মঙ্গলবারে পাকিস্তানের সুপ্রীম কোর্ট এক সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা অপেক্ষা করা হয়েছিল, কম করেও হলেও অন্তত গত দেড় মাস ধরেই. আদালত সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, এপ্রিল মাসের শেষে আদালত অবমাননার দায়ে শাস্তি হওয়া প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রেজা গিলানি তাঁর পদে থাকতে পারেন না. এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক সমস্যাকে আরও গভীর করেছে, যা এখন পাকিস্তানে চলছে.

মঙ্গলবার থেকে বুধবারে সারা রাত ধরে রাষ্ট্রপতি আসিফ আলি জারদারি সেই সব রাজনৈতিক দল গুলির নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন – যারা পাকিস্তানের বর্তমানে ক্ষমতাসীন পিপলস্ পার্টির জোটে রয়েছে, যে কি করা যেতে পারে ও কোন প্রার্থীকে বেরিয়ে যাওয়া গিলানির জায়গায় প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য প্রস্তাব করা যেতে পারে.

টেলিভিশন চ্যানেল জিও আজ সকাল বেলায় এক বেসরকারি উত্স থেকে পাওয়া খবর বলে জানিয়েছে যে, ক্ষমতাসীন দল দেশের প্রধানমন্ত্রী পদে বর্তমানের টেক্সটাইল শিল্প মন্ত্রী মাখদুম শাহাবুদ্দিন কে প্রার্থী করার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছে. ডন সংবাদপত্রে সবচেয়ে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে আহমেদ মুখতারের নাম করা হয়েছে, যিনি কিছু দিন আগেও প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর পদে ছিলেন, আর বর্তমানে রয়েছেন জল সম্পদ ও জ্বালানী মন্ত্রীর পদে, আর তারই সঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রী মাখদুম আমিন ফাহিমেরও. শেষ সিদ্ধান্ত নেবে দেশের লোকসভা, যা এক জরুরী বৈঠকে জমায়েত হবে বৃহস্পতিবারে. দেশের সর্ব্বোচ্চ ক্ষমতার অলিন্দে স্রেফ সাধারন ভাবে ঘুঁটি সরিয়ে এই কাজ শেষ হবে না, বলে মনে করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“খুবই স্পষ্ট করে এখন দেখা যাচ্ছে যে, প্রধানমন্ত্রী গিলানির উপরে আক্রমণ ও তার উপরে বিচার ছিল একটা প্রাথমিক বিষয় মাত্র, যা করা হয়েছে সমস্ত শাসক উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিদের উপরে আর সেখানে প্রাথমিক ভাবে – রাষ্ট্রপতি জারদারির উপরে. আপাততঃ জারদারি সরাসরি ভাবেই সমস্ত রকমের পূর্বাভাস ও ধারণা, যা অন্তর্বর্তী কালীণ নির্বাচন নিয়ে করা হয়েছে, তা অস্বীকার করেছেন ( প্রথমে পার্লামেন্ট, আর তারপরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে). কিন্তু এই সব ঘটনার ক্ষেত্রে যুক্তি বলে যে, এই সবই সেই দিকেই যাচ্ছে. আর নির্বাচন ২০১৩ সালে হবে না, যা সংবিধান অনুযায়ী হওয়া উচিত্, বরং আগেই হবে”.

এই ঘটনায় প্যারাডক্স হল যে, রাষ্ট্রপতি নিজেই ক্ষমতায় এসেছিলেন এক জাতীয় সমবেদনার স্রোতে ভেসে – একেবারে আচমকাই, যখন ২০০৭ সালের ডিসেম্বর মাসে তাঁর স্ত্রী ও তখনকার সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেত্রী বেনজির ভুট্টো নিহত হয়েছিলেন বিস্ফোরণে. কিন্তু পাকিস্তানের ইতিহাসে যাঁরা প্রাথমিক ভাবে সবচেয়ে দুর্বল রাজনীতিবিদ অথচ রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পদে নির্বাচিত হওয়া সেই জারদারি ও গিলানি সমস্ত রকমের সম্ভাবনাই রাখতেন ইতিহাসে প্রথম পাকিস্তানের নেতৃত্ব দেওয়ার, যাঁরা, তাঁদের সমস্ত সংবিধান সম্মত মেয়াদে কাজ করতে পেরেছেন. অন্য সমস্ত অসামরিক প্রশাসনই এই দেশে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে সময়ের আগেই – হয় অন্তর্বর্তী কালীণ নির্বাচনের ফলে, অথবা, যা অধিকাংশ সময়েই হয়েছে, সামরিক অভ্যুত্থানের ফলে, এই কথা মনে করিয়ে দিয়ে বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“বিগত বছর গুলিতে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী একাধিকবার বিশেষজ্ঞদের মত প্রমাণ করে দিয়েছে যে, তারাই এই দেশের একমাত্র শক্তি, যারা ক্ষমতা রাখে নানা রকমের গোষ্ঠী ও প্রজাতি দ্বন্দ্ব ভিত্তিক রাজনীতির উপরে উঠতে, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে, আর এমনকি – প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পরিনামের সঙ্গেও লড়াই করার, যেমন যা হয়েছিল ২০১০ সালের গরমের শেষে ও হেমন্ত কালের শুরুতে. কিন্তু বিগত বছর গুলির পরিবর্তে, এই বারে সামরিক বাহিনী একবারও দেশের ক্ষমতা নিজেদের হাতে নিয়ে নেওয়ার কথা বলে নি”.

পাকিস্তানের জন্য তাহলে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের পরে আর অবশ্যম্ভাবী ভাবে রাষ্ট্রপতি জারদারির অপসরণের পরে কি অপেক্ষা করছে? এর কয়েকটা নানা রকমের পথ রয়েছে. কিন্তু যেই প্রধানমন্ত্রীর পদ নিক না কেন, এটা হবে সাময়িক নির্বাচন মাত্র, যা খুব ভাল হলে আগামী নির্বাচন অবধি বহাল থাকবে বলে মনে করেছেন বরিস ভলখোনস্কি, তাই তিনি আরও বলেছেন:

“সম্ভবতঃ বর্তমানের ব্যবস্থার বিরোধীদের জয় হবে মুসলিম লীগের (ন) নেতৃত্বে আর ক্ষমতায় আসবেন এই দলের নেতা ও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ. কিন্তু এটা হবে শুধু ক্ষমতার উপর মহলে পরিবর্তন, আর পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ ও বিদেশ সংক্রান্ত নীতিতে খুব কম কিছুই পাল্টাবে.

আরও সম্ভাব্য রাস্তা হতে পারে যে, জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা ইমরান খান তাঁর তেহরিক- এ- ইনসাফ দল নিয়ে ক্ষমতায় আসবেন. এর অর্থ হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এমনিতেই জটিল সম্পর্ক আরও জটিলতর হবে. আর খুব একটা বোঝা যাচ্ছে না যে, কি করে জনমত নির্ভর রাজনীতিবিদ ইমরান খান দেশের সামনে উপস্থিত হওয়া জটিলতম সমস্যা গুলির সমাধান করবেন”.

আর যদি ব্যাপারটা শেষ অবধি এমন দাঁড়ায় যে একেবারে বিপর্যয় হয়েছে, তবে এই সম্ভাবনাকেও বাদ দেওয়া যায় না যে, সামরিক বাহিনী স্রেফ বাধ্য হবে নিজেদের হাতে ক্ষমতা নিতে, এই রকমই মনে করেন রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ, তা সে বর্তমানের প্রশাসনের যতই ইচ্ছা থাকুক না কেন দেশের সংবিধানের আওতার মধ্যেই থাকার জন্য.