারবারোসা”, যা “ভেরমখ্ত” তৈরী করেছিল সোভিয়েত দেশে আক্রমণের এক বছর আগেই, তাতে ঠিক করা ছিল লাল ফৌজের প্রধান শক্তিকে দ্রুত নষ্ট করে দেওয়ার. ২- ৩ মাসের মধ্যেই কথা ছিল মস্কো ও লেনিনগ্রাদ (সেন্ট পিটার্সবার্গ) দখল করে ফেলার. “যত দ্রুত আমরা রাশিয়াকে ভেঙে দিতে পারবো, ততই ভাল হবে. এই অপারেশনের শুধু তখনই মানে থাকবে, যদি আমরা একটাই লক্ষ্য স্থির করা আঘাত দিয়ে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রকেই ধ্বংস করে দিতে পারি”, - জোর গলায় ঘোষণা করেছিল হিটলার. বাধা দেওয়া হয়েছিল বীরত্বপূর্ণ ভাবেই. মস্কো আসার পথে সবচেয়ে মূখ্য লড়াই ছিল স্মোলেনস্ক শহরের লড়াই, যা দুই মাসেরও বেশী সময় ধরে হয়েছিল. ফলে রাজধানীর কাছে শত্রু এসে পৌঁছতে পেরেছিল ১৯৪১ সালের হেমন্তের শেষে, এই প্রসঙ্গে ইতিহাসে ডক্টরেট আন্দ্রেই সাখারভ বলেছেন:

“বাস্তবে যুদ্ধের ছন্দ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল. বহু সৈন্যই হিটলারের বাহিনীতে মনোবল হারিয়েছিল. আর সবচেয়ে প্রধান হল যে, সোভিয়েত বাহিনীর ও জনগনের পক্ষ থেকে বাধা দেওয়া, তাদের জেদ, অটল মনোভাব বাস্তবে “বারবারোসা” পরিকল্পনাকেই নষ্ট করে দিয়েছিল. এর পরে সব কিছুই ছিল স্পষ্ট, যে এবারে হতে চলেছে এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, যার ভবিষ্যত সম্ভাবনা জার্মানীর জন্য হবে একেবারেই আত্মহত্যার সামিল”.

হিটলার সোভিয়েত দেশের নিজেদের গতিময় করার ক্ষমতাকে কমিয়ে দেখেছিল. খুবই অল্প সময়ের মধ্যে সম্ভব হয়েছিল সামরিক বাহিনীকে নতুন করে তৈরী করা, উরাল ও সাইবেরিয়া অঞ্চলে সামরিক কল কারখানা সরিয়ে নিয়ে গিয়ে এক শক্তিশালী ভারী শিল্প নির্ভর সামরিক মুষ্টি তৈরী করা সম্ভব হয়েছিল. শুরু হয়েছিল প্রতি আক্রমণ ৫ই ডিসেম্বর ১৯৪১ থেকে. মস্কোর উপকণ্ঠের যুদ্ধ দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের গতি পাল্টে দিয়েছিল, এই কথা উল্লেখ করে ইতিহাসে ডক্টরেট প্রফেসর মিখাইল মিয়াগকভ বলেছেন:

“জার্মানীর সেনা বাহিনীর এত ক্ষতি করা সম্ভব হয়েছিল যে, তারা এর আগে কখনও কোন যুদ্ধে তা হতে দেখে নি. কিছু উচ্চ পদস্থ জার্মান জেনারেল মস্কো উপকণ্ঠের যুদ্ধের পরে ঘোষণা করেছিল যে, সোভিয়েত দেশের সামরিক পরাজয় এর পর নীতিগত ভাবেই হতে পারে না, তাই প্রয়োজন হয়েছে এই কাজ শুধু রাজনৈতিক ভাবেই সমাধান করার. হিটলার বহু জেনারেলকে পদচ্যুত করেছিল. তখন হিটলারের বিরক্তি আর রাগ হয়েছিল – তার জন্য উজ্জ্বল জয়ের সার ছিন্ন হয়েছিল. তার সেনা বাহিনী মস্কোর উপকণ্ঠে থামতে বাধ্য হয়েছিল ও তার পর পিছু হঠতে হয়েছিল”.

মস্কো উপকণ্ঠের যুদ্ধের পরে হিটলারের সামরিক ট্রাইব্যুনালে বিচার করা হয়েছিল প্রায় ৬২ হাজার অফিসার ও সেনার, তাদের যুদ্ধের জায়গা ছেড়ে পালিয়ে আসার জন্য, এই কথা উল্লেখ করে ইতিহাসে ডক্টরেট প্রফেসর ইউরি পিভোভারভ বলেছেন:

“রাশিয়া- এমন দেশ, যা জয় করা সম্ভব নয়. এটা নেপোলিয়ন দেখিয়েছিল, হিটলারও দেখিয়েছে. এমনকি যুদ্ধের শুরুতে লাল ফৌজকে ভেঙে দিয়েও আর মস্কো অবধি পৌঁছেও, সে এই জনগনের সঙ্গে কিছু করে উঠতে পারে নি, এই আবহাওয়ার সঙ্গে, এই দূরত্ব গুলির সঙ্গেও”.

২২শে জুন ১৯৪১ ও ৯ই মে ১৯৪৫ – দুটি দিন, যা বহু প্রজন্মের রুশ নাগরিকদের সঙ্গে চিরকালের জন্যই স্মৃতিতে রয়ে গেল. তার মধ্যে তফাত্ ১৪১৮ দিন ও রাতের “মহান পিতৃভূমির যুদ্ধ”. সেই যুদ্ধ সোভিয়েত দেশের দুই কোটি ৭০ লক্ষ সেনা ও নিরীহ জনগনের প্রাণ নিয়ে গিয়েছে. ১৭১০টি শহর ধ্বংস হয়েছিল, প্রায় এক লক্ষ গ্রাম ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, বহু সহস্র কল কারখানাও জ্বলে পুড়ে গিয়েছিল. “মহান বিজয়” পাওয়া সম্ভব হয়েছিল খুবই বড় মূল্যের বিনিময়ে. কিন্তু সেই “মলিন শক্তি”, যা পেতে চেয়েছিল বিশ্বের উপরে কর্তৃত্বের অধিকার, তাকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল.